ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরভূমের ভূমিকা আছে। সেই সংগ্রামের অন্যতম পৃষ্ঠভূমি ছিল বর্তমানের মুরারই ২ ব্লক এলাকা। এই ব্লকের সদর, তথা পাইকর গ্রাম ছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ের ভরকেন্দ্র। স্বাধীনতার লড়াইয়ে যাঁর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ছিল অতুলনীয়, তিনি হলেন পাইকর গ্রামেরই নির্ভীক, আপসহীন স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজেন্দ্র সিংহ। তাঁর জন্মতিথি ১১ মার্চ। প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতোই তাঁর লড়াই, ত্যাগ, সংগ্রাম অলক্ষ্যে থেকে যাবে, যদি বর্তমান প্রজন্ম তাঁর লড়াকু সংগ্রামের ইতিহাস জানতে না পারে।

মনে আছে, আমরা ছেলেবেলায় রাজেন্দ্র সিংহের স্মৃতিবিজড়িত স্কুলে পড়াশোনা করে এবং তাঁর জন্মদিনে প্রভাত ফেরি, গ্রাম প্রদক্ষিণ করতাম। কিন্তু, আমার মতো পাইকরের অনেক মানুষের মনের কথা বোধহয়, ওই ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ ভাবে জানা এবং তাঁর সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস সকলকে জানানো। জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও লড়াইয়ে তাঁর নাম অমলিন থেকে যাবে। এই মহান ব্যক্তির আদি নিবাস ছিল বীরভূম জেলার উত্তর প্রান্তে, গ্রাম পাইকরে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ বীরভূম জেলা কংগ্রেসের সাবেক সভাপতির কঠিন দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ বিরোধী সভা সমিতি, মিটিং, মিছিল, পিকেটিংয়ে যে ভাবে এই সিংহ হৃদয় ব্যক্তিত্ব নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা আজ অবিস্মরণীয় ইতিহাস হয়ে রয়ে গিয়েছে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছে। 

এলাকার সমাজকর্মী শিক্ষক এবং রাজেন্দ্র সিংহের এক কালের সতীর্থ প্রয়াত বিশ্বনাথ রায়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম, ১৯৪০ সালে বড়লাট লর্ড লিনলিথগোর  বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ অভিযানে রাজেন্দ্র সিংহের ভূমিকা ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও ১৯৩০ সালে লবণ আইন অমান্য ও ডান্ডি অভিযানে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। তিনি কী ভাবে ইংরেজ ব্ল্যাকউড সাহেবকে নিরস্ত করেছিলেন, তা আজ ইতিহাস। এই ব্ল্যাকউড এক কালে পাইক, সৈন্য সামন্তসহ রাজেন্দ্রবাবুর বাড়িতে চড়াও হন। খাজনা আদায়ের নাম করে অত্যাচার ও তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করেন। এ সব কথা এবং কী ভাবে ওই ইংরেজকে মোকাবিলা করেছিলেন রাজেন্দ্রবাবু, তা আজ কিংবদন্তি। এ সব কথা আজও মাঝে মাঝে পাইকরের প্রবীণ এবং অশীতিপর মানুষদের মুখ থেকে শোনা যায়। বর্তমান প্রজন্মের রাজেন্দ্র সিংহের নাতি সাধন সিংহ, প্রসাদ সিংহ প্রমুখ ব্যক্তিত্বেরা তাঁদের পিতামহের কথা এবং অনেক অজানা তথ্য আমাকে বলেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজেন্দ্র সিংহের লড়াই, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের কথা জানানোর জন্য কোনও সরকারি প্রচেষ্টা কখনও দেখা যায়নি। অথচ তা করা একান্ত দরকার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা এবং উৎসাহিত করার জন্য।

এ ভাবে অনেক তথ্য, ইতিহাস, সংগ্রাম আমাদের ভাবি প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যাবে। আমরা যদি নতুন প্রজন্মকে ওয়াকিবহাল না করি, তা হলে ইতিহাস জানার আগ্রহ সৃষ্টি কোনও দিনই হবে না। ব্রিটিশদের দমন-পীড়নকে তোয়াক্কা না করে মুরারই থানার কোপা গ্রামের যুগলপদ দাস এবং যোগায় গ্রামের শ্রীকান্ত রাজ মল্ল সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। স্বাধীনতার লড়াইকে গতিশীল করার নিরিখে মুরারই, নলহাটির পুরুষেরা নয় নারীরাও আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেন। কত জন জানেন যে ১৯১৪ সালে অগ্নিযুগের যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বীরাঙ্গনা দুকড়িবালা দেবী প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন? দুকড়িবালার নিবাস ছিল নলহাটির ঝাউপাড়া গ্রামে। ১৯৪০ সালে আর এক নারী কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি হলেন মল্লারপুরের সত্যবালা দেবী। ইতিহাস বলছে,  মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীর সহচর লালবিহারী সিংহের স্ত্রী সন্ধ্যারানি সক্রিয় ভূমিকা নেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে। লালবিহারী ও সন্ধ্যারানির কর্মভূমি ছিল এই তল্লাটেরই জাজিগ্রাম। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে তাঁদের চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে। এই ভাবে ভারত মাতার শৃঙ্খলমোচনে মুরারইয়ের গোঁড়শা গ্রামের গঙ্গাধর মুখোপাধ্যায়ের অজানা ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। 

রাজেন্দ্র সিংহদের মত নির্ভীক স্বাধীনতার যোদ্ধাদের সংগ্রামের কথা যদি আমরা তুলে না ধরে ভুলে যাই, তা হলে সেটা হবে আমাদের বিবেক ও চেতনার অপমৃত্যুর শামিল। আমরা ইতিহাস উপেক্ষা করলে, চিরকালই তাঁদের লড়াই আড়ালে থেকে যাবে। সেটা কি নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে ঠিক হবে? তাঁদের ত্যাগ, তিতীক্ষা আর বলিদানের জন্য আমরা কি কিছুই করতে পারি না? 

চেষ্টা করলে পারা যায় কিন্তু। ইতিহাসের পাতায় চলে যাওয়া পাইকরের রাজেন্দ্র সিংহের পরিবারের দাবি, এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবন নিয়ে তথ্য সংবলিত পুস্তক প্রকাশিত হোক। যদিও স্থানীয় ভাবে কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে, যা তথ্যে ও তত্ত্বে অপ্রতুল। সে-সব বইয়ে তাঁর জীবনদর্শন, মূল্যবোধ এবং প্রকৃত সংগ্রামী ভাবমূর্তিকে যথার্থ ভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করা হয়নি। ইতিহাসের গবেষক ছাত্রছাত্রী অথবা সুশীল সমাজের কাছে এই প্রতিবেদকের আবেদন, এই মানুষটিকে নিয়ে লেখালেখি এবং গবেষণা হোক। তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস জনগণকে জানানো হোক। নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার জন্য এটা অবশ্যই দরকার। আর এক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, বিনোবা ভাবে, প্রফুল্ল সেন, প্রফুল্ল ঘোষ, সতীশ সামন্ত, জয়প্রকাশ নারায়ণ, কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে রাজেন্দ্র সিংহের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছেন সিংহ পরিবারের প্রতিনিধি সাধন সিংহ। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবারের একটা বড় অবদান, বীরভূম জেলার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম ডাক ও তার বিভাগের অফিসের জন্য পাঁচ শতকরেও বেশি জমি দান করা নিঃস্বার্থ ভাবে। যার বর্তমান বাজারদর কয়েক লক্ষ টাকা। 

পাইকরের প্রবীণ মানুষদের আক্ষেপ, রাজেন্দ্র সিংহের পরিবার উপেক্ষিত এবং সরকারি উদাসীনতার শিকার। এই পরিবারকে নিদেনপক্ষে কি সম্মানিত করা যায় না বা কোন স্বীকৃতি দেওয়া যায় না— প্রশ্ন তাঁদের।  

(লেখক স্কুলশিক্ষক ও সাহিত্যকর্মী, মতামত নিজস্ব)