সংসদে নূতন আইন পাশ হইবার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ‘শিশু’ অধিকারের ক্ষেত্রটি অনেকখানি সংশোধিত হইল। জুভেনাইল জাস্টিস আইন-এর (২০১৪) মাধ্যমে দুই ধরনের সংশোধন ঘটানো হইল। প্রথম, শাস্তির ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়, অধিকারের ক্ষেত্রে। শাস্তির বিষয়টি ইতিমধ্যে বিতর্কিত, বিশেষত ২০১২ সালের ডিসেম্বরের সেই ভয়ঙ্কর সন্ধ্যার পর। নূতন আইন অনুসারে, অতঃপর বয়স ষোলো হইতে আঠারো বত্সরের মধ্যে, এমন ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ যদি কোনও গুরুতর অপরাধে অপরাধী হয়, জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের অনুমোদনসাপেক্ষে তাহার বিচার সাধারণ ফৌজদারি আদালতে দেশের সাধারণ আইনের ভিত্তিতেই করা হইবে। এত দিন পর্যন্ত অত্যন্ত ঘৃণ্য, নৃশংস, অমানবিক অপরাধ নিজ হস্তে ঘটাইবার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সর্বাধিক শাস্তি ছিল অনধিক তিন বত্সর সংশোধনাগারে বসবাস, এবং তাহার পর নিঃশর্ত মুক্তি। আইনের সংশোধন তাই বহুকাঙ্ক্ষিত ছিল। কিছু কিছু বিশেষ অধিকার আঠারো বত্সর অবধি প্রাপ্য হইলেও, নৃশংস পদ্ধতিতে হত্যা বা ধর্ষণের মতো অপরাধের গুরুত্ব বুঝিবার পক্ষে ষোলো বছর বয়সকে যথেষ্ট বলা চলে। আর, অপরাধের গুরুত্ব বুঝিয়াও যখন কেহ অপরাধ করে, তাহার দায়িত্ব তাহাকে লইতে হইবে বই কী। যুগের সঙ্গে সঙ্গে বয়ঃপ্রাপ্তি ও সচেতনতার সংজ্ঞা বদলায়। অন্যান্য উন্নত দেশে তাহা ইতিমধ্যেই স্বীকৃত ও সমাদৃত। অথচ ভারতের আইন ও বিচার অঙ্গনে এত দিন সেই বোধের স্থান হয় নাই। অতি সম্প্রতি দিল্লিতে যে পাঁচ তরুণ মিলিয়া এক একুশ-বর্ষীয়কে স্পষ্ট দিবালোকে প্রকাশ্য জনপথের উপর ফালাফালা করিয়া কোপাইয়া মারিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কিছু ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’-ও ছিলেন। তাঁহাদের অপরাধের ধরনই বলিয়া দেয়, বয়সের ভিত্তিতে সব মানসিক বিকারের ব্যাখ্যা বা বিচার হয় না।
কঠোর বিচারের স্বীকৃতির অর্থ এই নয় যে তাহা কোনও ভাবে অধিকারকে খর্ব করে। বরং এক অর্থে তাহা অধিকারের ক্ষেত্রকে সুরক্ষিত করে। বুঝাইয়া দেয়, অন্যের অধিকার মান্য করিবার মতোই নিজের অধিকার রক্ষা করিবার দায়িত্বও ব্যক্তির নিজেরই স্কন্ধের উপর। এই সামাজিক ও নাগরিক অভ্যাস নির্মাণের পদ্ধতিটি প্রত্যাশিত। সমাজের মধ্যে যদি সেই প্রত্যাশা বা সেই অভ্যাসের প্রতিফলন ঘটানো যায়, তবে সমাজের মঙ্গলের আশাই বাড়ে। আর তাহা না হইলে সামাজিক অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। সম্ভবত সেই কারণেই তথ্য-সমীক্ষা বলিতেছে, এত কাল যাবত্ ষোলো হইতে আঠারো বয়ঃক্রমের অপরাধীরা বিচারে খালাস পাইয়া সত্বর অপরাধের অঙ্গনে ফিরিয়া আসিত। এই পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য একটি নূতন আইন খুবই জরুরি ছিল।
নূতন আইনে যে ভাবে শিশু-সুরক্ষার প্রশ্নটিকেও গুরুত্ব-সহকারে আনা হইয়াছে, তাহাও বহু-প্রতীক্ষিত ছিল। এ দেশে শিশু-নির্যাতনের সংবাদ ক্রমশই আরও বেশি করিয়া দৃষ্টিগোচর হইতেছে। অন্ধ্রপ্রদেশে দৃষ্টিহীন শিশুদের বিদ্যালয়ে কী নির্বিচারে শিক্ষকরা বেত্রাঘাত করিয়া থাকেন, তাহার খবর ইতিমধ্যেই প্রচারমাধ্যমে। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিকল্প নাই। আবার, ক্রমশই স্পষ্ট হইতেছে, নির্যাতন, বিশেষত শিশু-নির্যাতনের সংজ্ঞাও আগের মতো রাখিলে চলিবে না। যে ধরনের দমন-পীড়ন অতীতে ‘স্বাভাবিক’ মনে করা হইত, এখন আবার নূতন করিয়া তাহার পুনর্বিবেচনা দরকার। নূতন আইন এই চলমান সামাজিক প্রয়োজনীয়তার দিকেও নির্দেশ করিয়া বৈপ্লবিক কাজ করিয়াছে। এ বার দ্রুত ও সঙ্গত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতে শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কের জীবন অপেক্ষাকৃত সুস্থতা ও সুরক্ষার পথে চালিত হইবে, আশা রহিল।