আমরা আবার একটা সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। যন্ত্র-গণনার সন্ধিক্ষণ। এক দশক বা তার একটু বেশি সময় বাদে বাদে এ রকমটা হয়ে থাকে। তবে এ বারের নামটা চমকপ্রদ। মেঘ-গণনা বা ক্লাউড কম্পিউটিং! বস্তুটা ঠিক কী? মেনফ্রেম কম্পিউটার দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল যন্ত্র-গণনার। বিশাল ঠান্ডা ঘরে বিশাল বিশাল যন্ত্র। তাকে আঁকড়ে ধরে থাকত জলের পাইপ। তার পর সলিড স্টেট ইলেকট্রনিক্স-এর বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমশ ছোট ও আরও শক্তিশালী হতে হতে ঢুকে পড়ল আমার-আপনার বাড়ির মধ্যে। সমান্তরাল ভাবে বিবর্তিত হল টেলিকমিউনিকেশনস। এই দুইয়ের যুগলবন্দিতে তৈরি হল ইন্টারনেট। যোগ হল মোবাইল, যা কম্পিউটারকে এনে দিল আমাদের পকেটের মধ্যে। পৃথিবীটা হঠাত্ হাতের মুঠোয়। আর এখান থেকেই ক্লাউড কম্পিউটিং-এর সূত্রপাত। কিন্তু নামটা এমনধারা কেন?
কম্পিউটার প্রযুক্তির ছবিতে, আমরা ইন্টারনেট বা নেটওয়ার্ক বোঝাতে প্রায়শই এক খণ্ড মেঘ ব্যবহার করে থাকি। আর ক্লাউড কম্পিউটিং-এর ক্ষেত্রে ইন্টারনেট বা নেটওয়ার্ক যেহেতু প্রধান চালিকা শক্তি, তাই হয়তো এই নামকরণ। আর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে এই মেঘ, গণনার সব জটিলতাকে আড়াল করে শুধুই রুপোলি রেখাটুকু সরবরাহ করবে! আমাদের কম্পিউটিং-এর চাহিদা যতই বাড়ুক বা জটিল হোক না কেন, এন্ড ইউজার বা চূড়ান্ত ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা শুধু যথাযথ পরিষেবাটুকু কিনে নিলেই হল। জটিলতা সব থাকবে বহু দূর-আকাশে, মেঘের মধ্যে।
সার্ভিস বা পরিষেবা, এটাই মেঘ-গণনার মোদ্দা কথা। আমার আরও স্টোরেজ দরকার, দোকানে দৌড়ে গিয়ে হার্ড ডিস্ক কেনার দরকার নেই, আমি কিনব স্টোরেজ এস আ সার্ভিস। কর্মীদের ই-মেল পরিষেবা দরকার। কারও ব্যবসায় পুজোর সময় চাহিদা অনেক বেশি, তাই কম্পিউটিংয়ের চাহিদাও খুব বেড়ে যায়। তা হলে কি তাকে তখন অনেক কম্পিউটার কিনতে হবে? ক’বছর আগেও উত্তরটা প্রায় সে রকমই হত। কিন্তু এখন অন্য সমাধান আছে। ক্লাউড কম্পিউটিং। যা হল অনেকটা বিদ্যুত্ পরিষেবার মতন। আমার চাহিদা বেশি হলে বেশি বিদ্যুত্ কিনব এবং সেই অনুযায়ী বিল ভরব। এ ভাবেই ক্লাউড সার্ভিস, কম্পিউটিংকে জল বা বিদ্যুতের মতন পরিষেবায় বদলে দিচ্ছে। কিন্তু কী করে সম্ভব হচ্ছে এ সব? বোঝার চেষ্টা করা যাক।
যদি পাওয়ার প্লান্ট বলে কিছু না থাকত, আর আমাদের প্রতিটি বাড়িতে বা ফ্যাক্টরিতে নিজের নিজের বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হত, কী ঝকমারিই না হত তা হলে? মেয়ের স্কুলের টিফিন তৈরিতে মন দেব না বাড়ির বিদ্যুত্ তৈরিতে? কিন্তু সে সমস্যা ঘুচিয়েছে বিদ্যুত্ সরবরাহের গ্রিড সিস্টেম। সুইচ টিপলেই আলো জ্বলছে পাখা চলছে। হ্যাপা সামলাচ্ছে বিদ্যুত্ কোম্পানিগুলো। আমাদের একটার জায়গায় দশটা আলো জ্বালাতে গেলে নতুন জেনারেটর কিনতে হচ্ছে না! বিল ততটুকুই ভরছি, যেটুকু আমি খরচ করছি।
কম্পিউটিংয়ের প্রয়োজনগুলো বিদ্যুত্ বা জলের মতন এক ধরনের নয়। কারও জল চাই তো কারও কোক, আর এক জনের ফরাসি সুরা। তাই যথাযথ পরিষেবা বা বিলিং একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা সেই অতি-জটিল সমস্যারও সমাধান করে ফেলেছেন। একটু খতিয়ে দেখা যাক। মনে করুন একটা চার তলা বাড়ি। এক তলায় ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যাজ আ সার্ভিস বা আই এ এ এস (বা, এক কথায়, আয়াস)। আমার যদি শুধু ইনফ্রাস্ট্রাকচার-এর দরকার হয়, অর্থাত্ ধরুন উইন্ডোজ বা লাইনাক্স চালিত কম্পিউটার, স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি, যার ওপরে আমি নিজে অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করব, তা হলে আমি আয়াস কিনব। দোতলায় প্ল্যাটফর্ম অ্যাজ আ সার্ভিস বা পাস। অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে যদি আমি বিশেষ কোনও সফটওয়্যার ভাড়া করতে চাই, যেমন ধরুন ডেটাবেস ইত্যাদি, তা হলে আমি কিনতে পারি পাস। আবার, আমি যদি আমার প্রয়োজনের অ্যাপ্লিকেশনটাই তৈরি অবস্থায় সস্তায় পেয়ে যাই, তা হলে পুরো তিনতলা বাড়িটাই কিনে নেব, যা হল কিনা সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস বা সাস। চার তলায় সাসকে আর এক ধাপ পরিশীলিত করে গড়া হয়েছে বিজনেস প্রসেস অ্যাজ আ সার্ভিস বা বিপাস। অনেকে অবশ্য তিন-চার তলাকে একটা মিলিত তলা হিসেবেই দেখেন। যেমন ধরুন, আপনার ব্যবহৃত জিমেল, যা কিনা হল ই-মেল সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস। ইউটিউবে দেখেন সিনেমা বা গান, তা হল ভিডিয়ো সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস। এখানে যে পরিষেবাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো সাধারণ গ্রাহক বিনা মূল্যে ব্যবহার করে থাকেন। ব্যবসার কাজের জন্য আয়াস, পাস বা বিপাস দরকার হলে, তা আমাদের কিনতে হবে। দাম নির্ধারিত হবে ক্লাউড কম্পিউটিং-এর পরিমাণ, জটিলতা আর কতক্ষণ ব্যবহার করছি, তার ওপর। ক্লাউড পরিষেবা সরবরাহকারীর ওয়েবসাইটে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যা অনায়াসে কিনে ফেলা যাবে।
এখনও কিছু কাজ চলছে। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা ওঁদের কাজ করে চলুন, তত ক্ষণ আমরা মেঘের রাজ্যে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, আইটিউন আর টুইটারে আমাদের কাজ করে চলি।
প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, ক্লাউড ইনোভেশন, আই বি এম। মতামত ব্যক্তিগত।