শেয়ার বাজারের ওঠাপড়া দেখিয়া অর্থনীতির না়ড়ি মাপিবার বিপদ আছে। চিনের ন্যায় দেশের বাজার সম্বন্ধে কথাটি আরও বেশি সত্য, কারণ সেই বাজারের কতখানি বাজারের ধর্মে চলে আর কতখানি পার্টির অঙ্গুলিহেলনে, দুধ-জলের সেই ভাগ বোঝা দুষ্কর। তবে, চিনের অর্থনীতিতে যে গোলমাল চলিতেছে, তাহা বুঝিতে শেয়ার বাজারের দিকে না তাকাইলেও চলিবে। অর্থনীতির বৃদ্ধির হার শ্লথ হইয়াছে, উৎপাদন ক্ষেত্রের বৃদ্ধিও তাহার সহগামী। অবস্থাটি বেমক্কা সৃষ্টি হয় নাই। চিনের কর্ণধাররা সজ্ঞানে অর্থনীতির গতিপথ বদলাইবার চেষ্টা করিতেছেন। বিশ্ব-অর্থনীতিতে দেশটির উত্থান মূলত সস্তায় ভোগ্যপণ্য রফতানির মাধ্যমেই। তাহার পিছনে ছিল সে দেশের সস্তা শ্রম। কিন্তু, এক-সন্তান-নীতির ফলে এখন সেই শ্রমশক্তিতে টান পড়িয়াছে। তাহার সহিত যোগ হইয়াছে বিপুল দূষণের প্রশ্নটি। ফলে, চিন এখন উচ্চতর শ্রেণির রফতানি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অর্থনীতির ভিত্তি করিতে চাহিতেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি তাহার গতিপথ পাল্টাইতে চাহিলে গোটা দুনিয়াতেই কম্পন অনুভূত হইবে, তাহা আর বিচিত্র কী? ভারতের গায়েও সেই ধাক্কা লাগিতেছে। শেয়ার বাজারের সূচক ধরাশায়ী।
অবশ্য, বিশ্ব-অর্থনীতিতে এখন চিনই একমাত্র বিপদ, ভাবিলে ভুল হইবে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার পূর্বাভাস করিয়াছে, আগামী অর্থবর্ষে গোটা দুনিয়ার অর্থনীতি গড়ে ৩.১ শতাংশ হারে বা়ড়িবে। উন্নত দেশগুলির বৃদ্ধির হার দুই শতাংশের কাছাকাছি থাকিবে, এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তাহা হইবে চার শতাংশ। বিশ্ব ব্যাঙ্কের পূর্বাভাস বলিতেছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হইবে। তেলের দাম তলানিতেই থাকিবার সম্ভাবনা, ফলে পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি শ্লথ হইবে। গ্রিস ইত্যাদি লইয়া ইউরোপের সংকট অব্যাহত থাকায় সেখানেও সুসংবাদের আশা ক্ষীণ। চিন টালমাটাল। উন্নত বিশ্বে একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থায় থাকিবে। কিন্তু, সে দেশে সুদের হার বাড়াইবার সিদ্ধান্তের পর গোটা দুনিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগের স্রোতে ভাটা লাগিবে কি না, সেই প্রশ্ন থাকিতেছে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কের মতে, যে দেশটি এই ডামাডোলের মধ্যেও বৃদ্ধির অপেক্ষাকৃত উচ্চ হার বজায় রাখিতে পারে, তাহার নাম ভারত। তবে, তাহার কিছু শর্ত রহিয়াছে। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির হার গত বৎসরের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ভাল হইবে, সেই সম্ভাবনা নাই। পরিষেবা ক্ষেত্রেও বৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত। ফলে, ভারতকে উচ্চ বৃদ্ধির হার বজায় রাখিতে হইলে উৎপাদন ক্ষেত্রেই বাজিমাত করিতে হইবে।
চিনের অর্থনীতিতে ডামাডোলের ফলে ভারতের একটি সমস্যা বাড়িয়াছে। একে সে দেশের মুদ্রার দাম কমিয়াছে, ফলে চিনা পণ্য আমদানি করিবার খরচও কমিয়াছে। তদুপরি, চিনের শিল্পক্ষেত্রে বর্তমান উৎপাদনের পরিমাণ তাহার ক্ষমতার তুলনায় ঢের কম। ফলে, চিন নিজের অর্থনীতিতে বাঁচাইতে ভারতীয় বাজার সস্তা পণ্যে ভাসাইয়া দিতে পারে। তাহাতে ভারতের দেশি উৎপাদন ক্ষেত্রে ধাক্কা লাগিবে। অন্য দিকে, চিনের অর্থনৈতিক অস্থিরতার ফলে বিদেশি বিনিয়োগের অভিমুখ ভারতের দিকে ঘুরিতে পারে। অর্থাৎ, বিপদ যেমন আছে, সুযোগও তেমনই আছে। নরেন্দ্র মোদী-অরুণ জেটলিরা স্মরণে রাখিতে পারেন, কেবলমাত্র সরকারি ব্যয়ে কাজ চলিবে না। তাহার জন্য বেসরকারি পুঁজিকে বিনিয়োগে উৎসাহী করিয়া তুলিতে হইবে। এবং, তাহার জন্য সংস্কার জরুরি শর্ত। রাজনীতির ছক্কা-পাঞ্জা ভুলিয়া তাঁহারা সংস্কারে মন দিলে ভারত এই পড়িয়া পাওয়া সুযোগটি কাজে লাগাইতে পারে। নচেৎ, আর্থিক সংকট ঘুরিয়া আসিবে।