Advertisement
E-Paper

খেলার ছলে

হান্সি ক্রোনিয়ের আত্মা হয়তো অলক্ষ্যে হাসিতেছেন। টেনিসে গড়াপেটার যে অভিযোগ দুইটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা সত্য হইলে ক্রিকেট-দুনিয়া কাঁপাইয়া দেওয়া দুর্নীতিগুলি মাপে নিছকই শিশু প্রতিপন্ন হইবে।

শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০১৬ ০০:৩০

হান্সি ক্রোনিয়ের আত্মা হয়তো অলক্ষ্যে হাসিতেছেন। টেনিসে গড়াপেটার যে অভিযোগ দুইটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা সত্য হইলে ক্রিকেট-দুনিয়া কাঁপাইয়া দেওয়া দুর্নীতিগুলি মাপে নিছকই শিশু প্রতিপন্ন হইবে। দুনিয়ার প্রথম পঞ্চাশ জন টেনিস তারকার মধ্যে ১৬ জন নাকি ম্যাচ গড়াপেটায় জড়িত। অভিযোগের ধুয়ার পিছনে যে সত্যের আগুন আছে, তাহা অনুমান করা চলে। বিশ্বের এক নম্বর টেনিস খেলোয়াড় নোভাক জোকোভিচ বলিয়াছেন, ২০০৭ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ ওপেনের একটি ম্যাচ ছাড়িয়া দেওয়ার জন্য দুই লক্ষ মার্কিন ডলারের প্রস্তাব পাইয়াছিলেন। ছয় শতাংশ বাৎসরিক মূল্যবৃদ্ধি ধরিলেও আজকে তাহা প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ ডলারে দাঁড়ায়। ২০০০ সালে ক্রোনিয়ে ১৫০০০ ডলার লইয়াছিলেন। মূল্যস্ফীতি ধরিলে বর্তমানে তাহার মূল্য ৪০,০০০ ডলারের কম। দুই খেলায় দুর্নীতির দামের ফারাকটি অহেতুক নহে। ক্রিকেট এবং টেনিস, এই দুই খেলার বাজারের মধ্যেও ফারাকের অনুপাত কাছাকাছিই থাকিবে। অস্যার্থ, খেলার বাজার যত বড় হইবে, তাহাতে অর্থের পরিমাণ যত বাড়িবে, খেলায় দুর্নীতির সম্ভাবনা ও মাপও ততই বাড়িবে। তবে, সম্ভাবনা থাকিলেই যে বাস্তবেও দুর্নীতি হইবে, তাহা নিশ্চিত নহে। দুর্নীতি নির্ভর করে নজরদারি এবং প্রশাসনিক তৎপরতার উপর।

যে খেলোয়াড়রা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন, তাহাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, তাঁহাদের খেলার ধর্মের কথা স্মরণ করাইয়া দেওয়া অর্থহীন। তাঁহাদের নিকট সেই ধর্মের কোনও দাম নাই। কিন্তু, ধরা প়ড়িবার ভয়টি বিলক্ষণ রহিয়াছে। টেনিস এবং ক্রিকেট, এই দুইটি খেলার উদাহরণ দেখিলেই সেই ভয়ের চরিত্র ধরা পড়িবে। টেনিসে অভিযোগ উঠিয়াছে, প্রথম সারির যে খেলোয়াড়েরা ম্যাচ গড়াপেটা করেন, তাঁহারা সেই অপকর্মের জন্য অপেক্ষাকৃত অখ্যাত টুর্নামেন্টগুলিকেই বাছিয়া লন। সেখানে স্বেচ্ছায় হারিলেও হইচইয়ের সম্ভাবনা কম, ধরা পড়িবার সম্ভাবনাও কম। ক্রিকেটে গড়াপেটার সাম্প্রতিক উদাহরণগুলি বলিতেছে, এই দুর্নীতিতে জড়ান অপেক্ষাকৃত অনামী খেলোয়াড়রাই। গড়াপেটা তাঁহাদের যত টাকা দিতে পারে, খেলিয়া সেই অর্থ উপার্জন করা তাঁহাদের পক্ষে কঠিন। ক্রিকেট-বিশ্বে সর্বাপেক্ষা দুর্নীতিপ্রবণ দেশ সম্ভবত পাকিস্তান। সেখানে ক্রিকেটারদের খেলিয়া উপার্জন যেমন কম, তেমনই প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে দুর্নীতিতে জড়াইয়া ধরা পড়িবার ভয়ও কম। গড়াপেটার এই চলনের মধ্যেই এই অসুর বধ করিবার ব্রহ্মাস্ত্রটি রহিয়াছে। খেলোয়াড়দের ভয়কেই কাজে লাগাইতে হইবে।

দুর্নীতিগ্রস্ত খেলোয়াড়দের কাছে গড়াপেটা মূলত একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। একটি ঝুঁকি, এবং তাহা হইতে লাভের সম্ভাবনা। আচরণগত অর্থনীতির তত্ত্ব বলিবে, মানুষ স্বভাবত ঝুঁকি এড়াইয়া চলে। যদি লাভের পরিমাণ ঝুঁকির অন্তত দ্বিগুণ হয়, একমাত্র তখনই মানুষ সেই ঝুঁকি লয়। যে খেলোয়াড়রা গড়াপেটার ঝুঁকি নেন, তাঁহারা সম্ভবত এই হিসাব মানিয়াই লন। অতএব, ঝুঁকির পরিমাণ বাড়ানোই একমাত্র রাস্তা। অপেক্ষাকৃত ছোট প্রতিযোগিতার উপরও নজর থাকুক। বেটিং-চক্রের সহিত খেলোয়াড়দের যোগসাজশের বিষয়ে তদন্ত চলুক। পাশাপাশি, শাস্তির পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। বস্তুত, যে খেলার বাজার যত বিস্তৃত এবং গভীর, সেই খেলায় শাস্তিও ততই কঠোর হওয়া বিধেয়। তবে, একটি সমস্যা থাকিবেই। খেলায় কোন ভুলটি ইচ্ছাকৃত আর কোনটি নহে, কোন পরাজয় ক্লান্তির কারণে আর কোনটির পিছনে রজতকাঞ্চন রহিয়াছে, তাহা বলা সব সময়ই কঠিন। কিন্তু, নজরদারি ও শাস্তি জোরদার হইলে দুর্নীতি যে হ্রাস পাইবে, তাহা প্রায় নিশ্চিত।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy