Advertisement
E-Paper

ধর্মের কল

ভারত বিচিত্র দেশ। সেখানে কখনও গোমাংস ভক্ষণের সন্দেহবশত প্রাণ যায়, আবার কখনও জটিল বিষয়ে দুই যুযুধান ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভিতর অভূতপূর্ব মতৈক্য দেখা যায়। সম্প্রতি ধর্মস্থানে নারীর প্রবেশাধিকারকে কেন্দ্র করিয়া হিন্দু ও মুসলিম সমাজের অধিকার-সচেতন নারীদের যে ভাবে আন্দোলিত হইতে দেখা গিয়াছে, তাহার তাৎপর্য বিরাট। ‘ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন’ (বিএমএমএ) নামের একটি গোষ্ঠী মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরের শনিমন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের দাবিকে অকুণ্ঠ সমর্থন জোগাইয়াছে। মন্দিরটিতে নারীর প্রবেশাধিকার নাই।

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:৪৪

ভারত বিচিত্র দেশ। সেখানে কখনও গোমাংস ভক্ষণের সন্দেহবশত প্রাণ যায়, আবার কখনও জটিল বিষয়ে দুই যুযুধান ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভিতর অভূতপূর্ব মতৈক্য দেখা যায়। সম্প্রতি ধর্মস্থানে নারীর প্রবেশাধিকারকে কেন্দ্র করিয়া হিন্দু ও মুসলিম সমাজের অধিকার-সচেতন নারীদের যে ভাবে আন্দোলিত হইতে দেখা গিয়াছে, তাহার তাৎপর্য বিরাট। ‘ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন’ (বিএমএমএ) নামের একটি গোষ্ঠী মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরের শনিমন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের দাবিকে অকুণ্ঠ সমর্থন জোগাইয়াছে। মন্দিরটিতে নারীর প্রবেশাধিকার নাই। দীর্ঘ দিন এই অনধিকারই সেখানে ‘ঐতিহ্য’। এই লিঙ্গবৈষম্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়াছে ‘ভূমাতা রণরাগিণী ব্রিগেড’ নামক একটি সংগঠন। মন্দিরে তাহাদের প্রবেশের প্রচেষ্টা পুলিশ কড়া হাতে দমন করিয়াছে। বর্তমানে আলোচনার মধ্য দিয়া সমাধানের চেষ্টা চলিতেছে। ইতিমধ্যে বিএমএমএ-র সমর্থন বিষয়টিতে নূতন মাত্রা যোগ করিল।

নারীকে ধর্মস্থান হইতে বিরত রাখিবার উদাহরণ অজস্র। নারীর ধর্মাচরণের অধিকার সংকুচিত করিবার রীতি বিভিন্ন ধর্মের কান্ডারিরাই লালন করিতেছেন। নিজ স্বার্থেই। কেন? স্পষ্ট উত্তর দিয়াছে বিএমএমএ: ধর্মস্থানে মহিলাদের প্রবেশাধিকার না দিবার কৌশলটি পিতৃতন্ত্রের ষড়যন্ত্র। ধর্ম লিঙ্গবৈষম্য করে না। বৈষম্যের ধারণাটি একান্ত ভাবেই ধর্মস্থানগুলি চালাইবার দায়িত্বে থাকা পুরুষশাসিত অংশটির মস্তিষ্কপ্রসূত। উত্তরটি নির্মম সত্য। কেরলের শবরীমালা মন্দিরের বক্তব্য পড়িলে সেই ধারণাই হয়। নারী রজস্বলা কি না, তাহা জানিবার যন্ত্র আবিষ্কৃত হইলে তাহারা মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পাইবে— ঘোষণায় পিতৃতান্ত্রিক ঔদ্ধত্য ভরপুর। দিল্লির জামা মসজিদের শাহি ইমামও বলিয়াছেন, ইসলাম নারীকে মসজিদে প্রবেশ, প্রার্থনার অনুমতি দেয়। কিন্তু স্থানীয় কমিটিগুলি অনেক ক্ষেত্রেই বাধা দিয়া আসিতেছে। মুসলিম মহিলাদের ধর্মস্থানে প্রবেশের অধিকার লইয়া দীর্ঘ দিন লড়িতেছে বিএমএমএ। এখন শনিমন্দিরে নারীর প্রবেশ সমর্থন করিয়া তাহারা সামগ্রিক ভাবে নারীর অধিকারকে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করিল। এবং নজির সৃষ্টি করিল।

অতঃপর? শনি মন্দিরে সমাধানসূত্র বাহির করিবার গুরুদায়িত্বটি বিবদমান দুই পক্ষই সরকারের হাতে সমর্পণ করিয়াছে। সরকার সামাজিক প্রশ্নে কেন হস্তক্ষেপ করিবে, এই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নহে। কিন্তু ইহা ভিন্ন মন্দির কর্তৃপক্ষের সামনে অন্য পথ নাই। তাঁহারা হঠাৎই রক্ষণশীলতার খোলস ছাড়িয়া মন্দিরের দ্বার মহিলাদের জন্য উন্মুক্ত করিবেন, এমন কল্পনা অবান্তর। কিন্তু, কলিকালে মহিলাদের দাবি নস্যাৎ করিলেও সমাজে প্রতিপত্তি হারাইবার আশংকা প্রবল। সুতরাং, তৃতীয় পক্ষের শরণ। কিন্তু প্রশ্ন, সরকারের উপরও নারীর অধিকার রক্ষার দায়িত্বটি নিশ্চিন্তে গচ্ছিত রাখা চলে কি? সরকার কি সত্যই নিরপেক্ষ মীমাংসা করিতে পারে? ভরসা কম। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরকার এখনও স্থানীয় গোষ্ঠী-রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠিতে পারে নাই। নারীর অধিকার প্রশ্নে কেরল সরকারের সমর্থন শবরীমালা মন্দির কর্তৃপক্ষের প্রতিই বর্ষিত হইয়াছে। সৌভাগ্যের বিষয়, মহারাষ্ট্রে সরকার মহিলাদের দাবির প্রতি সহানুভূতিই দেখাইয়াছে। মহারাষ্ট্রের সমাজ ও রাজনীতি সমর্থন করিলে এই দাবির হয়তো জিত হইবে। সেই জয় কেরল বা অন্যত্র প্রসারিত না হইতেই পারে। তবু তাহা তুচ্ছ করিবার নহে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy