Advertisement
E-Paper

নায়ক

উ ঠিয়া দাঁড়াইলেন বিরাট কোহালি। বুঝাইয়া দিলেন, তিনি ভারতীয় দলের হইয়া ক্রিকেট খেলেন বটে, কিন্তু তিনি ‘ভারতীয়’ নহেন। অন্তত, নাগপুর হইতে যাহাকে ‘সনাতন ভারত’ নামে চালাইবার চেষ্টা হয়, তিনি সেই ভারতের কেহ নহেন।

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০১৬ ০০:২৩

উ ঠিয়া দাঁড়াইলেন বিরাট কোহালি। বুঝাইয়া দিলেন, তিনি ভারতীয় দলের হইয়া ক্রিকেট খেলেন বটে, কিন্তু তিনি ‘ভারতীয়’ নহেন। অন্তত, নাগপুর হইতে যাহাকে ‘সনাতন ভারত’ নামে চালাইবার চেষ্টা হয়, তিনি সেই ভারতের কেহ নহেন। সেই সনাতন ভারত রামচন্দ্রের। যে রামচন্দ্র তাঁহার নিজের দরবারে বসিয়া তাঁহার স্ত্রীর উদ্দেশে রাজ্যবাসীর ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চুপ থাকিয়াছিলেন, প্রতিবাদ করেন নাই। বরং, স্ত্রীকে তীব্র অসম্মানের অগ্নিপরীক্ষায় ঠেলিয়া দিয়াছিলেন। বিরাট কোহলি সেই পৌরুষের ঐতিহ্য ধুলায় ফেলিয়া সভ্য নাগরিকতার পথে হাঁটিয়া গিয়াছেন। ইন্টারনেটের খাপ পঞ্চায়েত যখন অনুষ্কা শর্মার বিচারসভা বসাইয়াছে, বিরাটের ব্যর্থতার জন্য তাঁহাকে দায়ী করিয়াছে, তখন তিনি সপাট প্রতিবাদ করিয়াছেন। অনুষ্কা যখন তাঁহার বান্ধবী ছিলেন, তখনও করিয়াছেন। যখন দুই জনের বিচ্ছেদ হইয়াছে, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সেই বিচ্ছেদের খুঁটিনাটি দেশবাসীর দ্বিপ্রাহরিক চাটনি হইয়া উঠিয়াছে, তখনও করিয়াছেন। মোহালিতে কার্যত একা অস্ট্রেলিয়াকে হারাইবার পর তিনি তাঁহার প্রাক্তন বান্ধবীর উদ্দেশে ভারত নামক গ্রামের অশিক্ষিত ক্রিকেট-দর্শকের কটূক্তিতে চুপ করিয়া থাকেন নাই। বলিয়াছেন, এই দর্শকদের লজ্জা হওয়া উচিত। ক্রিকেট মাঠে তিনি এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিরাট কোহালি প্রমাণ করিলেন, বাইশ গজের বাহিরে বৃহত্তর ময়দানেও তিনি ব্যতিক্রমী। সাধারণের, তুচ্ছের ভিড়ের অনেক ঊর্ধ্বে।

তাঁহার উদাহরণ হইতে খাপ পঞ্চায়েত কিছু শিখিবে, সেই সম্ভাবনা কম। যে কোনও ব্যর্থতায় দায় অন্য কাহারও, এবং সেই অন্য কেহ যদি কোনও নারী হন, তবে তো কথাই নাই— এই ভাবনাটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চিরন্তন। বিশেষত, সেই নারী যদি অনুষ্কার ন্যায় কোনও সফল, স্বাধীনচেতা মানুষ হন, তবে তাঁহাকে হেনস্থা করিতে পিতৃতন্ত্রের হৃদয়ের আরাম। বিরাট সেই পুরুষতন্ত্রকে দস্যু রত্নাকরের কথা স্মরণ করাইয়া দিতে পারিতেন। নিজের কাজের দায় যে নিজেকেই বহন করিতে হয়, নিজের ব্যর্থতার জন্য যে অন্য কাহাকে দায়ী করা চলে না, বিরাটের এই বার্তাটি ভারতবাসী হৃদয়ঙ্গম করিলে ভারতের মস্ত লাভ। যে কোনও কথায় যে কাহারও ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকিয়া পড়া চলে না, এই কথাটিও ভারতীয়রা শিখিতে পারে। রাহুল গাঁধীকে রাজনৈতিক আক্রমণ করিতে যে ইতালির প্রসঙ্গ টানিবার প্রয়োজন নাই, অথবা উমর খালিদের বিরুদ্ধে রাগ যে তাঁহার পরিবারের উপর উগড়াইয়া দেওয়া চলে না, বিরাট কোহালির নিকট ভারতীয় রাজনীতি এই কথাটি শিখুক।

এবং, গোটা দেশ শিখুক, অন্যায়ের প্রতিবাদ করিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনও প্রয়োজন নাই। এই মুহূর্তে অনুষ্কা শর্মা বিরাট কোহালির কেহ নহেন। তবুও কোহালি নিজের ভক্তদের চটাইতে দ্বিধা করেন নাই। কোন প্রতিবাদ কতখানি লাভজনক হইতে পারে, সেই হিসাবটি ভুলিয়াই প্রতিবাদ করিতে হয়। পথেঘাটে কোনও মহিলার লাঞ্ছনা দেখিয়াও যাঁহারা মুখ ফিরাইয়া চলিয়া যান, প্রতিবেশীর বাড়িতে গার্হস্থ্য হিংসা দেখিয়াও যাঁহারা চুপ করিয়া থাকেন, তাঁহারা শিখুন, প্রতিবাদ করা উচিত বলিয়াই প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। তাহার জন্য আত্মীয়তার প্রয়োজন নাই, ব্যক্তিগত নৈকট্যও অনাবশ্যক। যাঁহারা বিরাট কোহালির চুলের ছাঁট নকল করিতেছেন, তাঁহারা নায়কের চরিত্রটিও নকল করিতে পারেন। সেই ছাপ আজীবন থাকিবে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy