পথ দেখাইল বিহার। সে রাজ্যের পুর্ণিয়া জেলার একটি ব্লকে রেশনে খাদ্যশস্য বণ্টন না করিয়া, ভর্তুকির অর্থ সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছাইবার প্রক্রিয়া শুরু হইতেছে। ইতিপূর্বে কেন্দ্রশাসিত তিনটি অঞ্চলে এই পরীক্ষা শুরু হইলেও, রাজ্যগুলির মধ্যে বিহারেই ইহার সূচনা হইল। এই উদ্যোগ স্বাগত। কার্যকরী, সার্থক প্রকল্পের জন্য যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন, সে সত্যটা এ দেশে সহজে কেহ স্বীকার করে না। ভারতে নেতারা মনে করেন, মানুষের উপকার করিবার সদিচ্ছা থাকিলেই যথেষ্ট। পরিকল্পনার খুঁটিনাটি লইয়া সময় নষ্ট করিবার অর্থ হয় না। ফলে অধিকাংশ সরকারি প্রকল্প বিপুল ব্যয়ে অশ্বডিম্ব প্রসব করিয়া থাকে। অথচ কী উপায়ে খরচ কমাইয়া প্রকল্পের লক্ষ্য দ্রুত সাধন করা যায়, তাহার নানা পদ্ধতি লইয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। রেশন দোকানের মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ অপচয়ের অন্যতম দৃষ্টান্ত। খাদ্যশস্য কিনিতে, মজুত করিতে এবং বিতরণ করিতে এক বিপুল, বিস্তীর্ণ প্রক্রিয়া সরকারকে চালাইতে হয়। তাহাতে ব্যয় যেমন অত্যধিক, অপচয়ও তদ্রূপ। দুর্নীতি, বিলম্ব, নিম্নমান, এমন বহুবিধ অভিযোগে রেশন ব্যবস্থা চিরকালই বিদ্ধ হইয়াছে। তৎসহ, যথাযথ পুষ্টির জন্য সকলকে খাদ্যশস্যই দিতে হইবে এমন নহে। অর্থ হাতে পাইলে যাহার যে খাদ্যদ্রব্য প্রয়োজন, সে তাহাই কিনিতে পারে। তাই চাল-গম বিতরণের পরিবর্তে তাহার অর্থমূল্য সরাসরি উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে পৌঁছাইয়া দিবার প্রস্তাব বহুদিন ধরিয়াই নীতি প্রণেতাদের একটি অংশ করিয়া আসিতেছেন। শস্য বিতরণের পক্ষেও যুক্তি রহিয়াছে। যাহার মধ্যে প্রধান, টাকা হাতে পাইলে তাহা যে পরিবারের পুষ্টির জন্যই খরচ হইবে, তাহার নিশ্চয়তা নাই। তাই মহিলা ও শিশুদের পুষ্টির স্বার্থে চাল-গম বিতরণই শ্রেয়, এমন সওয়াল করিয়াছেন অনেকে।
এই যুক্তিগুলির মধ্যে কোনটি অধিক গ্রহণযোগ্য, তাহা কেবল বিতর্কের মাধ্যমে নির্ধারণ সম্ভব নহে। হাতে-কলমে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে, কোনটি মানুষের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হইতেছে, কোনটি প্রার্থিত ফল আনিয়া দিতেছে। ইতিপূর্বে দিল্লি সরকারের সহায়তায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একশোটি দরিদ্র পরিবারকে পরীক্ষামূলক ভাবে শস্যের পরিবর্তে টাকা দিয়াছিল। দেখা গিয়াছে, মাসে হাজার টাকা পাইয়া পরিবারগুলির চাল-গমের জন্য খরচ কমিয়া যায় নাই, বরং ডাল ও ডিম-মাছ-মাংসের জন্য খরচ বাড়িয়াছে। অর্থাৎ শস্যের পরিবর্তে টাকা দিলে তাহাতে পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ কমিতে পারে, এই আশঙ্কা সত্য হয় নাই। যাহারা টাকা পাইয়াছে, সেই সকল পরিবার ফের শস্য পাইবার প্রথায় ফিরিয়া যাইতে আগ্রহও দেখায় নাই। যে তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অর্থ দিবার পদ্ধতি চালু হইয়াছে, সেখানে দুর্নীতি রোধ করা গিয়াছে। কেবল চন্ডীগড়েই কয়েক হাজার ভুয়ো কার্ড বাতিল হইয়াছে। অতএব কোন পদ্ধতি ভাল, সে সম্পর্কে কোনও ধারণার বশবর্তী না হইয়া পরীক্ষা করাই প্রার্থনীয়। অবশ্য তাহার জন্য যথেষ্ট সময় লইয়া আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। কসবা ব্লকে গত নভেম্বর মাস হইতে দেড় লক্ষাধিক গ্রাহকের প্রায় ৪০ শতাংশের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলিবার কাজ চলিতেছে। আধার কার্ড বিতরণের কাজও চলিতেছে। সরকারি শিবির খুলিয়া এবং প্রচার করিয়া এই সকল কাজ ত্বরান্বিত করা হইয়াছে। পশ্চিমবঙ্গেও গণবণ্টন এই ধরনের পরীক্ষা একান্ত প্রয়োজন। দারিদ্র নিরসনের অন্যতম উপায় অপচয় প্রতিরোধ।