ভারতীয় জনতা পার্টি ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে আপন রাজনৈতিক জোট এনডিএ-র পুনর্গঠনের উদ্যোগ চালাইয়া যাইতেছে। সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে করুণানিধি কিংবা জয়ললিতার সহিত জোটের আশা পূরণ না-হওয়ায় হতাশ হওয়ার পরিবর্তে বিজেপি নেতৃত্ব রাজ্যের অন্য পাঁচটি ছোট দলের সহিত সফল বোঝাপড়ায় উপনীত। চলচ্চিত্রাভিনেতা বিজয়কান্তের ডিএমডিকে, এস রামাডস-এর পিএমকে, ভাইকো-র এমডিএমকে, এবং আরও দুইটি ছোট দলের সহিত আসনরফা সম্পূর্ণ করিয়া বিজেপি দেখাইয়া দিয়াছে, যেখানে বড় সাফল্যের সম্ভাবনা নাই সেখানেও, প্রয়োজনে নিজস্ব সংকীর্ণ স্বার্থ ছাড়িয়া দিয়াও, জোটের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে এই দল পিছপা নহে। ভাল ফলের সম্ভাবনা রহিয়াছে, এমন আসনও বিজেপি শরিকদের ছাড়িয়া দিয়াছে। এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিই জোট রাজনীতিতে সাফল্যের চাবিকাঠি।
এমন নহে যে, এই জোট তামিলনাড়ুতে সিংহভাগ আসন দখল করিবে। তামিলনাড়ুর রাজনীতি বহুলাংশে দুই মেরুতেই বিভাজিত। অধিকাংশ আসন সম্ভবত জয়ললিতা এবং করুণানিধির দুই বৃহৎ প্রাদেশিক দলেরই করায়ত্ত হইবে। কিন্তু সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বিজেপির জোটবন্ধন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতদ্দ্বারা উত্তর ভারতের এই দলটি তামিল রাজনীতির পিঠে সওয়ার হইয়াই দক্ষিণ ভারতে এনডিএ-র নবপর্যায়ের সম্প্রসারণ করিতে চাহিতেছে। কাজটি কঠিন। যে পাঁচটি ছোট দল বিজেপির রামধনু জোটে শামিল, তাহাদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ নেহাত কম নয়। কিন্তু বিজেপির ম্যানেজাররা সেই বিরোধ অন্তত অংশত নিয়ন্ত্রিত করিয়াছেন। একই ধরনের তৎপরতা মহারাষ্ট্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের অনুগামীদের সহিত রফায় আসিতেও বিজেপিকে সাহায্য করিয়াছে। এই উদ্যোগগুলি বিজেপির আন্তরিক উদারতার প্রমাণ কি না, তাহা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। রাজনীতি আন্তরিকতার স্থান নহে, বাস্তব বুদ্ধিই সেখানে বিচার্য। অটলবিহারী বাজপেয়ীর জোট-সাফল্য এই বাস্তববুদ্ধির প্রমাণ ছিল। তাঁহার দল সম্ভবত সে কথা ভোলে নাই।
পরিস্থিতির গতি যে দিকে, তাহাতে অন্য জাতীয় দল কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা দিন-দিন স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। তাহার নেতৃত্বে গঠিত জোট ইউপিএ-র পুরানো শরিকরা অনেকেই সঙ্গ ছাড়িয়াছে বা ছাড়িতে উদ্যত। বিহারে লোকজনশক্তি পার্টি, ডিএমকে-র করুণানিধি ইউপিএ ছাড়িয়াছে। জম্মু-কাশ্মীরে ন্যাশনাল কনফারেন্স এনডিএ-তে ফিরিয়া যাইবে কিনা ভাবিতেছে। মায়াবতী একা লড়িতে মনস্থ করিয়াছেন, মুলায়ম সিংহ যাদবেরও এখনই কংগ্রেসের সহিত গাঁটছড়ায় আগ্রহ নাই। অজিত সিংহের রাষ্ট্রীয় লোকদল ইউপিএ সম্পর্কে আগ্রহী নয়। নূতন কেহও ইউপিএ-তে আসিতে চাহে না। বিজু জনতা, সংযুক্ত জনতা, তেলুগু দেশম, জগন্মোহনের ওয়াইএসআর কংগ্রেস সকলেই বিমুখ। এমনকী তেলঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতিও ইউপিএ অপেক্ষা এনডিএ-তে যাইতে অধিকতর আগ্রহী। তামিলনাড়ু সহ অন্যত্র বিজেপির জোট গড়ার তৎপরতাকে এই প্রেক্ষিতে বিচার করিতে হইবে। এমন হইতেই পারে যে, এত কিছুর পরেও আঞ্চলিক বা গোষ্ঠীগত দলগুলি ষোড়শ লোকসভায় প্রান্তিক, অপ্রাসঙ্গিক হইয়া গেল এবং লড়াই দাঁড়াইল দুই প্রধান জাতীয় দলের মধ্যেই। সে ক্ষেত্রেও বিজেপির নেতৃত্বের তরফে জোট গড়ার, আসনরফার জন্য সম্মানজনক শর্তে দরকষাকষি করার এই প্রবণতাটি প্রশংসার যোগ্য। কংগ্রেসের হাই কমান্ড ইহা হইতে কিছুমাত্র শিক্ষা লইবে, এমন কথা মনে করিবার অবশ্য কোনও কারণ নাই।