স্বাধীনতার সাত দশক পার করিয়াও কেন শিশুশ্রমকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিতে পারে না একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র? প্রশ্নটি তুলিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। শনিবার কলিকাতার আইন বিশ্ববিদ্যালয় এনইউজেএস-এ ‘শিশু অধিকার কেন্দ্র’ উদ্বোধন উপলক্ষে বিচারপতি বলেন, শিশু সুরক্ষা আইন পাশ হইয়াছে। তাহার পরেও রাষ্ট্র কী করিয়া পারিবারিক কাজে শিশুশ্রমকে বৈধ করিতে পারে? প্রশ্নটি প্রণিধানযোগ্য। শিশুশ্রম প্রতিরোধের যে আইন মোদী সরকার পাশ করিয়াছে, তাহা সম্মুখের ফটক বন্ধ করিয়া পিছনের দরজাটি হাট করিয়া খুলিবার শামিল। নাবালক মুক্তবাজারে শ্রম বিক্রি করিতে পারে না। পরিবারই বরাবর তাহার শ্রমকে ব্যবহার বা বিক্রয় করিয়া থাকে। চাষের খেত, কার্পেট, চুড়ি, বিড়ি এমন বহু পারিবারিক ব্যবসা শিশুশ্রমের উপর নির্ভরশীল। পূর্বে দরিদ্র পরিবার বিদ্যালয়কেই বাহুল্য বলিয়া মনে করিত। এখন বিদ্যালয়ে সন্তানের নামটি লিখাইয়া রাখে। কিন্তু তাহাকে শ্রমসাধ্য ও সময়সাধ্য কাজে নিযুক্ত করিতে দ্বিধা করে না। ফলে বিদ্যালয়ে শিশুর উপস্থিতি অনিয়মিত হইতে হইতে শেষ অবধি থামিয়া যায়। অর্থাৎ শৈশবেই তাহার ছাত্র-সত্তাটি হইতে শ্রমিক-সত্তাটি লালিত হয় বেশি। ইহার ফলে অগণিত পরিবারে শিশুশ্রম হইতে দারিদ্র, এবং দারিদ্র হইতে শিশুশ্রম, এই দুষ্টচক্র চলিতে থাকে। বিনা পয়সায় শিক্ষার ব্যবস্থা থাকিলেও শিশু তাহার নাগাল পায় না। ফলে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিতে পায় না।
এই অসাম্য হইতে মুক্তি খুঁজিবার জন্যই সকল প্রকারের শিশুশ্রম বন্ধ করিবার পক্ষে সওয়াল উঠিয়াছিল। কিন্তু এনডিএ সরকার যে আইন করিয়াছে, তাহাতে কার্যত শিশুশ্রম রুখিবার কোনও অস্ত্র প্রশাসনের হাতে থাকিল না। যে কোনও শ্রমকেই ‘পারিবারিক’ বলিয়া দেখাইবার সহজ রাস্তাটি খোলা থাকিল। কাকার ইটভাটা, মামার পটল খেত, মাসির ভাতের হোটেল, সকলই এখন শিশুর কাজ করিবার উপযুক্ত। এই পরিবর্তনের পিছনে কাজ করিতেছে একটি মানসিকতা তথা দৃষ্টিভঙ্গি। গরিব ঘরের শিশুরা পড়িতে যাইবার পূর্বে খেতে কাজ করিবে, ফিরিয়া বিড়ি বাঁধিবে, জরির নকশা ফুটাইবে, ইহাতে সরকার মন্দ কিছু দেখিতেছে না। উহা যে পরিবারের কাজ। লক্ষণীয়, ভারতে ‘গৃহভিত্তিক’ কাজ ক্রমশ বাড়িতেছে। বর্তমানে তিন কোটিরও অধিক কর্মী বাড়ি হইতে কাজ করেন। এবং তাহার একটি বড় অংশ শিশুকর্মী। এত দিন তাহাদের লুকাইত পরিবার। এখন সেই দায় রহিল না।
সাফ সাফ বলা দরকার, শিশুর শ্রমকে পরিবার কাজে লাগাইলে দোষ নাই, এমন একটি অবস্থান লইয়া সরকার ভাবের ঘরে চুরি করিতেছে। প্রশ্ন উঠিতে পারে, রাষ্ট্র কেন পরিবারের অন্দরে ঢুকিবে? প্রশ্নটি অ-বাস্তবোচিত। ভারতীয় পরিবারে শিশু ও নারীর প্রতি বহু বঞ্চনা ঘটিয়া থাকে, ইহা প্রমাণিত। তৎসত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিবারের চৌকাঠে থমকিয়া দাঁড়াইবে কেন? এবং এই প্রেক্ষিতে মনে রাখা দরকার, দরিদ্র পরিবার সর্বদা নিরুপায় হইয়া শিশুকে কাজে পাঠাইয়া থাকে— এই বহুলপ্রচলিত ধারণাটি আসলে ভ্রান্ত। শিশুর শ্রম সহজলভ্য সম্পদ, তাই পরিবার ইহাকে কাজে লাগায়। সর্বোপরি, দরিদ্র পরিবারের আর্থিক এবং সামাজিক সুরক্ষা দিবার কাজ সরকারের। তাহার জন্য বহু সরকারি প্রকল্প রহিয়াছে। সেগুলি তাহাদের নিকট পৌঁছাইতে ব্যর্থ হইয়া, ঘাটতি পুরাইতে শিশুর শ্রমকে বৈধ করিল সরকার। অর্থাৎ দরিদ্র শিশুরা তাহাদের শ্রম দিয়া কার্যত সরকারকে ভর্তুকি দিতেছে। যে সাংসদরা নিজেদের বেতন দেড়গুণ বাড়াইবার প্রস্তাব পাশ করেন, তাঁহারাই গরিবের শিশুর বেগার খাটিবার আইন করিলেন। বাহবা গণতন্ত্র।