Advertisement
E-Paper

সুরেন্দ্রনাথের ‘চারতলা’ নিয়েও এ বার অভিযোগ! কী চলত সেখানে? কলেজের আর কোন ‘দুর্নীতি’ সামনে এল

শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বহিরাগতেরা এসে প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের নামের তালিকা বানাতেন। নানা ছুতোয় তাঁদের সঙ্গে আলাপ জমাতেন। তার পর তা গড়াত আরও দূর। সে সব নিয়ে ‘মুখ খোলার’ পরিবেশ ছিল না বলে অভিযোগ সুরেন্দ্রনাথের ছাত্রীদের।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ১৯:৫৩
সুরেন্দ্রনাথ কলেজ।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। নিজস্ব চিত্র।

শুধু পাঁচতলা নয়, সুরেন্দ্রনাথ কলেজে একটা চারতলাও আছে। সেখানেও নানা ঘটনা নিয়ে আছে অভিযোগের পাহাড়।

গত মঙ্গলবার সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্রসংসদের কার্যালয়ের আলমারি থেকে উদ্ধার হওয়া সুটকেস ভর্তি উই-ধরা টাকা উদ্ধার হয়েছে। তার পর পাঁচতলায় শোয়ার ঘর ঘিরে হইচই পড়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে বুধবার কলেজে গিয়ে শোনা গেল, সেখানকার চারতলা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।

কিন্তু কী রয়েছে ওই চারতলায়?

চারতলায় রয়েছে সারিবদ্ধ শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকাই সেখানে ক্লাস করাতে যান না, দাবি করলেন এক ছাত্রী। অভিযোগ, ওই চারতলার ফাঁকা ঘরগুলিতে অবাধ যাতায়াত ছিল পড়ুয়াদের একাংশের। আসতেন বেশ কিছু বহিরাগত, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কলেজের প্রাক্তনী। নীচে যখন চলছে পঠনপাঠন, তখনই প্রাক্তনীদের মনোরঞ্জন করতে হত প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের। একসঙ্গে ঘরে ঢুকতেন একাধিক ব্যক্তি বলেও অভিযোগ।

এ সব কথা জানা ছিল অনেকের। এক দিন নিজের চোখে দেখেও ফেলেন এক ছাত্রী। বুধবার ওই কলেজের স্নাতক স্তরের চতুর্থ সেমেস্টারের ছাত্রী পায়েল গোয়ালা বলেন, ‘‘আমি আর আমার এক বান্ধবী একদিন ওই চারতলায় গিয়ে দেখি ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ। ভেবেছিলাম কেউ নেই, আমরা একটু বসে সময় কাটাব। কিন্তু দরজায় ধাক্কা দিতেই বুঝলাম ভিতর থেকে বন্ধ করা। বেশ কয়েক বার ধাক্কা দেওয়ার পরেও কেউ খুলল না। বুঝলাম ভিতরে কেউ রয়েছে। তার পরে মনে পড়ে গেল ‘চারতলা’র শোনা ‘গল্প’। সঙ্গে সঙ্গেই নীচে নেমে চলে আসি।’’

অন্য আর এক ছাত্রীর কথায় উঠে আসে আলোচিত সেই চারতলা সংক্রান্ত আরও তথ্য। ওই ছাত্রীর দাবি, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে কোনও কোনও প্রাক্তন ছাত্র এসে প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের তালিকা তৈরি করতেন। তার পর নানা ছুতোয় তাঁদের সঙ্গে আলাপ জমাতেন। তার পর তা গড়াত শারীরিক সম্পর্কে। তবে একজন নয়, এমন সম্পর্ক গড়তে হত বহুজনের সঙ্গে। অভিযোগ, এ তথ্য অনেকের জানা থাকলেও তা নিয়ে ‘মুখ খোলার’ পরিবেশ কখনও ছিল না কলেজে।

কিন্তু কী ভাবে এই সব অভিযোগ সামনে এল?

পায়েল জানান, তাঁরই এক বান্ধবী এই চক্রে পড়ে গিয়েছিলেন। এক সময়ে তিনি প্রতিবাদ করেন। কিন্তু সে সময়ে মোবাইলে তাঁর বেশ কিছু আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করে দেওয়া হয়। আইনি পদক্ষেপ না করলেও প্রতিবাদ করেন। ঘটনার কথা জানানো হয় দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে জেঠু ওরফে কানকাটা দেবুকে। অভিযোগ, তিনি সালিশি করে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দেন। সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে ভুক্তোভোগী ছাত্রীও আর কিছু বলেননি।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজের আর এক ছাত্রী মোনালিসা হেলা বুধবার বলেন, ‘‘আমাদের সামনে এ সব অন্যায় হত। কতকিছু দেখেছি। কিন্তু ভয়ে বলতে পারতাম না। পায়েলকে ওঁর বান্ধবী এসে ঘটনাটি জানালে ও প্রতিবাদ করে। সে সময়ে ওকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।’’ পায়েল জানান, তাঁকে কলেজে আসতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন পার্টির দাদারা। সে বারও পায়েল দ্বারস্থ হয়েছিলেন ‘জেঠু’র। ছাত্রীরা জানান, বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত তিনিই ছিলেন এই কলেজের ‘দণ্ডমুণ্ডের কর্তা’। তাই তাঁর হস্তক্ষেপে পায়েল মুক্তি পান। কলেজের ক্লাসে আসতে তাঁর আর অসুবিধা হয়নি বলেই দাবি। কিন্তু, অসামাজিক কাজ বন্ধ হয়নি বলেই অভিযোগ। এর পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাঁচতলার উদ্বোধন হয়।

তবে শুধু এটুকুই নয়। সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তির জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পড়ুয়াদের একাংশ। মেধাতালিকায় নাম না থাকলেও তৃণমূল ছাত্রনেতাদের মোটা টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়া গিয়েছিল প্রায় ১৪৪ বছরের প্রাচীন এই কলেজে।

বুধবার দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র অভিযোগ করেন, গত বছরে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য তাঁকে ৬০,০০০ টাকা দিতে হয়েছে। প্রথমে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ‘সিট বুক’ করতে হয়েছে। সে সময়ে তাঁর মার্কশিট জমা রাখেন সকলের ‘জেঠু’র এক শাগরেদ। পুরো টাকা জমা দেওয়ার পরে মার্কশিট হাতে পান। ভর্তির সুযোগও মিলে যায়।

কিন্তু পোর্টালের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু থাকার পরও কী ভাবে টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হচ্ছে? ওই পড়ুয়ার দাবি, “কলেজের তরফে কিছু আসন আটকে রাখা হয়। পোর্টালে তা দেখায় না। ওই সব আসনেই অর্থের বিনিময়ে ভর্তি নেওয়া হয়।” আর এক ছাত্রের অভিযোগ, ভূগোলে ভর্তি হওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে দেড় লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক তৃণমূল সাংসদের সুপারিশ থাকায়, তাঁকে ওই টাকা দিতে হয়নি।

বেশির ভাগ পড়ুয়ারই দাবি, এত দিন রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূলের ভয়েই তাঁরা এ সব কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেননি। কোথাও অভিযোগও দায়ের করা যায়নি। বুধবার কলেজে বিক্ষোভ দেখায় অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ। সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ এবং সুরেন্দ্রনাথ দিবা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেন তাঁরা। দ্রুত কলেজে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।

শুধু পড়ুয়ারা নন। সব জেনেও আতঙ্কে মুখ বন্ধ রাখার কথা বলেছেন শিক্ষকদের একাংশও। বাংলার এক শিক্ষক জানিয়েছেন, কলেজের ভিতরে কার জন্য শোয়ারঘর তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগলেও বিরোধিতা করতে পারেননি। “কারণ, সেই পরিস্থিতি ছিল না, আমাদেরও সাহস ছিল না”, বলছেন তিনি।

তবে এ বারে পদক্ষেপ করা হবে আশ্বাস দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের উপাধ্যক্ষ মহম্মদি তারানুম। সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ভবনে চলে চারটি কলেজ— মহিলা, দিবা, আইন এবং সান্ধ্য কলেজ। আপাতত স্থির হয়েছে গোটা ক্যাম্পাসে নজরদার ক্যামেরা বসানো হবে। কলেজ প্রাঙ্গণে বহিরাগতের প্রবেশেও কড়াকড়ি করা হবে। পড়ুয়াদের পরিচয়পত্রে বিশেষ চিপ বসিয়ে দেওয়া হবে বলে জানা যাচ্ছে। ওই বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁদের উপস্থিতি গণ্য করা হবে এবং দরজা খুলবে বলে জানা যাচ্ছে।

কলেজের বাইরে এবিভিপি-র বিক্ষোভ।

কলেজের বাইরে এবিভিপি-র বিক্ষোভ। নিজস্ব চিত্র।

প্রশাসনিক কাজে কেউ কলেজে এলে, তাঁদের ভিজ়িটার স্লিপে সই করিয়ে নেওয়া হবে বলে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ছাত্র সংসদের অনুষ্ঠানের নামে যে টাকা জমা করা হয়েছে, তা-ও অডিট করিয়ে রিপোর্ট উচ্চশিক্ষা দফতরের ডিপিআই-এ কাছে পাঠানোর দাবি উঠেছে এবিভিপি-র তরফে। সংগঠনের কলকাতা মহানগরের সম্পাদক স্বাধীন হালদার বলেন, ‘‘কলেজে পঠনপাঠনের পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা যেন মুক্ত মনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে পারে, সেই দাবিই জানানো হচ্ছে।’’

কলেজের পড়ুয়াদের অভিযোগ, কলেজের পরিচালন সমিতির সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে কলেজের সঙ্গে দেবাশিসের সম্পর্ক থাকলেও আদতে তিনিই ছিলেন কলেজের ‘কর্তা’। সম্প্রতি কলেজ কর্তৃপক্ষ দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরিতোষ দত্তের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন।

College Surendranath College
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy