হাতে মাত্র তিন সপ্তাহ। তার মধ্যে শেষ করতে হবে তিন মাসের পাঠ্যক্রম! সরকারি বই হাতে না পেয়ে বিপাকে রাজ্যের উচ্চ প্রাথমিক পড়ুয়ারা।
শিক্ষা মহল সূত্রের খবর, জানুয়ারি মাসের প্রথম কর্মদিবসে ঘটা করে বই দিবস এবং প্রথম সপ্তাহে ‘পড়ুয়া সপ্তাহ’ পালন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী বই দিবসেই সব পড়ুয়ার হাতে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার কথা। বহু ক্ষেত্রেই সেই বই পেতে সপ্তাহ পার হয়ে যায় বলে অভিযোগ। কিন্তু চলতি বছর তিন মাস পরও বই মেলেনি বলে জানা গিয়েছে। এ দিকে এগিয়ে এসেছে সামেটিভ পরীক্ষার দিন। কী ভাবে সব দিক সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন বিষয়ের বই পৌঁছায়নি ১৬ মার্চও। কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক চন্দন মাইতি বলেন, “ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়ারা এখনও ভূগোল বই পায়নি। সোমবার সকালে ফোন করে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খুব দ্রুত হলেও ওই বই পড়ুয়ারা পাবে মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ। তার আগে নয়। এ দিকে এপ্রিল থেকে পরীক্ষা। কী করে পরীক্ষা দেবে ওরা?”
একই পরিস্থিতি উত্তরবঙ্গেও। দক্ষিণ দিনাজপুরের বড়কইল হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক গৌরাঙ্গ দাস বলেন, “পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১৬০ পড়ুয়া মার্চের তৃতীয় সপ্তাহেও বই পায়নি। দফতরে জানিয়েছি। এ দিকে এপ্রিল থেকে পরীক্ষা।” তিনি জানান, কোনও কোনও পড়ুয়া বই পেয়েছে। তাদের থেকে সহপাঠীরা লিখে নিচ্ছে পাঠ্য বিষয়। কেউ আবার উঁচু ক্লাসের পড়ুয়াদের থেকে বই সংগ্রহ করে কোনও ভাবে পড়ার চেষ্টা করছে।
জলপাইগুড়ি জেলার বিবেকানন্দ হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষিকা আলো সরকার বলেন, “আমরা শঙ্কিত, পড়ুয়ারা কী ভাবে পরীক্ষা দেবে তা নিয়ে। অনেকে কোনও বিষয়ের বই পায়নি। শিক্ষকেরা খাতায় লিখিয়ে লিখিয়ে কোনও ভাবে ক্লাস করাচ্ছেন।” তিনি জানান, অষ্টম শ্রেণিতে কেউ ইতিহাস বই পায়নি। পাশাপশি ষষ্ঠ শ্রেণিতে একজন পড়ুয়াও ইংরেজি বই পায়নি বলে জানান তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতেও রয়েছে বইয়ের অকাল।
এক সময় প্রাথমিকের সরকারি বই বছর শেষে ফেরত দিয়ে দিতে হত পড়ুয়াদের। নতুন বই না আসা পর্যন্ত আগের বছরের সেই বই-ই তুলে দেওয়া হত পরের বছরের পড়ুয়াদের হাতে। কিন্তু এখন আর তা হয় না। ফলে পুরনো বই-ও থাকে না স্কুলের হাতে। উপায়ান্তর না দেখে আপাতত উঁচু ক্লাসের পড়ুয়াদের থেকে বই নিয়ে তার প্রতিলিপি করিয়েই নিচু ক্লাসের পড়ুয়াদের পড়াচ্ছেন শিক্ষকেরা।
হাউরি দীননাথ হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা দীপান্বিতা সরকার বলেন, “কখনও খাতা থেকে কখনও অন্য কোনও বই থেকে প্রতিলিপি করিয়ে পড়াশোনা চালাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। আমরাও যথাসাধ্য সাহায্য করছি। কিন্তু আখেরে পঠনপাঠন ব্যাহত হচ্ছে।”
হরিনাভি সুভাষিণী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা পামেলা সরকার বলেন, “এপ্রিল থেকেই পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এখনও অনেক পড়ুয়া বই পায়নি। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। হয়তো দ্রুত বই পাওয়া যাবে। কিন্তু পড়ুয়ারা সমস্যায় পড়বেই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানিয়েছেন, পাঠ্যক্রম তৈরি করা এবং সপ্তাহ অনুযায়ী সেগুলির ক্লাস করিয়ে সামেটিভ পরীক্ষা নেওয়া— পুরোটাই এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হয়। সেই পদ্ধতি মেনে পড়ুয়াদের ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, সরকার নিজেই নিজের বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ভেঙে ফেলছে। তিন মাসের পাঠ্যক্রম কী করে দু’সপ্তাহের মধ্যে শেষ করবেন শিক্ষকেরা? পড়ুয়ারাই বা কী করে এত পড়া আত্মস্থ করবে?”
এই সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়ে জেলা স্কুল পরিদর্শক বিভাগের এক আধিকারিক জানান, জেলায় বিক্ষিপ্ত ভাবে এই সমস্যা রয়েছে। ইতিমধ্যে স্কুলশিক্ষা দফতরকে এই বিষয়ে জানানো হয়েছে। দ্রুত সব বই পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছে যাবে। একই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে স্কুলশিক্ষা দফতরের তরফে। এক কর্তার দাবি, “অধিকাংশ বই স্কুলে পৌঁছে গিয়েছে। যেগুলি বাকি রয়েছে, সেগুলিও দ্রুত পৌঁছে যাবে।”
যদিও এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, তিন মাস পরও যদি বই হাতে না পাওয়া যায়, তা হলে ঘটা করে ‘বই দিবস’ পালনের অর্থ কী? ওই দিনই যাতে বই হাতে পায় পড়ুয়ারা, তা সুনিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।