সব সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের পোশাক হবে এক রকম— এমনই নির্দেশিকা দিয়েছিল তৃণমূল সরকার। পালা বদলের পর নিজেদের পুরনো ঐতিহ্যের পোশাকে ফিরতে চাইছে অনেক স্কুলই।
পড়ুয়াদের পোশাকের রং, ব্যাজ স্কুলের পরিচয় বহন করে। অভিযোগ, রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সাল থেকেই সব স্কুলের পোশাক নীল-সাদা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু তখনও জোর করে তা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। ২০২২ থেকে ওই নীল-সাদা পোশাক বাধ্যতামূলক করা হয়। স্কুলের ব্যাজের বদলে ওই পোশাকে সাঁটিয়ে দেওয়া হয় বিশ্ববাংলার লোগো। শিক্ষামহলের দাবি, এতে আহত হয়েছিল বহু ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ভাবাবেগ।
শুধ স্কুলের পোশাক নয়। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর সব ধরনের সরকারি ভবন, নির্মাণেও নীল-সাদা রঙের ব্যবস্থা করা হয়। সদর দফতর নবান্নেও সেই একই রং করা হয়। বাংলা আবাস যোজনায় নির্মিত বাড়িতেও একই রং করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি এক সময় গৃহস্থ বাড়িতে নীল-সাদা রং করালে করছাড়ের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। যদিও কলকাতা পুরসভা-সহ বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ভবনকে সেই তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়।
তৃণমূল সরকারের পতনের পরে অনেক স্কুলই চাইছে পুরনো পোশাক ফিরিয়ে আনতে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রাজ্যের সব সরকারি, সরকার পোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে নীল-সাদা পোশাক চালু করার সিদ্ধান্তে আপত্তি উঠেছিল সেই সময়েই। কোনও কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিলেন, সব স্কুলের পোশাক অভিন্ন (নীল-সাদা) হয়ে গেলে স্কুলের নিজস্বতা ও ঐতিহ্য হারাবে। স্কুলপোশাকে সরকারের বিশ্ব বাংলা লোগো থাকবে কেন, তা নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলের প্রধানশিক্ষক বলেন, ‘‘মন থেকে মেনে না নিতে পারলেও মেনে নিতে হয়েছিল। সরকারি স্কুলে পড়িয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত তো মানতেই হবে।’’
এ বার সরব হয়েছেন শিক্ষকেরা। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বৃহস্পতিবারই স্কুলশিক্ষা দফতরে আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সরকার গঠনের পরেই যেন এই বিষয়টি নিয়ে ভাবা হয়। তিনি বলেন, ‘‘স্কুলের ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত পুরনো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা উচিত।’’
এমনকি বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু যে স্কুলের প্রাক্তনী সেই নারায়ণদাস বাঙ্গুর স্কুলের প্রধানশিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়া এ দিন বলেন, ‘‘আমি চাই প্রতিটি স্কুলের পৃথক পরিচয় থাকুক। তাদের লোগো এবং স্কুলের পোশাকের সঙ্গে বহু আবেগ জড়িয়ে থাকে। নীল সাদা করে দেওয়ার সেটাই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।” তিনি জানান, সরকারের দেওয়া পোশাকে বিশ্ববাংলার লোগো সেলাই করা থাকত। তাঁরা নিজ উদ্যোগে স্কুলের পরিচয়জ্ঞাপক লোগো সেলাই করে দিতেন।
প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব পড়ুয়াকে স্কুলের পোশাক দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল তৃণমূল সরকার। কিন্তু সে পোশাকের মান নিয়েও এখন প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের একাংশ। কলকাতার বিটি রোড হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘‘অত্যন্ত খারাপ মানের কাপড় দেওয়া হয়। পরার উপযুক্তই নয়। আসলে এটাও একটা দুর্নীতি ছিল। পুরসভা দরপত্র আহ্বান করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে দিয়ে তৈরি করাত। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’’ তাঁর দাবি, পোশাকের বদলে সরকার পড়ুয়াদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিতে পারে।
তবে, ২০২২-এ সব স্কুলই যে নীল-সাদা পোশাক বেছে নিয়েছিল, তা নয়। যেমন বেথুন কলেজিয়েট স্কুলের তরফে জানা গিয়েছে ঐতিহ্যের কথা বিবেচনা করে সরকারের কাছে আর্জি জানানো হয়েছিল। তাই সাদা পোশাকই বহাল ছিল।