প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে চলেছে বিজেপি সরকার। ভোটের ফলঘোষণার পর থেকে সমাজমাধ্যমে আশা-আশঙ্কার দোলাচল। এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে একটি ঘোষণা, রাজ্যে কলেজগুলিতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন নাকি আর হবে না। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নাকি এ বার রাজনীতিমুক্ত হবে। পড়ুয়ারা শুধুই পড়াশোনা করবে, রাজনীতি নয়।
হিসাব বলছে গত আট বছর এ রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রসংসদ গঠন করা যায়নি। হয়নি ছাত্রভোট। বার বার তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রসংসদ নিষ্ক্রিয় করে রাখার। অথচ, এই বাংলার ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে লেখা রয়েছে ছাত্র আন্দোলনের কাহিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মন্ত্রিসভার বহু নেতাই উঠে এসেছিলেন ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে।
কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদ থেকে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (এসএফআই) হয়ে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ, পশ্চিমবঙ্গের উচ্চ শিক্ষা দেখেছে নানা ঘাত প্রতিঘাত। এ বার কি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) পালা? মঙ্গলবারই ছাত্র সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ডিএসও-এবিভিপি সংঘর্ষে জখম হয়েছেন বেশ কয়েকজন ছাত্র। অভিযোগ উঠেছে ছাত্রীদের গায়ে হাত তোলারও।
এই আবহে এবিভিপি জানিয়েছে, মোটেও তারা ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে নয়। বরং ক্ষমতায় এলেই ছাত্র নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। তার মধ্যে রাজ্যের ১০০ শতাংশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনের কর্মকাণ্ড শুরু করতে চাইছে এবিভিপি।
সংগঠনের দাবি, রাজ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবিভিপি-র উপস্থিতি রয়েছে। হিসাব বলছে, উত্তরবঙ্গ, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সংগঠন রয়েছে। এ বার কলকাতা ও শহরতলিতেও সেই সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
এবিভিপি-র রাষ্ট্রীয় মিডিয়া সেলের সহ-আহ্বায়ক দেবাঞ্জন পাল জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই গোটা রাজ্য থেকে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এবিভিপি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছেন। তাঁর দাবি, “তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সদস্যেরা সব থেকে বেশি যোগ দিতে চাইছেন আমাদের সংগঠনে। কিন্তু নেতৃত্বের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ক্যাম্পাসের পরিবেশ যাঁরা এত দিন নষ্ট করে এসেছেন, ভাবমূর্তি খারাপ তাঁদের কোনও ভাবেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না।” এর পাশাপাশি একেবারে আনকোরা পড়ুয়ারাও দক্ষিণপন্থী ছাত্র আন্দোলনে সামিল হতে চাইছেন বলে দেবাঞ্জনের। সংগঠনের কাজ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে গত কয়েক দিনেই প্রায় ১০ শতাংশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনের শাখা খোলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, “২০১৭-র পর থেকে কোথাও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। এই ন’বছরে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা বুঝতেই পারলেন না ছাত্র রাজনীতি কী। তৃণমূল স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধ্বংস করেছে আমরা সেটা ফিরিয়ে আনব।” সরকার গঠনের পরই তাঁরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করার দাবি তুলবেন বলে জানিয়েছেন দেবাঞ্জন। লিংডো কমিশনের সুপারিশ মেনেই যত দ্রুত সম্ভব ও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন করানোর দাবি তুলছে এবিভিপি।
তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু সোমবারের পর থেকে রাজ্যের এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ যে ভাবে নষ্ট হচ্ছে তাকে ধিক্কার জানাচ্ছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আসুক এবং পড়ুয়ারা নিজেদের মতো করে যেন ছাত্রভোটে যোগ দিতে পারে, তা সুনিশ্চিত করা সব থেকে জরুরি।’’
এসএফআই-এ রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, ‘‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য দীর্ঘ ন’বছর লড়াই চালাচ্ছি আমরা। এবিভিপি-কে খুঁজে পাওয়া যায়নি আগে। এখন সরকারি ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পাস দখলে নেমেছে। বেশির ভাগ ক্যাম্পাসে বহিরাগত গুন্ডা ঢুকিয়ে ইউনিয়ন রুম দখলের চেষ্টা করছে।” তিনি দাবি করেন, এসএফআই দখলদারি, দাদাগিরি, হুমকি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়েছে, ভবিষ্যতেও লড়বে। এবিভিপি এখন সেই কালচারই নামাতে চাইছে কলেজে।