প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে করতেই চলছে সতীর্থকে বল পাস করা। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছেন ফুটবলারেরা। হাতাহাতির জেরে হলুদ কার্ড। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় কিছুতেই ডিফেন্স ভাঙতেই পারলেন না। লাইন পেরিয়ে বল ঢুকল জালে আর... গোওওওওওওওওওওওওল!
খেলার মাঠ জুড়ে হয়ে চলা এমন অসংখ্য রোমাঞ্চকর ঘটনার সাক্ষী হওয়ার এখন সুযোগ মেলে মোবাইল স্ক্রিনেই। তবে যতক্ষণ না খেলার বর্ণনা শোনা যাচ্ছে, ততক্ষণ নাকি ক্রীড়ামোদীরা খেলা দেখার মজা পান না।
এই মজা যাঁরা দিতে পারেন, সেই ধারাভাষ্যকারেরা নিজস্ব ছন্দে সাজিয়ে নেন দৃশ্যপটের বর্ণনা। তবে, কী হচ্ছে মাঠে, সেটা বলাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাঁর ক্রীড়াবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতার দক্ষতায় শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে খেলা ‘শোনার’ অভিজ্ঞতা।
ফুটবলের ধারাভাষ্যের ইতিহাস
সরাসরি ফুটবলের সম্প্রচার শুরু হয়েছিল ২২ জানুয়ারি, ১৯২৭। ওই দিন থেকেই ধারাভাষ্যও শোনানো হয়েছিল রেডিয়ো-এ। আর্সেনাল এবং শেফিল্ড ইউনাইট-এর ম্যাচের ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন প্রাক্তন রাগবি খেলোয়াড় হেনরি বিলথি থর্নহিল ওয়েকলাম।
এ দেশে অবশ্য ফুটবলের ধারাভাষ্য শুরু হয়েছে ১৯৫৬-র পর। ওই বছর ১৬ অগস্ট অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো-র সরাসরি সম্প্রচার মাধ্যমে গোল্ডেন ট্রফি ফুটবল প্রতিযোগিতার ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন দু’জন। প্রাক্তন ফুটবলার ও কোচ প্রদীপ কুমার বন্দোপাধ্যায় এবং নৃপেন্দ্র নাথ বসু-র কন্ঠে শোনা গিয়েছিল সেই ম্যাচের ঐতিহাসিক ধারাভাষ্য। ১৯৮০ পর্যন্ত সরকারি রেডিয়ো চ্যানেলে নিয়মিত ভাবে সব ম্যাচের ধারাভাষ্য শোনা যেতে। এ ক্ষেত্রে বাংলা এবং মালয়ালম ভাষায় সর্বাধিক সম্প্রচারের ইতিহাস রয়েছে।
প্রাক্তন ফুটবলার ও কোচ প্রদীপ কুমার বন্দোপাধ্যায়ের ধারাভাষ্য নিয়ে চর্চা হয় আজও। — ফাইল চিত্র।
১৯৮২ থেকে টেলিভিশনের মাধ্যমে ফুটবল ম্যাচের ধারাবিবরণী সম্প্রচারিত হওয়া শুরু হয়। প্রথমে নয়া দিল্লি, পরে কলকাতা, চেন্নাই, মুম্বই-এর দফতর থেকেও স্থানীয় ভাষায় ধারাভাষ্য দিতেন বিশেষজ্ঞেরা। এ দেশে ফুটবলের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে প্রাক্তন ফুটবলার থেকে শুরু করে সাংবাদিক অনেকেই ধারাভাষ্য দিতেন। তাঁদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন প্রাক্তন ফুটবলার প্রদীপ কুমার বন্দোপাধ্যায়, প্রাক্তন ফুটবলার সুকুমার সমাজপতি, অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য, পুষ্পেন সরকার, নভি কাপাডিয়া-র মত বিশিষ্টজনেরা।
বর্তমানে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) কিংবা আইলিগ-এর খেলায় সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, শিশির ঘোষ, মানস ভট্টাচার্য, প্রশান্ত চক্রবর্তী-র কণ্ঠে শোনা যায় ম্যাচের ধারাবিবরণী।
২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবলে ধারাভাষ্য দেবেন প্রাক্তন এবং বর্তমান ফুটবলারেরাও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভাইচুং ভুটিয়া, গুরপ্রীত সিংহ সান্ধু, অদিতি চৌহান, মেহরাজুদ্দিন ওয়াদু, পল মসফিল্ড এবং ইগর স্টিম্যাচ। এ ছাড়াও এই টুর্নামেন্টের ধারাবিবরণী শোনা যাবে অর্জুন পণ্ডিত, রবীন সিংহ, পল ম্যাসন, অনন্ত ত্যাগী, শ্রীনাথ মধুকুমার, শৈজু দামোদরণ, জো পল, আইএম বিজয়নের গলাতেও।
যাঁরা হতে চান ধারাভাষ্যকার
বর্তমানে রেডিয়ো, টেলিভিশন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা করে বিভিন্ন ভাষায় ধারাভাষ্য শোনার সুযোগ পেয়ে থাকেন দর্শকেরা। তাই এই পেশায় ক্রমশই আগ্রহ বাড়ছে বহু কিশোর-কিশোরীর। তবে, এ ক্ষেত্রে মাথায় রাখা প্রয়োজন, খেলার বিষয়ে সঠিক এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সময়ের মধ্যে সঠিক শব্দচয়নের মাধ্যমে পেশ করাই আসল চ্যালেঞ্জ। তাই শুধু খেলা নয়, জানতে হবে নিজের ভাষা সম্পর্কেও।
অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিযোগিতার ধারাভাষ্যও দিতে দেখা যায় জনপ্রিয় শিল্পীদের। সে ক্ষেত্রে ইংরেজি-সহ স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, জার্মানির মতো ভাষাতে দক্ষতা থাকলে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার মিলতে পারে। তবে, তার জন্য ধারাভাষ্যকার হিসাবে স্থানীয় ম্যাচে কিংবা কোনও সম্প্রচার মাধ্যমে কাজের পূর্ব-অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।
পড়াশোনার সুযোগ:
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, গণজ্ঞাপন, ক্রীড়া সাংবাদিকতা, ব্রডকাস্টিং অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ়, স্পোর্টস অ্যানালিটিক্স নিয়ে পড়াশোনার পর এই পেশায় যোগদানের সুযোগ পেতে পারেন। উল্লিখিত বিষয়ের মাধ্যমে পড়ুয়ারা কী ভাবে ধারাভাষ্য দেবেন— তার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন।
কী কী দক্ষতা থাকা প্রয়োজন?
স্পষ্ট ভাবে শব্দ উচ্চারণ করার দক্ষতা থাকা চাই। ভাষার ব্যাকরণ সম্পর্কে থাকা চাই সঠিক জ্ঞান। খেলার নিয়ম জানার পাশাপাশি, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ফুটবল নিয়ে কেমন কী চর্চা চলছে, সেই সম্পর্কেও নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে আগ্রহীদের।
প্রাক্তন ফুটবলার এবং ধারাভাষ্যকার সুকুমার সমাজপতি মনে করতেন, ধারাভাষ্যকারকে খেলার চরিত্রটা বুঝতে হয় দ্রুত৷ — ফাইল চিত্র।
বিশেষজ্ঞদের মত
খেলার মাঠে কী হচ্ছে, তার বাইরে গিয়ে তথ্য দেওয়াই ধারাভাষ্যকারের কাজ। প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দলের ইতিহাস। তাই খেলার সময় সেই ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নিজস্ব কাহিনিও শোনাতে হয় ধারাভাষ্যকারদের।
এ প্রসঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন ফুটবলার এবং ধারাভাষ্যকার সুকুমার সমাজপতি বলেছিলেন, “ধারাভাষ্যকারকে খেলার চরিত্রটা বুঝতে হয় দ্রুত৷ স্ট্যাটিসটিক্স বা তথ্য নির্ভর ধারাভাষ্য দেওয়ার মাঝেই খেলাটাকে প্রাণবন্ত করে তোলা জরুরি। নিয়মের মধ্যে থেকে উপযুক্ত অথচ পরিমিত শব্দে ফুটবলের যাদু ছড়িয়ে দিতে হবে শ্রোতা-দর্শকদের মনে৷”
ফুটবলের প্রতি ভালবাসাও থাকা দরকার ধারাভাষ্যকারের। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় ধারাভাষ্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন ভারতীয় ফুটবলার গুরপ্রীত সিংহ সান্ধু। তাঁর কথায়, “এ দেশে ফুটবলের প্রতি ভালবাসা অন্তহীন। সেই কারণেই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এই ক্ষেত্রে পেশাদার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।”
ধারাভাষ্যকারদের নিজস্ব এবং সাবলীল বাচনভঙ্গি থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিবিসি রেডিয়ো-র ধারাভাষ্যকার জন মারে। এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, “সাবলীল ভাবে খেলার বিবরণ দেওয়া এবং পরিস্থিতি বুঝে শব্দচয়ন করাই আসল লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে খেলার সময় কথা বলার ভঙ্গিমা বদলে ফেললে তা শ্রুতিমধুর নাও হতে পারে।”
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের হয়ে ধারাভাষ্য দেন ব্রিটেনের ক্রীড়া সাংবাদিক ভিকি স্পার্কস। তিনি ধারাভাষ্য দেওয়ার আগে প্রচুর ‘হোমওয়ার্ক’ করেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “যে ভাবে খেলোয়াড়েরা প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন, সেই ভাবেই ধারাভাষ্যকারদেরও প্রস্তুতি নিতে হয়। বিশেষ করে যাঁরা ফুটবল খেলেননি। তবেই, সহজে ছোট ছোট মুহূর্ত তৈরি করা সম্ভব হয় খেলার ধারাবিবরণী দেওয়ার সময়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ছোট বড় ম্যাচে কী হচ্ছে, কারা কেমন খেলছেন, কী ভাবে তাঁরা সফল হচ্ছেন— সবটাই জানা প্রয়োজন হয়।”
বেতন:
দৈনিক কিংবা মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে এই পেশায় নিযুক্তদের বেতন বা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতার সূচি অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞদের বেছে নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক স্তরের ধারাভাষ্যকারেরা প্রতি মাসে ১ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা থেকে ৯৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করার সুযোগ পেয়ে থাকেন।
এ দেশে অবশ্য মাসে পাঁচ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা প্রতিদিনের ভিত্তিতে সাম্মানিক হিসাবে দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতি মাসের পারিশ্রমিক হিসাবে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ করা হয়। তবে, এই পেশায় বিশেষজ্ঞদের চাহিদা থাকলেও দক্ষতা থাকলে নবীনরাও সুযোগ পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রেডিয়ো, টেলিভিশন চ্যানেল এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব।
তবে শুধু ফুটবল কিংবা ক্রিকেট-ই নয়, প্রতিটি খেলার জন্য ধারাভাষ্যকার থাকেন। খেলার ধরন, চাহিদা অনুযায়ী, তাঁদের চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ করা হয়ে থাকে।