Advertisement
E-Paper

তৃণমূল নেতাদের ডিম ছুড়ছে জনতা, মাঝে পড়ে উর্দিধারীরাও ঘায়েল! দাম বাড়লে যদি রেহাই মেলে, আশায় বাঁচছে পুলিশ

ইতিহাস বলে প্রাচীন রোমে শাসককে লক্ষ্য করে শালগম ছোড়া হয়েছিল প্রতিবাদ হিসাবে। পরবর্তী কালে ইংল্যান্ডে থিয়েটার থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে ডিম ছোড়ার রেওয়াজ দেখা যায়।

সিজার মণ্ডল

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৮:৫৭
Egging, a new menace faced by police in West Bengal after change of guard

সব্যসাচী দত্তকে লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে ডিম। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দূর থেকে ছুটে আসা সাদা গোলার মতো বস্তুটি আগেই ঠাওর করেছিলেন পুলিশকর্মী লক্ষ্মণ তিওয়ারি (নাম পরিবর্তিত)। কোনও মতে মাথা বাঁচাতে পারলেও শেষ রক্ষা হল না। পাশে থাকা সহকর্মীর ঢালে ধাক্কা খেয়ে সাদা গোলা ফেটে গিয়ে ভিতরের তরল গড়িয়ে পড়ল গালে, মুখে। কথা বলার ফাঁকে সেই তরলের একটু পৌঁছেও গেল জিভ পর্যন্ত! সেই গোলার ধাক্কা সামলাতে বিশুদ্ধ শাকাহারী লক্ষ্মণের বেশ কয়েক দিন সময় লেগেছে। কেবল শাকাহারী লক্ষ্মণ নন, আপাত নিরীহ ডিম যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন গোটা রাজ্যের বিভিন্ন স্তরের পুলিশকর্মীদের একটা অংশ।

রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূলের বড় নেতাদের মধ্যে সাংসদ সৌগত রায় প্রথম ডিমের আক্রমণের মুখে পড়েন। উত্তর ২৪ পরগনার নিমতায়। তার দু’দিন পরেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে মৃত তৃণমূল কর্মীর বাড়ি যাওয়ার পথে ডিম ছোড়া হয় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে। তার পর থেকেই গোটা রাজ্যে ডিম ছোড়া একটা জনপ্রিয় ‘ট্রেন্ড’। তৃণমূলের জয়প্রকাশ মজুমদার থেকে সব্যসাচী দত্ত, কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত থেকে নৈহাটি পুরসভার চেয়ারম্যানের পুত্র অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়— যে যেখানেই গ্রেফতার হচ্ছেন, তাঁরাই ডিমের ‘টার্গেট’।

অভিযুক্তকে গ্রেফতার। থানায় নিয়ে আসা। থানা থেকে বার করা। শারীরিক পরীক্ষা করাতে নিয়ে যাওয়া। কোর্টে নিয়ে যাওয়া। কোর্ট থেকে পুলিশ বা জেল হেফাজতে নিয়ে যাওয়া। প্রায় সর্বত্রই ডিম-আক্রান্ত হচ্ছেন অভিযুক্তেরা। সেই সঙ্গে ডিমের স্বাদ ভাগ করে নিতে হচ্ছে তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজে নিযুক্ত পুলিশকর্মীদেরও। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এক সাব ইনস্পেক্টরের কথায়, ‘‘অভিযুক্তকে শারীরিক পরীক্ষা করাতে বা আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য থানার বাইরে আনলেই ডিম ছুড়ছে লোকজন। এলোপাথাড়ি ছোড়া সেই ডিমের একটা হয়তো গায়ে লাগছে অভিযুক্তের, বাকি সব ক’টাই লাগছে আমাদের গায়ে।’’ বহু ক্ষেত্রেই অভিযুক্তকে লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে পচা ডিম। সেই ডিম ফেটে পুলিশ কর্মীদের শরীরের পাশাপাশি, উর্দিতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ সময়েই পুলিশকর্মীরা পোশাক বদলের সুযোগও পান না। ডিমের আঁশটে, উৎকট গন্ধ গায়ে নিয়েই দিনভর ডিউটি করতে হচ্ছে।

ইতিহাস বলে প্রাচীন রোমে শাসককে লক্ষ্য করে শালগম ছোড়া হয়েছিল প্রতিবাদ হিসাবে। পরবর্তী কালে ইংল্যান্ডে থিয়েটার থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে ডিম ছোড়ার রেওয়াজ দেখা যায়। ডেভিড ক্যামেরন থেকে আর্নল্ড সোয়ার্জেনেগার— অনেকেই বিলেতে ডিমের ‘লক্ষ্য’ হয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউ‌জ়কে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়েছিল। সেই ঘটনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল সে দেশের কমনওয়েলথ পুলিশ বাহিনীর। এ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার প্রতিবাদস্বরূপ বিলেতে ১৯৭৮ সালে ইন্দিরা গান্ধীও ডিমের ‘লক্ষ্য’ হয়েছিলেন।

তবে এ রাজ্যে সাম্প্রতিক অতীতে, বোমা, গুলি, পাথর ছোড়ার রাশি রাশি উদাহরণ থাকলেও ডিম ছোড়ার রেওয়াজ তেমন ভাবে দেখা যায়নি। রাজ্যে গত কয়েক সপ্তাহে ছোঁয়াচে রোগের মতোই ছড়িয়েছে ডিম ছোড়ার ঘটনা। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা নিজেই শিকার হয়েছেন ‘কুখ্যাত’ ডিম-আক্রমণের। পুলিশকর্মীদের বিড়ম্বনার কথা মেনে নিয়েও তিনি বলছেন, ‘‘এটা পেশাগত ঝঞ্ঝাটের অংশ।’’ একই সুর পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপার পুষ্পার। কারণ, ডিম কোনও নিষিদ্ধ বস্তু নয়। কারও ডিম কেনা আটকানো যায় না। সর্বোপরি প্রাণঘাতীও নয় বিষয়টি। বারুইপুর পুলিশ জেলা (যেখানে অভিষেক ডিমের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন) থেকে সদ্য কলকাতা পুলিশের ডিসি অয়্যারলেসের দায়িত্বে আসা শুভেন্দ্র কুমারও এ ক্ষেত্রে মেনে নিয়েছেন পুলিশের অসহায়তার কথা। কারণ অভিযুক্তকে নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের কাজ। আবার তাঁকে আদালতেও নিয়ে যেতে হবে। সেখানে সাধারণ মানুষকে আটকানো সম্ভব নয়। ফলে অভিযুক্তের উপর মানুষের রোষের ভাগ নিতে হচ্ছে পুলিশকেও। নিচুতলার পুলিশকর্মীরা ডিম থেকে বাঁচতে নিজস্ব বুদ্ধিতে কিছু ‘জুগাড়’ করছেন। কখনও ঢাল দিয়ে শরীর বা মাথা বাঁচানো। কখনও মুখঢাকা হেলমেট। তবে কোনওটাই সঠিক প্রতিষেধক হিসাবে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশকর্মীদের কথায়, ডিম ছোড়ার ঘটনা কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো পূর্বপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত। তবে অনেক জায়গাতেই হুজুগের পর্যায়ে চলে গিয়েছে বিষয়টি।

মনোবিদ রঞ্জন ভট্টাচার্যের দাবি, ‘‘প্রাচীন কাল থেকেই প্রতিবাদের পথ হিসাবে অনেক সময় ডিম বেছে নেওয়া হয়। কারণ, ডিম সহজলভ্য। ডিম প্রাণঘাতী নয়। একই সঙ্গে ডিম ছোড়া হচ্ছে যাঁর উদ্দেশে, তাঁর সম্মানহানি করে। ফলে কাউকে হেয় করতে, পরিহাস করতে মানুষ বেছে নেয় ডিমকে।’’

প্রাচীন বাংলাদেশে ডিম ছিল ‘কুখাদ্য’ গোত্রীয়। মুঘল হেঁশেলে ডিমের আনাগোনা থাকলেও বাংলার রান্নাঘরে বিংশ শতাব্দীর মধ্য ভাগ পর্যন্ত ডিমের প্রবেশ বন্ধ ছিল। বিশেষ করে মুরগির ডিম। বাংলা সাহিত্যেও ডিম যে ‘কুখাদ্য’ সেই উল্লেখ পাওয়া যায়। দুর্গাচরণ রায়ের ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ গ্রন্থে ডিম খাওয়াকে ‘জাত’ খোয়ানোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেই ডিম এখন আম জনতার কাছে সস্তায় প্রোটিনের উৎস। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, সকলের খাবারের তালিকাতেই জায়গা করে নিয়েছে ডিম।

সেই ডিমই এখন অভিযুক্ত থেকে আইনের রক্ষকদের দুর্ভোগের কারণ। আর তা নিয়ে ‘হাসি-মস্করা’ চলছে সমাজমাধ্যমেও। তবে ডিম ছোড়ার এই হুজুগে কি ডিমের দাম বেড়েছে? উত্তর, কাকতালীয় দলেও সত্যি, গত তিন সপ্তাহে (ডিম ছোড়ার ঘটনা শুরু হওয়ার পর থেকে) দেশ জুড়ে ডিমের দাম বেড়েছে। কলকাতায় অনেক জায়গায় খুচরো বাজারে ডিমের জোড়া ১৫ টাকা। তবে পশ্চিমবঙ্গ পোলট্রি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মদন মাইতির দাবি, ‘‘গত কয়েক সপ্তাহে মুরগির খাবারের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ। ফলে ৭০ পয়সার মতো দাম বেড়েছে ডিমের।’’

আর দাম বাড়লে মানুষের ডিম ছোড়ার হুজুগে ভাটা পড়বে এই আশাতেই দিন গুনছেন ‘অসহায়’ পুলিশকর্মীরা।

West Bengal Politics Egg Price TMC Protesters
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy