Advertisement
E-Paper

চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকের বেতন ১৫ হাজার, গ্রুপ-ডি কর্মীর ৩৭হাজার! সাতশো শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

২০০২ থেকে রাজ্যের সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। নামমাত্র বেতনেই কাজ শুরু করেছিলেন। ২০১৮ সালে ৪০শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হয় তাঁদের। সে বারই শেষ। গত ৮ বছরে আর বেতন বৃদ্ধি হয়নি।

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৬

— প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

তাঁরা কাজ করেন। প্রতি দিন সকালে স্কুলে আসেন। সারাদিন ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, পরীক্ষা নেন, খাতা দেখেন। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান থেকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা— সবেতেই তাঁদের অবদান।

তাঁরা শিক্ষা দেন, তবু কি শিক্ষক নন! অভিমান আর অভিযোগ ক্রমশ মাথা তুলছে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের মনে। সম্প্রতি বেতন বৃদ্ধি-সহ একাধিক দাবিতে রাজ্যের চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের সংগঠন বিকাশ ভবন অভিযান করে। অভিযোগ, রাজ্য বাজেটে তাঁরা ব্রাত্য থেকে গিয়েছেন। দীর্ঘ দিন কাজ করেও নামমাত্র বেতন পান। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বাজারে যা দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

২০০২ থেকে রাজ্যের সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। নামমাত্র বেতনেই কাজ শুরু করেছিলেন। ২০১৮ সালে ৪০শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হয় তাঁদের। সে বারই শেষ। গত ৮ বছরে আর বেতন বৃদ্ধি হয়নি। এই মুহূর্তে সারা রাজ্যে প্রায় ৭০০ শিক্ষক কাজ করেন চুক্তির ভিত্তিতে। কোনও কোনও স্কুলে, কোনও কোনও বিষয় পড়ানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরাই ভরসা।

যেমন কলকাতার এন্টালি হিন্দু বালিকা বিদ্যামন্দির। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাবিজ্ঞান পড়ান মাত্র একজন শিক্ষিকা, তিনি চুক্তিভিত্তিক। বারাসত ছোটজাগুলিয়া হাই স্কুলের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক। অথচ, তাঁরা ২০২৬-এও বেতন পান মাত্র ১৫,২০০ টাকা। বিকাশ ভবনও স্বীকার করছে, রাজ্যের বহু স্কুলেই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরাই ভরসা।

হিসাব বলছে, এই মুহূর্তে স্কুলগুলিতে শিক্ষাকর্মীরা যা বেতন পান, তার অর্ধেকও পাচ্ছেন না এই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি, যে কোনও সরকারি কার্যালয়ে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রুপ-সি কর্মী বেতন পান ৩৯,০০০ বেতনকাঠামোয়। গ্রুপ-ডি কর্মীরা সেখানে পান ৩৭,০০০। অথচ, প্রায় ২৪ বছর শিক্ষকতার কাজ করেও এই শিক্ষকেরা পান ১৫,২০০ টাকা। এর উপরও কর বাবদ ১৩০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। অথচ, পূর্ণ সময়ের শিক্ষকদের তুলনায় দায়িত্ব তাঁদের কোনও অংশে কম নয়।

পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কল্যাণ সরকার বলেন, “সম-কাজে সম-বেতন, এই তত্ত্ব আমাদের ক্ষেত্রে কার্যকরী নয়। অন্য শিক্ষকদের মতোই কাজ করতে হয়, অথচ, তাঁদের বেতনের সিকি ভাগও পাই না আমরা। সংসার চালাতে পারি না। এ ভাবে চললে আমরা বাঁচব না। গোটা পরিবার নিয়ে আমরা যাব কোথায়?” তাঁরা শিক্ষা দফতরে বার বার চিঠি দিয়েছেন বলে জানান। কিন্তু সুরাহা হয়নি। দাবি না মিটলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরা।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মল্লিকপুর অবদস সকুর হাই স্কুলের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষিকা স্নিগ্ধা দাস বলেন, “আমি যথেষ্ট দায়বদ্ধতার সঙ্গে পড়াই। একজন শিক্ষকের যা করা উচিত সমস্ত আমি করি। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, সংসারের ভরণপোষণ করতে আমি ব্যর্থ।” প্রায় একই আক্ষেপ এন্টালি হিন্দু বালিকা বিদ্যামন্দিরের শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষিকা পিঙ্কি বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি বলেন, “২০০৩ থেকে আমি কর্মরত । এখনও বেতন ১৫,২০০ টাকা! ছাত্রীদের শিক্ষা দিই— কোনও অবস্থাতেই যেন মানসিক ভাবে ভেঙে না পড়ে ওরা। কিন্তু আমি তো নিজেই আর মনের শক্তি ধরে রাখতে পারছি না। এর শেষ কোথায় জানি না।”

চুক্তিভিত্তিক স্কুল শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রধানশিক্ষকেরাও। পিঙ্কি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধানশিক্ষিকা মহুয়া দাশগুপ্ত বলেন, “পিঙ্কি আমাদের স্কুলের সম্পদ। পড়ানো তো বটেই, স্কুলের সমস্ত কাজে আমাদের প্রধান ভরসা তিনি। পিঙ্কির মতো অনেকেই রয়েছেন, ওঁরা বঞ্চিত। এই সমস্যার দ্রুত সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।”

বারাসত ছোটজাগুলিয়া হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক অনুপম সর্দারও জানিয়েছেন, তাঁরা ভরসা করেন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের উপর। তিনি বলেন, “পূর্ণ সময়ের শিক্ষকদের থেকে কোনও অংশে কম নন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরা। পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য নানা কাজেও আমাদের ভরসা তাঁরা। আমাদের খুব খারাপ লগে।”

ভোট আসে, ভোট যায়, পড়ুয়ারা নতুন ক্লাসে ওঠে, ক্রমশ বেড়ে চলে বাজার দর। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের বেতন বাড়ে না।

Contractual Teachers Salary Hike
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy