• ২০০৮ এর ১৮ অগস্ট বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে বেধড়ক মারা হয় তৃণমূল কর্মী সাবেরকে। রাতে মৃত্যু।
• প্রত্যক্ষদর্শী ছেলের অভিযোগের পরেও মামলা খারিজ।
• পরিবার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ায় ফের শুরু মামলা। কিন্তু চার্জশিট থেকে বাদ অভিযুক্ত চার সিপিএম নেতার নাম। দেখা যায় চার নতুন নাম।
• আদালত নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয় ২০১৩ সালে। ২০১৫ সালের গোড়ায় মামলা শুরু করে পুলিশ।
প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মার। তারপর টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে রাজ কলেজের মোড়ে আবার মার। সেখান থেকে পুলিশকে না জানানোর হুমকি দিয়ে রিকশায় তুলে ছেড়ে দেওয়া হয় রক্তাক্ত বছর পঞ্চাশের সাবের আলি মণ্ডলকে।
বাস থেকে নামলেও বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি ওই তৃণমূল কর্মী। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও রাতেই মারা যান তিনি।
২০০৮ সালের ১৮ অগস্টের ওই ঘটনার ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেননি সাবের মণ্ডলের স্ত্রী তসিনা বিবি। আট বছর পার হয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। প্রথমে পুলিশের রিপোর্টে মামলা খারিজ করে দিয়েছেন বিচারক। পরে প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের ছেলে সেলিম মণ্ডলের অভিযোগের ভিত্তিতে হাইকোর্টের নির্দেশে আবার মামলা শুরু হয়। তাতেও চার্জশিটে এফআইআরে থাকা চার জনের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। জুড়ে যায় চার নতুন নাম। পরে ২০১৩ সালে ফের নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। দু’বছর পরে ২০১৫ সালের গোড়ায় মামলা শুরু করে বর্ধমান থানা।
প্রাক ভোট গোলমালে রায়না তখন খবরের শিরোনামে। সিপিএম-তৃণমূলের গোলমাল, হামলা, একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ লেগেই রয়েছে। তার মধ্যেই রায়নার বাঁধাগাছার সাবের মণ্ডল নামে ওই তৃণমূল কর্মীকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। সে দিন ছেলে সেলিম ও অশোক রায় নামে এক ব্যক্তিকে নিয়ে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক বন্ধুকে দেখতে গিয়েছিলেন সাবের। অভিযোগ, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পৌঁছতেই এক দল দুষ্কৃতী বেধড়ক মারধর শুরু করে তাঁকে। সেখান থেকে টানতে টানতে রাজ কলেজের মোড়ে নিয়ে গিয়ে ফের মারধর করা হয়। তারপরে পুলিশের কাছে কোনও অভিযোগ না করার ‘নির্দেশ’ দিয়ে স্রেফ একটি রিকশায় তুলে ছেড়ে দেওয়া হয়। ধুঁকতে ধুঁকতে তিনকোনিয়া বাসস্ট্যান্ডে এসে রায়নার বাসে চড়েন রক্তাক্ত সাবের। দামোদরের উপর কৃষক সেতু পেরনোর পরেই অসুস্থ বোধ করতে থাকেন তিনি। পলেমপুর বাসস্টপে নামতেই বমি শুরু হয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাবের। ওই অবস্থাতেই তাঁকে ফের বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করানো হয়। গভীর রাতে মারা যান রায়নার ওই তৃণমূল কর্মী।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার পরের দিন, ১৯ অগস্ট এক দল সিপিএম নেতা-কর্মীর নামে বাবার খুনের অভিযোগ এনে বর্ধমান থানায় এফআইআর করেন সাবির মণ্ডলের আর এক ছেলে সুজন মন্ডল। কিন্তু অভিযোগের তিন দিন পরে, অভিযুক্ত সিপিএম নেতাদের নাম পুলিশ এফআইআর থেকে বাদ দেওয়ায়, আরেক ছেলে সেলিম নিজেকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে বর্ধমান সিজেএম আদালতে ফের অভিযোগ করেন। সিজেএম অভিযোগের তদন্ত করার জন্য বর্ধমান থানার আইসিকে নির্দেশ দেন। কিন্তু বর্ধমানের তৎকালীন আইসি আদালতের কাছে রিপোর্ট দিয়ে জানান, অভিযোগ অতিরঞ্জিত। অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। আইসির রিপোর্ট পাওয়ার পরে মামলাটি খারিজ করে দেন সিজেএম। পরে ওই রায়ের বিরোধীতা করে জেলা ও দায়রা আদালতের মুখ্য বিচারকের দ্বারস্থ হন অভিযোগকারী সেলিম মণ্ডল। তাঁর আবেদনটি পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক বিনোদকুমার শ্রীবাস্তবের কাছে পাঠান মুখ্য বিচারক। দু’বার শুনানি গ্রহণের পরে ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারক সিজেএমের নির্দেশ খারিজ করে দেন। ওই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হাইকোর্টের বিচারপতি পার্থসখা দত্ত বেশ কয়েকবার শুনানির পরে নির্দেশ দেন, দুটি অভিযোগ একত্র করে তদন্ত করতে হবে। আরও নির্দেশ ছিল, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের ছেলে, সেলিমের বক্তব্য যেন তদন্তকারী অফিসার গুরুত্ব দিয়ে শোনেন এবং নথিভুক্ত করেন। বর্ধমান আদালতের আইনজীবী সদন তা ও উদয়শঙ্কর কোনার জানান, আদালতের এই নির্দেশ উপেক্ষা করে তদন্তকারী অফিসার ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর চার্জশিট পেশ করেন। সেখানে এফআইআরে নাম থাকা অভিযুক্তদের বাদ দেওয়া হয়। অথচ এফআইআরে নাম নেই এমন চার জনকে অভিযুক্ত করা হয় চার্জশিটে। এ ছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী সেলিমের বয়ান নথিভুক্তও করেননি তদন্তকারী অফিসার। নিহতের ছেলে সেলিম মণ্ডল ফের তদন্তের আর্জি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। বর্ধমানের তৎকালীন আইসি দিলীপ গঙ্গোপাধ্যায়ও আদালতকে জানান, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। মামলার তদন্ত চালানোর প্রয়োজন রয়েছে। ২০১৩ সালের ৮ মার্চ তৎকালীন সিজেএম সেলিম আনসারি নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আদালতের নির্দেশের প্রায় দু’বছর পরে গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মামলাটির তদন্ত শুরু করেছে বর্ধমান থানা।
স্বামীর খুনের কোনও কিনারা না হওয়ায় আট বছরের ক্ষত কিছুই শুকোয়নি তসিনা বিবির। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘খুনিদের শাস্তির জন্য হাইকোর্ট পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলাম। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ কোনও সাহায্য করতে চায়নি। অপরাধীরা তো ধরা পড়েনি, বরং তাঁদের প্রকাশ্যে ঘুরতে দেখা গিয়েছে।।” তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে তিন জন দিনমজুরের কাজ করেন। আর সেলিম রাজ কলেজের অস্থায়ী কর্মী। ওই কলেজের আপনার চোখের সামনেই তো বাবাকে মারা হয়েছিল? চোখে জল নিয়ে চলে যান সেলিম।