×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৬ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

বড্ড গরম যে, এত পারে নাকি

সুস্মিত হালদার
নাকাশিপাড়া ০৩ এপ্রিল ২০১৬ ০১:৩৩
তৃণমূল প্রার্থী কল্লোল খাঁ-র প্রচারে শুভশ্রী। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য

তৃণমূল প্রার্থী কল্লোল খাঁ-র প্রচারে শুভশ্রী। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য

আঁচ পোড়া কড়াইয়ের মতো আকাশ। গলায় ঢকঢক ঢালা মিনারেল জলের দু’ফোঁটা গাড়ির বনেটে পড়তেই নিমেষে শুষে নিচ্ছে পোড়া রোদ্দুর। তর্জমায় জড়ানো রুমালে আলগোছে মুখের নষ্ট মেক আপ মুছে নেওয়ার ফাঁকে নায়িকা বলেন, ‘‘উঃ, অসহ্য গরম, আর দেরি কোরো না!’’

হুডখোলা খোলা জিপ থেকে নেমে সাদা এসইউভি-র দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন তিনি। অনুগত বাউন্সারকুল হয়ে পড়েছেন অনাবশ্যক ব্যস্ত। তাঁর গাড়িও ততক্ষণে উঠে এসেছে জাতীয় সড়কে। আর, বাঁক নেওয়া রাস্তার মুখে ফ্যালফ্যাল মুখে স্থানীয় ব্লক তৃণমূল নেতা বলে চলেছেন— ‘‘আমাদের শালিখগ্রামে এক বার যাবেন না, একবারটি, এলাকায় মুখ দেখাতে পারব না দিদি, একবার...!’’

তিন বারের বিধায়ক কল্লোল খানের রোড শো-এ গ্রামীণ ভিড়টাকে অপেক্ষায় রেখেই পিচ রাস্তায় শহরমুখো হারিয়ে গেলেন শুভশ্রী, টালিগঞ্জের পরিচিত নায়িকা।

Advertisement

ব্যাজার মুখে তৃণমূলের এক জেলা নেতা বলছেন, ‘‘ধুস...এরা কথা রাখে না। পাঁচ-পাঁচটা রোড শো করার কথা, দু’টো করেই ফিরে গেল, এখন গ্রামের নায়িকা দর্শনের জন্য হেদিয়ে পড়ে তাকা লোকগুলোকে কী বলবো?’’

নায়িকা দেখবে বলে, মুড়াগাছায় কল্লোলের বাড়ির সামনে ভিড়টা চাক বাঁধছিল সকাল থেকেই। মুখিয়ে ছিলেন স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরাও। শুভশ্রীর আসার কথা ছিল বেলা সাড়ে দশটায়। দুধ সাদা গাড়িটা এসে কল্লোলের বাড়ির গোড়ায় থামল পাক্কা এক ঘণ্টা পরে।

প্রার্থীর বাড়ির সামনেই তৈরি ছিল হুডখোলা জিপ। কালো লেগিংস ঢিলেঢালা গেঞ্জি, শুভশ্রী সামনের আসনে উঠতেই জড়োসড়ো কল্লোল তার পাশে জায়গা করে নিলেন। এক গাল হেসে জানতে চাইলেন, ‘‘এগোবো?’’ সম্মতি মিলতেই শুরু হল রোড শো। হুডখোলা জিপের সামনে সামনে গোটা তিরিশ মোটরবাইক, পিছনের গাড়িতে নায়িকার নিরাপত্তারক্ষীরা।

মুড়াগাছা বাজার, ঘোষপাড়া হয়ে হাইস্কুলের পাশ দিয়ে শুভশ্রীকে নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে ধর্মদার দিকে। রাস্তার পাশে বাড়ি-উঠোন থেকে বাসন মাজার ছেড়ে শুকনো ছাই মাখা হাতেই দৌড়ে এলেন মা-মেয়ে— ‘‘কই গো এটাই নায়িকা বুঝি, কী ফর্সা গো!’’ গরম তোয়াক্কা না করে গাছ-পাঁচিল-বাড়ির ছাদে ভরিয়ে ফেললেন উঠতি যুবকেরা। নাগাড়ে ঝলসে উঠতে তাকল সস্তা-দামি মোবাইল। তাঁদের উৎসাহ বাড়িয়ে দিল নায়িকার মাপা মুচকি হাসি। ধর্মদা মোড়ে সকাল থেকেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক অস্ফূটে বলে ফেলছেন, ‘‘পয়সা উশুল!’’

এ বার জিপ থেকে নেমে পড়লেন শুভশ্রী। এসইউভি-র মধ্যে সেঁদিয়ে সটান তুলে দিচ্ছেন কালো কাচ। ভিড়টা তাতেও ছেঁকে ধরে তাঁকে। গাড়ির উপর হুমড়ি খেয়ে কালো কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখার চেষ্টা শুরু হল। গাড়ির কাচ অবশ্য নামল না। ভিড় হটাতে পুলিশের চেয়েও বেশি তৎপর হল শুভশ্রীর বাউন্সারেরা। তাদের ঠেলায় ছিটকে পড়লেন এখ উৎসাহী যুবক। গাড়ি এগিয়ে চলে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গাছা মোড়ের দিকে। গাছা মোড়ে তখন মানুষের জটলা। ভিড় দেখে কল্লোলের অনুরোধ উপরোধে শেষতক ফের এক বার হুডখোলা জিপে সওয়ার হলেন নায়িকা। তাকে ও কল্লোলবাবুকে নিয়ে গাড়ি চলল গাছা বাগানপাড়া-বেজপাড়া হয়ে শালিখগ্রামের দিকে। তবে আর নয়, আবার ঘামতে শুরু করেছেন নায়িকা। গরমে হাঁসফাঁস করতে শুরু করেছেন। কর্মীদের হতাশ করে নায়িকা ফিরে এলেন নিজের এসি গাড়ির ঘেরাটোপে। মিছিল এ বার চলল মেকি- শৈলিকগ্রামের দিকে। তাকে দেখতে গ্রামের মহিলা ছুটে এলেন রাস্তায়। কিন্তু কালো কাঁচে ঢাকা গাড়ি ছুটে গেল গ্রামের পথ ধরে। তাদের চোখে মুখে উড়ে এল এক রাশ ধুলো।

যাওয়ার কথা ছিল কালাবাগা-শালিখগ্রাম। সেখানে না গিয়ে মাঝ পথে থেমে গেল শুভশ্রীর গাড়ি। শুভশ্রী কেন এত তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন, কপালের ঘাম মুছে কল্লোল বলছেন, ‘‘বড্ড গরম যে। এতটা পারে নাকি?’’

Advertisement