সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ছবির সেটে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে এক সিনেকর্মীর। গত সোমবারের এই ঘটনার খবর ফের উস্কে দিয়েছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্মৃতি। তদন্তের অগ্রগতি কোন দিকে এগোচ্ছে তা নিয়ে বার বার প্রশ্ন তুলছেন রাহুলের পরিবার থেকে বন্ধুরা। বলিউডে দুর্ঘটনার পরেই সেখানকার বিভিন্ন কলাকুশলী ও সিনে সংগঠন দ্রুত তৎপরতার সঙ্গে পরিচালকের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হতে পারে বলে জানিয়েছিল। একই সঙ্গে তারা ঘটনার তদন্তের দাবি তুলে চিঠিও দেয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেও। দ্রুত মৃতের পরিবারকে বড়সড় ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি তুলেছে প্রযোজক-পরিচালকের কাছে। বলিউড পারলেও টলিউডের ক্ষেত্রে এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এমনই মত এখানকার বিভিন্ন শিল্পীদের।
রাহুলের মৃত্যুর পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও সদুত্তর মেলেনি। কী ভাবে মৃত্যু হল সুস্থ-স্বাভাবিক এক জন অভিনেতার? কী করা উচিত ছিল ঠিক তার মৃত্যুর পর? এ বিষয়ে মুখ খুললেন টলিউডের বিশিষ্ট অভিনেতারা। এ প্রসঙ্গে কী ভাবছে টলিউড?
বলিউডে গত সোমবার ওই ঘটনার পরেই পরিচালকের বিরুদ্ধে দ্রুত সরব হয়েছে ‘অল ইন্ডিয়া সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’। এ প্রসঙ্গে অভিনেতা কৌশিক সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘এমন কোনও ঘটনা অবশ্যই কাম্য নয়। আবার তা নিয়ে চুপ থাকা একেবারেই উচিত নয়। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর সেটেও নিশ্চয়ই গাফিলতি ছিল, না হলে শর্ট সার্কিট হত না। তবে ইচ্ছাকৃত গাফিলতি, না কি দুর্ঘটনা, সেটা নিয়ে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে। তাই সঠিক দিকে তদন্ত এগিয়েছে এবং সেই গাফিলতি মেনে নিয়ে উপযুক্ত কাজ তাঁরা করেছেন। অবশ্যই এমন কোনও বডি থাকলে তার চেয়ে ভাল কিছু হয় না, যাঁরা প্রশ্নগুলো তুলবেন।’’
টলিপাড়ায় শিল্পীদের সুরক্ষা প্রসঙ্গে কী বললেন কৌশিক? ছবি: সংগৃহীত।
এর পরেই কৌশিক বলেন, ‘‘কিন্তু রাহুলের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বিশেষ করে আমি বলব, জনসমক্ষে বিষয়টা আসার পরে গাফিলতির কথা স্বীকার করে নিলে হয়তো তদন্ত ঠিক দিকে এগিয়ে যেত। সেই দিন রাহুলের সঙ্গে যাঁরা শুটিং করছিলেন, তাঁরা মুখ খুলতেই তো একটা বড় সময় লাগিয়ে দিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, তাঁদের শুটিং শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা নাকি কলকাতার পথে রওনা দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত কাজ করলেন, তাঁরই এমন বীভৎস ঘটনা ঘটে গিয়েছে, সেই খবর পেয়েও তাঁরা কেউ গাড়ি ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে ফিরে গেলেন না? এটা আমার বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি।’’
টলিউডে অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তী। বিভিন্ন ছবিতে অ্যাকশন দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন। সেইসমস্ত দৃশ্য ছিল যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি ভন্সালীর সেটের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘মুম্বইয়ের এই ঘটনায় এত দ্রুত তৎপরতার কারণই হল, কেউ দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। ঘটনা নিয়ে কথা বলে আলোচনা করে, কতটা বলবেন বা বলবেন না তাঁর বিচার করে তথ্য সামনে আসার কথা ভাবেননি। গাফিলতির বিষয়ে নিজেদের জড়ানো উচিত কি না, সেটাও ভাবেননি। ফলে এত তাড়াতাড়ি সঠিক তথ্য সামনে এসেছে। রাহুলের তদন্ত নিয়ে আমরাও সঠিক তথ্য জানতে চাই।’’
একেন সিরিজ়ে শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন অনির্বাণ। ছবি: সংগৃহীত।
তিনি জানান, ‘একেনবাবু’র একটি সিরিজ়ে বারাণসীর গঙ্গায় ডুবন্ত অবস্থায় শট দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে হয়েছিল তাঁকে। অভিনেতা যোগ করেন, ‘‘বহু সময়েই আমরা ভাবি, এইটুকু তো করাই যায়। কী আর হবে? সবাই তো করে। সমস্যাটা এখানেই। আর এখান থেকেই এক দিন হঠাৎই দুর্ঘটনা ঘটে যায়। বেনারসে যখন একেনের শুটিংয়ে গিয়েছিলাম, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল না। আমি তার আগে গঙ্গার ঘাটে কখনও নামিনি। নেমে দেখলাম, প্রচুর শ্যাওলা। হতেই পারত দুর্ঘটনা। কিন্তু অত ভাবিনি, স্বাভাবিক ভাবেই করেছি। কিন্তু রাহুলের মৃত্যুর পর আমায় ভাবিয়েছে এ ঘটনা। নিজের জন্য চিন্তা তো হবেই, আবার পাশাপাশি আমার সহকর্মীরাও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে থাকেন টেকনিশিয়ানরা। হামেশাই তাদের উঁচুতে উঠে লাইট লাগাতে হয়। এত বড় একটা দুর্ঘনার পরও কোনও সেইভাবে চিত্র বদলায়নি। উল্লেখযোগ্য বা বাড়তি কোনও নিরাপত্তা এখনও চোখে পড়েনি। বরং সেই জায়গা থেকে আমি নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অতিরিক্ত ঝুঁকির কোনও কাজ থাকলে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা যদি না থাকে সেই কাজ আর করব না। তাতে যদি প্রযোজনা সংস্থা ভাবেন আমি অহঙ্কারী বা বদমেজাজি, তা হলে ভাববেন। কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে, এবং তা আমাদেরই বলতে হবে।’’ অনির্বাণের কথাতেই স্পষ্ট, টলিউডের শিল্পীদের নিরাপত্তা নিয়ে এখনও তাঁদের নিজেদেরই ভাবতে হচ্ছে।
মুম্বই-কলকাতায় কাজের ধরনে কোনও পার্থক্য লক্ষ করেছেন অপরাজিতা? ছবি: সংগৃহীত।
অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য কলকাতা এবং মুম্বই— দুই জায়গাতেই কাজ করেছেন। মুম্বইয়ের ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে ভন্সালীর সেটে। আসলে অনেক ক্ষেত্রেই অভিনেতারা নিজেরা অতটা মাথা ঘামান না। কাজের তাগিদেই করে দেন ঝুঁকির দৃশ্যও।’’ অপরাজিতা এ-ও বলেন, ‘‘মুম্বই অনেক বেশি পেশাদার। ভন্সালীর সেট তো আরও বেশি কড়া। একটা পিন পরলেও আওয়াজ হবে। ফিসফিস করে কথা বলে এবং শটের বাইরে কেউ কারও সঙ্গে কোনও কথা বলে না। যে যার মতো কাজে ব্যস্ত। ফোন জমা দিয়ে সেটে যান অভিনেতারা। ওখানেও নিজেকে নিজেরটা বুঝতে হবে। তোমার চিত্রনাট্যটুকু করে নিতে হবে। সেখানে তাই সবকিছুই অনেক নিয়ম মেনে করা হয়, সেখানে আমরা একটু বেশি আবেগী।’’
আর কলকাতার প্রসঙ্গ তুলে অপরাজিতা বলেন, ‘‘তবে রাহুলের মৃত্যুর পরে সুবিচারের দাবিতে কর্মবিরতির দিন সব গিল্ডের উপস্থিতিতে যে বৈঠক হয়েছিল, তাতে প্রাথমিক স্তরের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) তৈরি করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য তা আপাতত স্থগিত রয়েছে। আশা করি, খুব শিগগির তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে। আর আর্টিস্ট ফোরামের তরফেও জানানো হয়েছে, কোনও দৃশ্য যদি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়, সে ক্ষেত্রে যেন পিছিয়ে আসেন শিল্পীরা, সুরক্ষার কথা আগে চিন্তা করেন।’’
অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়ও বহুদিন ধরে বলিউডের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বললেন, ‘‘রাহুলের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে কোনও ভাবেই না ঘটে তা সুনিশ্চিত করা সবার আগে প্রয়োজন। শিল্পীদের নিরাপত্তায় একটা প্রাথমিক সুরক্ষা নেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু তা সবসময় পর্যাপ্ত হয় না। শিল্পীদের ক্ষেত্রেও অনেকসময় চাপ থাকে। একটা ইউনিট বসে থাকবে ভেবে চিন্তা না করেই শুটিং করেন। আমি যেমন ‘লগা চুনরি মে দাগ’ ছবির শুটিং করতে গিয়ে দেখি, রানির (মুখোপাধ্যায়) শরীর খারাপ হয়েছিল। সেই দিন সম্পূর্ণ শুটিং বন্ধ রাখা হয়। আমাদের এখানে সেই বিলাসিতা করার বাজেটই নেই। আবার মিঠুন চক্রবর্তীকেও দেখেছি বডি ডবল না নিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে খুব আঘাত পেয়েছিলেন। রাজের (চক্রবর্তী) সেটে এক বার কৌশানী (মুখোপাধ্যায়) পালকি থেকে পড়ে যায়। পালকির নীচের অংশ শুদ্ধ ভেঙে পড়ে, বেশ চোট পেয়েছিল কৌশানী। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের নিজস্বও কিছু বিষয় থাকে। নিজেদেরও সতর্ক হতে হবে। শুধু গাড়ি চালানোর দৃশ্য আছে বলে আমি বহু ছবি ছেড়ে দিয়েছি। আমি পরিষ্কার বলে দিয়েছি আমার দ্বারা এটা হবে না, আমি করব না। কারণ আমার সুরক্ষার দিকটাও মাথায় রাখতে হবে।’
‘লগা চুনরি মে দাগ’ ছবির শুটিং করতে গিয়ে কী অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন খরাজ? ছবি: সংগৃহীত।
তবে সবকিছুর মধ্যেই উঠে আসছে এসওপি’র প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে আর্টিস্ট ফোরামের তরফে শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার পর আমরা সকলে মিলে এ বিষয়ে আলোচনা করি। প্রযোজক গিল্ড, পরিচালক গিল্ড, চ্যানেল কর্তৃপক্ষ, ইমপা, ফেডারেশন সকলে মিলে আলোচনায় বসেছিলাম। আমরা যা যা বলেছিলাম তাঁরা সম্মতি জানিয়েছিলেন এবং সেই অনুযায়ী একটা এসওপি তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যেই ভোটের সময় আসায় আমরা ঠিক করেছিলাম যে ভোটের ফল বার হওয়ার পর ফের এক বার বসে অফিশিয়ালি নথিভুক্ত করা হবে। এর পর টলিউডেও নানা বদল এসেছে। নিশ্চয় এ বার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন আউটডোরের ক্ষেত্রে নিজস্ব সুরক্ষা বজায় রাখা হচ্ছে। অফিশিয়াল না হওয়া সত্ত্বেও নিজেরা মেনে চলছেন।’’
আরও পড়ুন:
তবে ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে রাজনৈতিক বা পেশাগত ভেদাভেদও টলিউডের শিল্পী-কলাকুশলীদের নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় বলে মনে করেন কৌশিক সেন। অতীতে এমন ঘটনা বহুবার দেখা গিয়েছে বলে তিনি জানান। সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেন, রাহুলের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁদেরকে ক্রমাগত আর্টিস্ট ফোরামের মধ্যে থেকে কেউ কেউ খবর দিয়ে দিচ্ছিলেন। ওই তালিকায় ক্ষমতাবান শিল্পীরাও ছিলেন।’’ কৌশিকের মতে, এই সব ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থের কথা ভাবলে হয় না। তাই এমনটাও কাম্য ছিল না বলেই তিনি মনে করেন। পাশাপাশি মুম্বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, এটা বলিউডে একেবারেই হয় না। সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও শিল্পীদের স্বার্থে সবাই এক হতে পিছপা হন না বলে তিনি জানান। ভন্সালীর সেটের ঘটনাই তার প্রমাণ।