Advertisement
E-Paper

এখন আর বুদ্ধিজীবী নেই, সব বুদ্ধিবেচু! আমি তো পড়াশোনা জানি না, আমার সঙ্গেই একটা ডিবেট করুন তাঁরা: কিউ

চেনা ছককে বুড়ো আঙুল দেখান আর কোনও গণ্ডিকে তোয়াক্কা করেন না। পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায় ওরফে কিউ ঠিক কেমন? আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে অকপট কিউ।

অনসূয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০২
অকপট কিউ

অকপট কিউ গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তাঁর ছবি প্রশংসিত হয়েছে। আবার বিতর্কের ঝড়ও বইয়ে দিয়েছে। তিনি বরাবরই ছক ভাঙায় বিশ্বাসী। অনুরাগীরা বলেন, তাঁর কাজ অন্য ভাবে ভাবায়। চেনা ছককে বুড়ো আঙুল দেখান তিনি। কোনও গণ্ডিকে তোয়াক্কা করেন না। পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায় ওরফে কিউ ঠিক কেমন? আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে অকপট কিউ।

প্রশ্ন: দীর্ঘ বিরতি! এত দিন পর কাজে ফিরলেন?

কিউ: প্রথমত, কাজ কোনও দিনই আসেনি। কাজ তৈরি করতে হচ্ছে। আমি যে ধরনের কাজ করতে চেয়েছি, সেই ধরনের কাজের নিদর্শন এ দিকে খুব একটা ছিল না। স্বাধীন ভাবে কাজ করা এবং তার পদ্ধতি ৯০-এর দশকের পরে বদলে যায়। অন্য ধারার ছবি ধরে এখনও ঝুলছি। একসময় এই ধরনের ছবির জন্য রাজ্য থেকে সাহায্য পাওয়া যেত। পরে সেগুলি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রশ্ন: টলিউডে কি মূল্য পাচ্ছিলেন না?

কিউ: আমার আবার মূল্য? আমার কোনও মূল্যই নেই। আমাদের এখানে কোনও মূল্য নেই। নতুন ভাবনাচিন্তা যাঁরা করছেন, তাঁদের কিছুই করতে দেওয়া হয় না। আবার এই কথাটাও সত্যি, এখানেই কাজটা করা যায়। মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরুতে করা যায় না। ওই শহরগুলোয় আমার মতো একজন বেঁচেই থাকতে পারত না। কারণ, আমি গত ২০ বছরে কোনও বাণিজ্যিক কাজ করিনি। এটা জানি, কিছু মানুষ চান আমার কাজ। ভালবাসেন আমার কাজ দেখতে।

প্রশ্ন: আপনি ১০ বছর আগে যে কাজ করেছিলেন, ঘুরেফিরে আজ কি ওটিটি-তে সে সব কাজই হচ্ছে? সময়ের থেকে এগিয়ে থাকাই কি সমস্যা হয়ে দাঁড়াল?

কিউ: অনেকেই জানেন না, ‘গান্ডু’ই প্রথম ছবি, যা ডিএসএলআরে শুট করা হয়েছে। এই ক্যামেরায় কিন্তু ছবি শুট করা যায় না। ‘গান্ডু’র পরে ডিএসএলআর দিয়ে ছবির শুটিং হয়েছে। এর পরেও একটা বিরাট কাজ হয়েছিল। ২০১৬ সালে এশিয়ায় নেটফ্লিক্স লঞ্চ হয়েছিল বেশ কিছু ছবি নিয়ে। তার মধ্যে আমার ছবি ছিল। এখন আর বাংলা ছবি কিন্তু নেটফ্লিক্সে দেখা যায় না। আমার ছবিটা এখনও আছে।

প্রশ্ন: বাংলা ছবির সাহস কি কম বলে মনে হয়?

কিউ: অবশ্যই বাংলা ছবির সাহস কম। অনেক দিন আগে বিরাট সাহসী ছিল। এত সাহসী জিনিস করে ফেলেছে বাঙালি! এখন বোধহয় সাহসটা কম পড়ে গিয়েছে। সাহসের রসদটা ফুরিয়ে গিয়েছে। তার সঙ্গে আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ রয়েছে। তাঁরা পর পর এমন সব কাজ করে গিয়েছেন যে বাংলা ছবির আর উন্নতি হয়নি। আসলে বলতে হবে, আমাকে দেখে কিছু শিখো না। আমি যেমন বলব, শিখতে হলে মিকে, মিয়াজাকি, প্যারানভস্কি দেখো। আমি কিছু জানি না। আমার ছবি দেখো না।

প্রশ্ন: বাংলা ছবির দর্শক কি সব ধরনের ছবি দেখতে প্রস্তুত?

কিউ: আসলে দর্শককে এমন জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। এখন সব হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দর্শককে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষ যদি দিতে হয় তাঁদের, যাঁরা সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।একসময় ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশনে বিশ্ব জুড়ে মাফিয়া রাজ করেছে। এখন পুরোপুরি কর্পোরেট হয়ে গিয়েছে। দুটো পর্বের মাঝের সময়টুকু ছিল ভাল। অসংগঠিত অপরাধীদের থেকে সংগঠিত অপরাধীদের দিকে যাওয়ার মাঝে যে রাস্তা, সেখানেই শিল্পীদের বাঁচতে হবে। শিল্পীদেরই যা করার করতে হবে। দর্শকেরা অপেক্ষা করে আছেন।

প্রশ্ন: শ্লীল-অশ্লীল শব্দের যে গণ্ডি তা আপনার কাছে নেই। কেন?

কিউ: কোনও ব্যাপারেই গণ্ডি আমার নেই। সীমারেখা বিষয়টাই খুব জটিল। শ্লীল-অশ্লীল এই কথাটা আমরা খুব সহজেই বলি। ‘অবাঙালি’ শব্দেরও খুব সহজে প্রয়োগ করি। অন্য দৃষ্টিকোণে নিজেকে রাখলে বোঝা যাবে, এই শব্দ আসলে বর্ণবৈষম্যের কথা বলে। ছোটলোক আর ভদ্রলোক। এক শ্রেণির মানুষের ভাষাকে আমি নিচু করছি। তার একটাই কারণ— আমার কাছে পয়সা বেশি। আমি তাই শ্লীল-অশ্লীলতার গণ্ডিতে কোনও দিনই বিশ্বাসী নই। এই গণ্ডির দেওয়ালগুলোর উপর আমি প্রাতঃকৃত্য করতে চাই। প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা এবং সমান। এটাই আমি বিশ্বাস করি। অনেকে বলে ‘পড়াশোনা জানা লোক’। আমি যেমন পড়াশোনাই জানি না। ফেল্টু পুরো। কোনও বুদ্ধিজীবী আসুক একটা ডিবেট করতে।

প্রশ্ন: বুদ্ধিজীবীরা আছেন এখন?

কিউ: না, বুদ্ধিজীবী এখন কেউ নেই। কোনও অস্তিত্ব নেই। বুদ্ধিবেচুরা আছেন।

প্রশ্ন: প্রতি দিন সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে, কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

কিউ: আমার ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। আমার প্রজন্মের দায়িত্ব ছিল সিনেমা বানানোর। আমি বানিয়েছি ‘লভ ইন ইন্ডিয়া’। তথ্যচিত্র, ইউটিউবে বিনা পয়সায় দেখা যাবে। আমার ছবি বিনা পয়সায় দেখা যায়। আমি মানবকল্যাণে বিশ্বাস করি। আমি পুরোটাই সমাজসেবা করে চলেছি কুড়ি বছর ধরে। কোনও বাঙালি, কোনও ভারতীয় একটা পয়সা দিয়েও দেখেনি। তবে আমি খুব খুশি এটা বলতে পেরে, নতুন প্রজন্ম কোনও ব্যাগেজে বিশ্বাস করে না। তাঁরা নিজেরাই এখন বুঝিয়ে দিচ্ছেন, হতেই পারে তোমার একজনের সঙ্গে প্রেম। কিন্তু সেটাই চূড়ান্ত প্রেম কে বলে দিচ্ছে? কার স্বার্থে সেটা চলছে? ভিন্‌ধর্মে বিয়ে করলে আবার মারধর করা হচ্ছে। তার মানে সমাজ আর প্রেম বিপরীতমুখী। সমাজ প্রেমে বিশ্বাসই করে না। সমাজ বিশ্বাস করে টাকায়। সমাজ বিশ্বাস করে কী ভাবে চলতে হবে জীবনে? চলতে গেলে পরিবারের দরকার। তবে এখন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। বাচ্চারা আর কথা শুনছে না। এটা হেব্বি সময়!

প্রশ্ন: ঋ-এর সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন, এখন যোগাযোগ আছে?

কিউ: হ্যাঁ, কথা হয় মাঝেমাঝে টুকটাক। কিন্তু আমরা তো এত কাছাকাছি থেকেছি একটা সময়ে। মাঝেমধ্যে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁদের কোচের এমন একটা সমীকরণ থাকে। এত বেশি কাছে চলে আসেন তাঁরা, চিন্তা এবং ভার এত বেশি হয়ে যায়! অর্গানিক ফার্মিং করতে গেলে যে জমি থাকে, তাতে সাত বছর চাষ করা যায় না। ফেলে রাখতে হয়। আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটা হয়। একটু বিরতি নিতে হয়। নিজেদের বড় হতে হয়, আবার নতুন করে কথা বলার জন্য। আমরা তো থাকিও এক পাড়ায়।

প্রশ্ন: দেখা হয়?

কিউ: লেক গার্ডেন্সে একই জায়গায় থাকি। প্রায়ই দেখা হয় আমাদের।

প্রশ্ন: ফের একসঙ্গে থাকার ইচ্ছে আছে?

কিউ: না! এ কী! ওটা একটা দারুন সাংঘাতিক সময় ছিল। ওটাকে হয়তো নতুন করে বাঁচানো যাবে না। সেই সময়টা রিক্রিয়েট করতে গেলে অন্য কিছু তৈরি হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: আর অভিনেত্রী ঋ-কে নিয়ে কী বলবেন?

কিউ: ঋ-এর মতো একজন অভিনেত্রী, যাকে কানুর মতো পরিচালকও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁকে ব্যবহার করা হয় না। সেটা দুঃখের। ঋ-এর প্রতি সবার কৌতূহল তাঁর শরীরেই আটকে আছে। কিন্তু তাঁর অভিনয় যে কী ভাবে দেখেছেন দর্শক, সেই মূল্য দেওয়াই হয়নি। আমরা এর জন্য বিশেষ কিছুই করতে পারব না।

প্রশ্ন: আপনি ‘মন্টু পাইলট’-এ কাজ করলেন সৌরভ দাসের সঙ্গে, কী অভিজ্ঞতা?

কিউ: আমি সৌরভকে চিনতাম না। চিনেছি এই কাজটা করতে গিয়ে। ওর অন্য কাজও দেখেছি। ওর মিউজি়কের কাজ দেখেছি, ও নানা ধরনের কাজ করে। সেটা আমার খুব ভাল লেগেছে। যেটা সকলে করে না। তাই খুব হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে গিয়েছে।

প্রশ্ন: টলিউডের স্ক্রিনিং কমিটি, অভিনেতা ব্যান আপনার ছবির বিষয় হতে পারে?

কিউ: আমি একটা ছবি নিয়ে লিখেছি, আমায় কেউ করতে দেবে না। সেটার নাম হল গুপি। এই যে সার্কাসটা অনেকদিন ধরেই ছিল! বাংলা ছবির ইতিহাসে গুপি শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার এই শব্দটা ছোটলোকেরও। আগে তো গুপি কথাটাই বলা যেত না। কিন্তু যেটা হচ্ছে, সেটা হল কাজ কিন্তু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মুম্বই থেকে কিন্তু এখন আর ছবি তৈরি করতে আসে না এখানে। এখন যেটা হয়েছে কাজই নেই! আগের বছর ক’টা কাজ হয়েছে। নম্বরই বলে দিচ্ছে।

প্রশ্ন: এই বিষয় নিয়ে তো তা হলে প্রশ্ন তোলা উচিত…

কিউ: প্রশ্ন তো তোলা হল। তারই জন্য তো ব্যানড হয়ে গেল! হল তো এত গন্ডগোল! কেউ তো চেষ্টা করল! কিছু তো হল না।

প্রশ্ন: টলিউডে তবে কি ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছে ?

কিউ: পুরোটাই ভয়ের আবহ। সবাই ভয়ে ভয়ে আছে। প্রসাধনশিল্পী, টেকনিশিয়ানদের জিজ্ঞাসা করুন। কাজ না হলে তো তাঁরা ভাত পাচ্ছেন না।

প্রশ্ন: আপনার কাজ হারানোর ভয় নেই বলে আপনি বলছেন..

কিউ: কাজ হারানোর ভয় নেই। কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তো আছে! সেটা থেকেও তো ভয় হতে পারে। আমিও ছবি করলে চাইব, আমার ছবি বার হোক।

Qaushik Mukherjee
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy