দিন দুই আগে এক সাক্ষাৎকারে বাংলা ধারাবাহিক নিয়ে মত জানিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। তাঁর মতে, সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে এমন কিছু ছোটপর্দায় না দেখানোই শ্রেয়। উদাহরণ হিসাবে তিনি ‘পরকীয়া’ ও ‘একাধিক বিয়ে’ দেখানোর কথা বলেছেন। চ্যানেল ও নির্মাতাদের কাছে সুস্থ বিনোদন ও গল্প তৈরির আর্জি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, “এমন কিছু না দেখানোই ভাল, যা দর্শকমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
সাল ২০২১। ওই বছর দেশের তথ্য ও সম্প্রচার দফতরের ঘোষণা ছিল, ধারাবাহিকে মহিলা খলচরিত্র এবং একাধিক বিয়ে আর দেখানো যাবে না। এতে প্রকারান্তরে নারীদের অবমাননা করা হয়। কারণ, খলচরিত্রের অধিকাংশই নারী। আরও ঘোষণা হয়েছিল, এই নিষেধাজ্ঞা জারি করতে ১৯৯৪ সালের ‘কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক’ আইনেও পরিবর্তন আনা হবে। ১ অক্টোবর এই বিষয়ে নোটিস জারি করেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সম্পাদক সোনিকা খট্টর। সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও বিষয়টিতে সায় দিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, “এক জনের কেন তিনজন বৌ থাকবে? এত কূটকচালেরই বা কী দরকার? এ যেন কৈকেয়ী-মন্থরার যুগ! যাঁরা জানেন না, তাঁরাও ধারাবাহিক দেখে অনেক কিছু জেনে বা শিখে যাচ্ছেন।”
শুধু বাংলা নয়, বহু বছর ধরে হিন্দি ধারাবাহিকেও ‘তিনটি বিয়ে’, ‘পরকীয়া’, শাশুড়ি-বৌমার দ্বন্দ্ব দেখানো হচ্ছে। সেই সময় একাধিক চ্যানেল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, দর্শক এই ধরনের গল্প দেখতে চান। একই কথা পাপিয়াও সম্প্রতি শুনেছেন। তিনি কথা বলেছিলেন ধারাবাহিক নির্মাতা এবং চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তাঁরাও তাঁকে ‘দর্শক এই ধরনের গল্প বেশি খায়’ বলে জানিয়েছেন।
রাজঋতের প্রেমে মগ্ন নায়িকা বিদ্যা ব্যানার্জি। ছবি: সংগৃহীত।
রাজ্য-রাজনীতির পর বাংলা ধারাবাহিকেও কি তা হলে পালাবদল ঘটতে চলেছে? প্রশ্ন নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম কথা বলেছিল দুই বিধায়ক-অভিনেতা পাপিয়া অধিকারী ও রুদ্রনীল ঘোষের সঙ্গে। কী বলছেন তাঁরা?
পাপিয়ার কথায়, “আমি বেদান্ত পড়া মানুষ। সেখান থেকেই জেনেছি, আমাদের দেশ এবং রাজ্যে পুরুষের একাধিক বিয়ে বা পরকীয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়। সেই জায়গা থেকেই মনে হয়েছে, এই বিষয়গুলি ধারাবাহিকে না দেখানোই শ্রেয়। কারণ, নানা বয়সের দর্শকের একটা বড় অংশ ধারাবাহিক দেখেন। তাঁদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে।” পাশাপাশি এ-ও জানান, বিষয়টি অবশ্যই তাঁর একার কথায় বাস্তবায়িত হবে না। তিনি সিনেমা, সিরিজ় এবং ধারাবাহিকের কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক এবং চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। সবার মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রায় একই কথা বলেছেন রুদ্রনীল। তাঁর বক্তব্য, “আমি, পাপিয়াদি, রূপাদি বা হিরণ— একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। সকলের মতামত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জানাতে পারি। তিনি যা মত নেবেন, সেটাই হবে।” তবে জাতীয়তাবাদ-বিরোধী কিংবা দেশ বা বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে যা খাপ খায় না, তেমন কোনও কিছু না দেখানোর পক্ষে অভিনেতা-রাজনীতিবিদও।
এ বার প্রশ্ন, ধারাবাহিকের গল্পের ধারা যদি বদলে যায়, দর্শক দেখবেন? টেলিপাড়ায় আগামী দিনে কী ধরনের ধারাবাহিক দেখানো হবে? প্রশ্ন করা হয়েছিল পরিচালক-প্রযোজক স্নেহাশিস চক্রবর্তী, রাজেন্দ্রপ্রসাদ দাস, স্নিগ্ধা বসু, অভিনেতা ঋষি কৌশিক, শোলাঙ্কি রায়কে।
রাজেন্দ্রপ্রসাদ সাফ বলেছেন, “আমি এই ধারার ধারাবাহিকের পক্ষে নই। ‘ফুলকি’, ‘রাণী রাসমণি’র গল্পে পরকীয়া বা একাধিক বিয়ের প্রসঙ্গ ছিল না। আমার নতুন ধারাবাহিক ‘কমলা নিবাস’-এও নেই। সুস্থ গল্প বলার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করি।” স্নেহাশিসের গল্পে পরকীয়া, একাধিক বিয়ে দূরের কথা, ঘনিষ্ঠদৃশ্য পর্যন্ত নেই। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি প্রেমের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী। তাই আমার গল্পে এই ধরনের কোনও উপাদান থাকে না, যা সমাজকে ভুল বার্তা দিতে পারে। তাই আমায় নতুন করে গল্পের ধারা বদলাতে হবে না।” একই সঙ্গে তিনি এ-ও জানান, হিন্দি ধারাবাহিক পরিচালনার কারণে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বলিউডে। ফলে, বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তাই বেশি কিছু এ বিষয়ে বলতে পারবেন না।
প্রযোজক স্নিগ্ধা এই প্রসঙ্গে দুটো দিক দেখিয়েছেন। এক, কোনও ধারাবাহিক পরকীয়া বা একাধিক বিয়ে দিয়ে শুরু হয় না। দুই, যা সমাজে ঘটছে তারই ছায়া পড়ে পর্দায়। তিনি আরও বলেন, “গল্প লিখে দিয়েই কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যায় না। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের থেকে আমরা আগে অনুমতি নিই। সেখান থেকে সবুজ সঙ্কেত মিললে দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়।” তাঁর এ-ও দাবি, “গল্প মেনেই কিন্তু পরকীয়া বা একাধিক বিয়ের প্রসঙ্গ আসে। দর্শক টানতে জোর করে আমরা জুড়ে দিই না।” তিনিও মনে করেন, বিষয়টি আলোচনাসাপেক্ষ। আশা করেন, সবার সঙ্গে কথা বলে নতুন কোনও নীতি বা নিয়ম নির্ধারিত হবে।
সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে তৈরি ‘ইষ্টিকুটুম’-এ অভিনয় করেছিলেন ঋষি কৌশিক। ছবি: সংগৃহীত।
যাঁদের এই দৃশ্যে নিয়মিত অভিনয় করতে হয়, ছোটপর্দার সেই নায়ক-নায়িকা কী বলছেন?
শোলাঙ্কি এই মুহূর্তে অভিনয় করছেন ‘মিলন হবে কত দিনে’ ধারাবাহিকে। নায়িকা বললেন, “রুচিশীল যে কোনও জিনিস বরাবর পছন্দ করি। তাই এমন কোনও দৃশ্যে অভিনয় করিনি, যা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে।” গল্পের ধারা বদলালে কি দর্শকসংখ্যা কমবে? শোলাঙ্কির যুক্তি, “ধর্মীয়, ঐতিহাসিক, পৌরাণিক হয়ে সামাজিক— সব ধারার গল্প ছোটপর্দায় দেখানো হয়েছে। সব বয়সের দর্শক সেই গল্প দেখেছেন। ফলে, মনে হয় না ধারা বদলালে দর্শক কমবে। তাঁরা সব ধারার গল্প দেখে অভ্যস্ত।”
ঋষি কৌশিক সমর্থন করেন পাপিয়ার বক্তব্যকে। জানিয়েছেন, যা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর, ভুল বার্তা যায়— সে রকম কিছু ধারাবাহিকের বিষয় না হওয়াই ভাল। পর্দায় যে এই সুযোগে একাধিক বার বিয়ে করতে পারতেন! প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেছেন অভিনেতা। বলেছেন, “আমাদের যা করণীয় সেটাই করি মাত্র। এর বেশি আর কোনও অনুভূতি নায়ক-নায়িকাদের মনে কাজ করে না।”