জ্যেষ্ঠপুত্র’-এর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। শুটিংয়ে কতটা মিস করলেন?

ঋতু চলে যাওয়ার পর ওকে নিয়ে কোনও কথা বলতে পারি না। এটা আমার একটা সমস্যা। ওকে নিয়ে কথা বলতে গেলে ঘেঁটে যাই। বয়স হয়ে যাচ্ছে তো। ইমোশনগুলো বেরিয়ে পড়ে। নিশ্চয়ই মিস করেছি ওকে। কৌশিক যখন বলে, এই গল্পটা ভাবব, বুম্বাদা দেখবে? আমি জানতাম ঋতু আমার জন্যই ভেবেছিল। কৌশিককে বললাম, দেখ খুঁজে পাস কি না। ফাইনালি যখন পেলাম, আমাদের খুবই ভাল লেগেছিল। অনেক দিন পর আমার নামের সঙ্গে সিগনেচারে ওর নামটা এল। আজকে আমি যেখানে বসে আছি, ওই লোকটাই তো ধাক্কা মেরে দেখিয়ে দিয়ে গেছে, তোর মধ্যে এটাও আছে। তুই কর। প্লাস ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বলি, পারিবারিক বন্ধুত্ব…

সেটাই নিশ্চয়ই মনে পড়ত শুটিংয়ে?

শুটিংয়ে এমন একটাও দিন যায়নি, যখন ওর কথা বলিনি। কৌশিকেরও ঋতুর সঙ্গে ঘর করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।  কৌশিক বলত, ঋতুদা থাকলে এটা করত। আমি বলতাম, ঋতু থাকলে বলত, ‘শোন এটা কর কৌশিক’…(ঋতুপর্ণ যে ভাবে কথা বলতেন, সে ভাবে দেখালেন)। টুম্পাও (সুদীপ্তা চক্রবর্তী) প্রচুর গল্প শেয়ার করত। আমাদের মধ্যে কোথাও না কোথাও এখনও ঋতু ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন, বুম্বাদার ডেডিকেশন আমাকে ইনসিকিওর করে দেয়, স্বীকারোক্তি ঋত্বিকের

আপনার মা মারা যাওয়ার পরের ঘটনা দেখে নাকি এটা ভেবেছিলেন ঋতুপর্ণ?

ইয়েস। আমার মা মারা যাওয়ার পর ও ১০ দিন ১০ রাত আমার সঙ্গে ছিল। ‘জেষ্ঠ্যপুত্র’ আইডিয়াটা তখন এসেছিল ওর। ও তখন দেখেছিল এক জন স্টারের মা মারা গেলে কী হয়। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম সে দিন, এই জন্যই আমার থেকে ভাল এই গল্পের ভাবনাটা কেউ বুঝতে পারবে না। ও বলেছিল, তোর ঘটনাটা রাখব। কিন্তু বাইরেটা বদলে দেব। তুই স্টার। কিন্তু তুই বিশু আঙ্কেলের ছেলে। বড় বাড়ির ছেলে। এটাকে একটা স্মলটাউন হিরো করে দেব ছবিতে। ঋতুর ছবি যেমন হত, দুর্গাপুজোর চার দিনের গল্প। এটাও শ্রাদ্ধবাড়ির তিন দিনের গল্প।


ছবির দৃশ্যে ঋত্বিক এবং প্রসেনজিত্।

মা মারা যাওয়ার পর ব্যক্তি প্রসেনজিতের কোনও জায়গা ছিল না, তা হলে—

মা মারা যাওয়ার পর কাঁদার সময় কেউ দেয়নি আমাকে। দোষটা আমার। কারণ আমি মিডিয়াকে পছন্দ করি। তাদের ফেরাতে পারিনি। সে সময় যে সেলেবরা এসেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করতেই হয়েছিল। আমার মনে আছে, মাকে যখন শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখন সিআরপি নামাতে হয়েছিল। গঙ্গার ওপার থেকে বহু লোক নৌকো করে চলে এসেছিল। ফাইনালি যখন শ্মশানে কাজটা হচ্ছে আই হ্যাড টু মুভ আউট। শ্মশান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। ব্যক্তি প্রসেনজিতের তখন আর ভাল-মন্দর জায়গা নেই। ওটাই তার অস্তিত্ব। তখন বয়স আরও কম ছিল। ম্যাচুয়োরিটি কম ছিল। ধৈর্য্য কম ছিল। তখন তো ঋতু সঙ্গে ছিল। আসলে মানুষ হিরোদের চোখে জল দেখতে পছন্দ করে না। কিন্তু তারা কতটা জেতে, সেটাই এই সিনেমাটা বলবে।

ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের জায়গা যে নেই, বহু বছর ধরে, খারাপ লাগে না?

এটাই তো পেয়েছি জীবন থেকে। শিখেছি। তাই পরের জেনারেশনকে অনেক বেটার বোঝাতে পারি। দুঃখ, কষ্ট, অভিমান সবই আছে আমারও ঠিক আপনার মতো। আর পাঁচ জনের মতো। কিন্তু ওই জায়গাটা ছেড়ে দিতেই হবে। মা মারা যাওয়ার সময় শ্মশানের ওই কাজটা আমার বোনকে করতে হয়েছিল। আমি তো গিয়েছিলাম। কিন্তু করতে পারিনি। এই ভাবে কত মিস আন্ডারস্টুড হই জানেন।

আরও পড়ুন, ‘ও জানতেই পারল না, আমার ওকে মনে আছে…’

কী রকম?

অনেক আগের কথা বলছি। কোনও কাজিনের বিয়েতে যাব ঠিকই করেছি। রাত করে যাব। আড্ডা মারব। কিন্তু পারিনি। তারা হয়তো ভেবেছে, এল না। বা এসেই চলে গেল। কিন্তু একটা সময় বিয়েবাড়িতে গিয়ে দেখেছি, যাদের বিয়ে তাদের কাছে কোনও লোকই নেই। সবাই আমার কাছে। কতটা খারাপ লাগে বলুন তো? তখন তো আমি ফ্যামিলি ম্যান। এটা শুধু ফিল্মস্টার নয়। যে কোনও সেলিব্রিটির এই সমস্যাটা হয়। তাই ছবিটার সঙ্গে সবাই রিলেট করতে পারবে।

এই ছবির প্রথম অ্যানাউন্সমেন্টের দিন আপনি বলেছিলেন, ঋত্বিকের জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেবেন…

(হাসি) এটাতে ঋত্বিক ফাটিয়ে বল করেছে, সুদীপ্তাও তাই। আমার তো হেলমেট নেই। কিন্তু খেলতে তো হবে। যেটুকু সেভ করেছি সেটুকু আমার ম্যাচিওরিটি দিয়ে। মারাত্মক লেভেলের অ্যাক্টর তো এরা সব। আমাকে শুধু ম্যাচিয়োরিটি দিয়ে সেভ করতে হয়েছে, যাতে মাথাটা না ভাঙে। ঋতুর সব প্রিয় শিল্পীকে কৌশিক নিয়েছে এখানে। বেণীও ঋতুর খুব ফেভারিট। একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানেন…


ছবির দৃশ্য়েও যখন প্রসেনজিত্ তারকা।

কী?

ঋত্বিকের সঙ্গে এর আগেও একটা, দুটো ছবিতে কাজের কথা হয়েছিল। এটা আমাদের দু’জনের জন্য যে আসছিল সেটা জানতাম না তো। এই কাজটা হবে বলেই হয়তো আগেরগুলো হয়নি। ছবির ভাল-মন্দ ছেড়ে দিন। এই দুটো লোক ছাড়া এই দুটো চরিত্র হয় না, দায়িত্ব নিয়ে বলছি। ওই মিডল ক্লাস, ওই ভ্যালুজ বিশ্বাস করা একটা লোক। সে মুখের ওপর দাঁড়িয়ে যা খুশি বলতে পারে (ঋত্বিকের চরিত্র)। আর একটা লোক এই ভ্যালুজগুলো থেকে বেরিয়ে গিয়েছে কত কাল আগে (প্রসেনজিতের চরিত্র)। আমরা ঋত্বিকের জন্য ডেট অ্যাডজাস্টও করেছি।

জেষ্ঠ্যপুত্রই তা হলে ব্যক্তি প্রসেনজিত্— চরিত্রটার প্রস্তুতি নিলেন কী ভাবে?

শক্ত চরিত্রই লোকে দেয় আমাকে। তার লেয়ার তৈরি করতে হয়। যেটা আমরা সিনেমায় দেখছি না, সেটা যদি বার করতে পারেন কেউ, তবেই তিনি ভাল অভিনেতা। আমি গত ১০ বছর ধরে এই চেষ্টাটাই করি। প্রথম চেষ্টাটা থাকে হলে বসে প্রসেনজিত্‌কে যাতে লোকে ভুলে যায়। তার পর স্ক্রিপ্টে যেটা নেই, সেটা দেখানোর চেষ্টা করি। ক্যারেক্টারের সাইকোলজিক্যাল সাইটটা বুঝতে পারি, সেটাই প্রস্তুতি।

আরও পড়ুন, ‘আর কী করলে আমাকে অন্য চরিত্রেও ভাববে, জানি না’

যে প্রশ্নটা না করলে, ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’র সাক্ষাত্কার শেষ হবে না, সেটা হল গল্প নিয়ে প্রতিম ডি গুপ্তর ফেসবুকের বক্তব্য এবং আপনার সংবাদমাধ্যমে দেওয়া উত্তর।

আমরা এটা নিয়ে আর কথা বলছি না।

কিন্তু এই ছবিটার সঙ্গে তো বিতর্ক না জড়ালেই ভাল হত…

আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। যেখানে আমার, ঋতুর নাম জড়িয়ে আছে। আমি কৌশিকের কথাও বলছি। ও অনেক সিনিয়র। এটা না হলেও হত। এমন সমস্যা কোথাও হলে লোকে আমার কাছে আসে মেটানোর জন্য…। আমার কাছে অন্য ভাবে হয়তো ও প্রকাশ করতে পারত। চিঙ্কুর নাম জড়িয়েছে বলে আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে। একটা পয়সা নেয়নি ও। যাই হোক, আমরা এখন আদর করে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়েছি।

(সেলেব্রিটি ইন্টারভিউ, সেলেব্রিটিদের লাভস্টোরি, তারকাদের বিয়ে, তারকাদের জন্মদিন থেকে স্টার কিডসদের খবর - সমস্ত সেলেব্রিটি গসিপ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের বিনোদন বিভাগে।)