পুজো তো এসে গেল?
(হাসি) হ্যাঁ। মার্চ থেকেই এ বার পুজোর গন্ধ চালু হয়ে যাবে। এ বছর তো দুটো মহালয়া। মার্চে আর সেপ্টেম্বরে।

মহালয়া শুনলে প্রথমে কী মনে হয়?
মহালয়া শুনলে প্রথম অনুভূতি পুজো এসে গেল। পুজো শুরু। ছোটবেলার নস্ট্যালজিয়া। এমন একটা বয়স থেকে শুনতে আরম্ভ করেছি, যখন হয়তো বুঝিই না বিষয়টা। তখন থেকে কানে আসত একটা কণ্ঠ, কতগুলো গান, একটা অদ্ভুত অনুভূতি হত। একটা আমেজ তৈরি হত। একেবারে ছোটতে যখন শুনেছি এক রকম। পরের বছরে যখন শুনেছি তখন মনে হল, এটা আমার পড়াশোনার ছুটি। আজ থেকে আর পড়তে হবে না। কারণ পুজো আসছে। এই গন্ধটা পেয়ে যেতাম। হুল্লোড় করার অনুভূতি তৈরি হত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা আরও জানতে শিখলাম। বুঝতে শিখলাম। তখন মনে হত সত্যিই, যদি পুজো আসতে হয়, তা হলে এমন একটা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই পুজো আসা উচিত।

যে কণ্ঠের কথা আপনি বললেন, অর্থাত্ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, তাঁকে বড়পর্দায় দর্শক আগে দেখেননি। আপনাকেই প্রথম দেখবেন ওঁর চরিত্রে। সেটাতে কি কিছুটা সুবিধে হল?
সুবিধে তো বটেই। বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে দেখেননি বলে সুবিধে। উনি কণ্ঠের কারিগর। ফলে বেতারেই ওঁর যাবতীয় কারিকুরি। আর বেতারের একটা সুবিধে আছে। যদি কারও কণ্ঠ মানুষের ভাল লেগে যায়, তাঁর একটা অবয়ব মনে মনে তৈরি করে নেন মানুষ। বীরেনবাবুর ক্ষেত্রেও তাই। কল্পনায় উনি অনেকের কাছে অনেক ভাবে ছিলেন। পরবর্তীকালে যখন ছবি বেরিয়েছে তখন লোকে বুঝেছে উনি কেমন ছিলেন। এ বার আমার কাছে যখন পরিচালক, মানে সৌমিক, প্রথম ছবিটা নিয়ে এলেন আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, অভিনেতা হিসেবে এ ধরনের চরিত্র পাওয়া খুব ভাগ্যের এবং খুব কমই পাওয়া যায়। সৌমিক বলেছিল, আমার দীর্ঘ দিনের রিসার্চ ওয়ার্ক এটা। মানে ছবিটা করব বলে করা নয়। এটা প্রাথমিক ভাল লাগার জায়গা। চিত্রনাট্য পড়েও মুগ্ধ হয়েছি। অনেক রকম ছবিতে তো কাজ করি। অনেক রকম চিত্রনাট্য পড়ি। কিন্তু এ একেবারে অন্য রকম।

আরও পড়ুন, পুরুষ না মহিলা, কেমন সঙ্গী পছন্দ? চান্দ্রেয়ী বললেন…

অভিনেতা হিসেবে এ ধরনের চরিত্র তো লোভনীয়?
অবশ্যই। আমার জীবনে একটা ‘হারবার্ট’ এসছে। একটা ‘শিল্পান্তর’ এসছে। একটা ‘মেঘে ঢাকা তারা’ এসছে। একটা ‘গোরস্থানে সাবধান’ এসছে। নানা রকমের চরিত্র। দীর্ঘ দিন বাদে এ রকম একটা ছবি এল, যেটা আমি কল্পনাই করিনি।

প্রস্তুতি নিলেন কী ভাবে?
আমার কল্পনাতে প্রথম কণ্ঠটা ছিল। আমি নিজে ১৯৮০ সাল থেকে বেতারে অভিনয় করছি। ফলে কণ্ঠ নিয়ে সব সময় ভাবি। বেতারও আমার খুব প্রাণের জায়গা। চরিত্রটা করতে গিয়ে প্রথমত পরিচালক, চিত্রনাট্যকারের ভাবনাটা শুনলাম। তার পর বীরেনবাবু সম্পর্কে যা লেখা বেরিয়েছে সেগুলো পড়লাম। তার পর কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম যাঁরা বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যাঁরা মানুষটাকে কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁদের মধ্যে নাট্য প্রযোজকই বেশি। অজিত মুখোপাধ্যায়, সমরেশ ঘোষ এবং জগন্নাথ বসু। এঁদের সঙ্গে কথা বলি। জগন্নাথদা আমাকে বীরেনবাবু সম্পর্কে অনেক কিছু জানালেন। কী ভাবে বীরেনবাবু কথা বলতেন, কী ধরনের আচরণ করতেন, কথা বলতে গিয়ে শারীরিক ভঙ্গি কী হত বললেন। নিজে হেঁটে দেখালেন বীরেনবাবু কী ভাবে হাঁটতেন। তার পর আমার মনে হল, বীরেনবাবুর একটা কণ্ঠই আমরা বারবার শুনি। মহালয়ার অনুষ্ঠান। কিন্তু তার বাইরে উনি কী ভাবে কথা বলতেন, বাচনভঙ্গি কী ছিল সেটা শোনার জন্য রেডিওর কিছু নাটক, সাধারণ ভাবে কথা বলে কিছু অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন সেগুলো শুনব। বর্তমানে যিনি বেতারের নাট্য প্রযোজক সিদ্ধার্থ মাইতি, লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। যেখানে ইতিহাস রাখা রয়েছে। লাইব্রেরির কর্ণধার আমাকে বীরেনবাবুর বিভিন্ন রেকর্ড বাজিয়ে শোনালেন। তার মধ্যে কিছু নাটক শুনলাম। ওনার কিছু টক শো-এর কথাবার্তা শুনলাম। তার পর আমার ভাবনায় বীরেনবাবু যেমন সেটা তৈরি করেছি। এর পর ভাল-মন্দ দর্শকের বিচার।


বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের লুকে শুভাশিস।

ছবিতে কি ব্যক্তি বীরেনকেও দেখানো হয়েছে?
ছবিটা একটা বিশেষ সময়কে ধরে করা। আকাশবাণীর সঙ্গে বীরেনবাবুর সম্পর্ক এবং তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কও দেখানো হয়েছে।

১৯৭৬-এ যে বদলটা হয়েছিল বেতারে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের বদলে উত্তমকুমার— আপনি সমর্থন করেন?
না। আমি ওই বদলটা সমর্থন করি না। আমি বিরাট ভক্ত উত্তমকুমারের। বড় মাপের মানুষ এবং বড় মাপের অভিনেতা। উনি নিজেই তো প্রথমে রাজি হননি। বীরেনবাবুর কাছে গিয়েছিলেন। এটা বলতে, যে আমি চাইছি না। সবাই আমাকে করতে বলছে। বীরেনবাবুই ওঁকে বলে রাজি করিয়েছিলেন। সুতরাং যে মানুষটা নিজে করতে চাননি...। ওটা সাকসেসফুল হয়নি বলে বলছি না, বীরেনবাবুর কণ্ঠ এমন ভাবে গেঁথে আছে, গান, পুরো অনুষ্ঠানটাই এত মনোমুগ্ধকর, সেটা বাদ দিয়ে অন্য কিছু শুনতে ইচ্ছেও করত না।

এত দীর্ঘ কেরিয়ার আপনার, কিন্তু একটু আগে নিজেই মনে রাখার মতো চার-পাঁচটা ছবির নাম বললেন। আক্ষেপ হয়?
আক্ষেপ হয় না। আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। আমার ভাগ্যে এটাই এসেছে। তবে আমি আশাবাদী। আরও ভাল ছবি আসবে হয়তো। আর আমি যখন বেশি কাজ করেছি তখন এ ধরনের ছবি হয়নি। কমই হত। এখন বিভিন্ন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। কনটেন্টে। সে সময় এটা হত না। একই রকমের কাজ হচ্ছিল। এখান-ওখান থেকে ধার করে কাজ হচ্ছিল।

আরও পড়ুন, অল্প বয়সে সাফল্যে পিআর কতটা কাজে লাগল? ঋদ্ধি বললেন...

কিন্তু আপনার মনে হয় না, আরও বেশি সুযোগ পাওয়া উচিত ছিল?
কী বলব, এটা আমি জানি না। প্রযোজক, পরিচালকরাই বলবেন কেন আমাকে নিয়ে ভাবেন না। সৌমিক ভেবেছে, বা প্রফেশর শঙ্কু প্রথম হচ্ছে। এই বছরের শেষে আসবে। সন্দীপ রায় করছেন। নকুড়বাবু এল ডোরাডো নিয়ে। আর সেখানে নকুড়বাবুই আমি। সেটাও তো এসেছে। হয়তো আরও কেউ ভাববেন।

এত যে কম সুযোগ এসেছে, তার জন্য দায়ী কে?
নিজেকে ছাড়া আর কাকে দোষ দেব? আমিই নিজেকে তৈরি করেছি। আমার কাজের ভাল-মন্দ সবটা আমারই। কেন আমাকে দিয়ে অন্য ধরনের চরিত্র করাচ্ছেন না, সেটা প্রযোজক, পরিচালকরা বলতে পারবেন। আর কী কী করলে তাঁরা আমাকে অন্য চরিত্রে ভাববেন, সেটা সত্যিই আমি জানি না। আমার বয়সটা হয়তো বাড়বে, কিন্তু আমি আশাবাদী। আর ‘মহালয়া’র জন্য আমি প্রযোজক প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়ের কথা আলাদা করে বলতে চাই।

নিশ্চয়ই...
প্রযোজকের ডিসিশনটাও খুব ইম্পর্ট্যান্ট। আর এই ছবির ক্ষেত্রে তো বটেই। কাকে কোন চরিত্রে মানাবে সেটা প্রসেনজিত্ খুব ভাল বোঝে। ওর এত দিনের অভিজ্ঞতা। সে চেয়েছিল আমিই কাজটা করি। ওর সঙ্গে এত দিনের সম্পর্ক...পরিচালক, অভিনেতা প্রসেনজিতের সঙ্গে আগেই কাজ করেছি। আজ প্রযোজক প্রসেনজিতের সঙ্গে কাজ করলাম। একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল।

আর কী কী ছবি আসছে আপনার?
অভিমন্যু মুখোপাধ্যায়, সুজিত পালের ছবি আসছে। দুটোই কমেডি। দেখুন, এ ধরনের ছবিগুলো আমি ছেড়ে দিইনি। করব না বলিনি। কিন্তু তার সঙ্গে আমাকে ‘মহালয়া’র মতো ছবিও করতে হবে। আমি চাই এগুলো করতে। কিন্তু ওই ছবিগুলোই আমাকে শুভাশিস মুখোপাধ্যায় তৈরি করেছে। আজ আমাকে যে মানুষ চেনেন, গ্রামবাংলায় আমার যে পরিচিতিটা, সে তো ওই ছবিগুলো করেছিলাম বলেই। অতগুলো ওই ছবি করেছি বলেই হয়তো আজ এই ধরনের ছবি দিয়ে ডিফারেন্সটা বোঝাতে পারি। ওই ছবিগুলো যাঁরা দিয়েছেন তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ দর্শকের কাছে। তাঁরা আমাকে গ্রহণ করেছেন বলেই তো...তাঁরা ছুড়ে ফেলে দিলে কারও ক্ষমতা থাকত না এই কাজটা করব।

আরও পড়ুন, আর একটু বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেক্সটাকে ব্যবহার করতে হবে, বলছেন রাহুল

ইন্ডাস্ট্রি আগের তুলনায় কতটা বদলেছে?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টেকনিক্যাল বদল হয়েছে। অভিনয়ের ধরন পাল্টেছে। আর মানুষের মধ্যে সম্মান দেওয়ার জায়গাটা কমেছে।

মানে?
এখন ইয়াং জেনারেশন যারা আসছে তাদের মধ্যে সিনিয়রদের সম্মান করার জায়গাটা কমছে। সবাই নয়। কারও কারও ক্ষেত্রে হচ্ছে।

আপনি নিজে ফেস করেছেন?
হ্যাঁ, আমি নিজেও ফেস করেছি। সেটা খারাপ লাগে। মনে হয় এটা তো কাম্য নয়। আমরা আমাদের সিনিয়রদের ভগবানের মতো ভক্তি করতাম। সিনিয়রদের সেই জায়গাটুকু দেওয়া উচিত।

(সেলেব্রিটি ইন্টারভিউ, সেলেব্রিটিদের লাভস্টোরি, তারকাদের বিয়ে, তারকাদের জন্মদিন থেকে স্টার কিডসদের খবর - সমস্ত সেলেব্রিটি গসিপ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের বিনোদন বিভাগে।)