একটা নাটক। একটা বিজ্ঞাপন আর ১৮০০ রজনী।
সত্তর দশকের সেই আগুন ছাই সরিয়ে থার্ড বেল-এর অপেক্ষায়। অসীম ‘বারবধূ’ চক্রবর্তী মঞ্চে আসছেন ব্রাত্য বসুর নাটক ‘অদ্য শেষ রজনী’র অমিয় হয়ে। উগরে দিচ্ছেন ক্ষোভ, ‘আমার থিয়েটার পপুলার। তাই আমি খারাপ থিয়েটার করি!’
পপুলার বলেই খারাপ? সত্তর দশক থেকে ২০১৬। গ্রুপ থিয়েটারে ভাল-খারাপ বিতর্ক কি মিটেছে?
ব্রাত্য এই প্রশ্নটাই ফিরে দেখতে চান। ‘‘যা জনপ্রিয় তা উৎকৃষ্ট নয়, এ রকম একটা ভাবনার অভ্যেস আমাদের আছে। যত দিন অসীম ব্রেখট-কামু করতেন, তিনি গ্রুপ থিয়েটারের ঘরের লোক ছিলেন। যেই ‘বারবধূ’ করলেন আর সেটা হিট হল, তিনি অচ্ছুত!’’
নাট্যসমালোচক পবিত্র সরকারের মত একটু আলাদা। তাঁর কথায়, ‘‘বারবধূ’র প্রভাব কিন্তু গ্রুপ থিয়েটারে পড়েনি। পড়েছিল পেশাদার মঞ্চে। এ-মার্কা নাটকের জোয়ারে।’’ সুতরাং ‘বারবধূ’কে আর পাঁচটি গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে তুলনা করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকছে। অকালপ্রয়াত অসীম ‘বারবধূ’ নিয়ে পাল্লা দিতেন পেশাদার মঞ্চের সঙ্গেই। ‘চৌরঙ্গী’তে মিস শেফালি-র আবহে প্রতাপ মঞ্চে সপ্তাহে তিন দিন ‘বারবধূ’। বাদ যেত না অ্যাকাডেমিও। পরে অশ্লীলতার অভিযোগ জাঁকিয়ে বসায় অ্যাকাডেমি কর্তৃপক্ষ নাটকটি মঞ্চস্থ করবেন না বলে চিঠি দেন (১৯৭৪)। ১৯৭৭-এ বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে অসীমের ‘বিবেকের কাছে অনুরোধ’ করেছিল নাটকটি বন্ধ করার জন্য। অনুরোধ। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘...নাটকটি সম্পর্কে আমার অপছন্দ গোপন ছিল না, কিন্তু সেটিকে বন্ধ করার চিন্তা আমরা কখনওই করিনি।’
সেই বিস্ফোরক বিজ্ঞাপন
‘অশ্লীল’ নাটক বন্ধ করার সরকারি উদ্যোগ এসেছিল আরও পরে, নব্বই দশকে। পেশাদারি থিয়েটারের সেই শেষ লগ্নেও বেশ কিছু প্রেক্ষাগৃহে এ-মার্কা নাটক চলত। ১৯৯৪ সালে কলকাতা পুলিশ ‘সঙ্গিনী’ নামে একটি নাটকের প্রদর্শন বন্ধ করে। কিন্তু সেই ঘটনাকে নাটকের উপরে সেন্সরশিপ হিসেবে দেখেননি তেমন কেউই। নাটকের মূলস্রোতের সঙ্গে এই সব নাটকের কোনও সম্পর্ক আছে বলেও মনে করা হয়নি। হলুদ বই আর নীল ছবির গোত্রেই পড়েছিল তারা। গ্রুপ থিয়েটারে অশ্লীলতার তকমা বরং ফিরে আসে ২০০৬-এ। হাওড়ার এক মঞ্চের বাইরে ‘আগুনের বর্ণমালা’ নাটকটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। ঘটনাটা যদিও বেশি দূর গড়ায়নি।
‘বারবধূ’ তাই স্বতন্ত্র। ব্যবসায়িক সাফল্যে তার ধারেকাছে কোনও ‘গ্রুপ থিয়েটার’ আজ অবধি আসেনি। বিতর্কের আঁচও আর কারও জন্য এত গনগনে হয়নি বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লেখেননি ‘অদ্য শেষ রজনী’র মতো উপন্যাস। রুদ্রপ্রসাদ আজও মনে করেন, ‘‘অসীম সত্যিই শক্তিশালী নাট্যপরিচালক ছিল। অনেক ভাল নাটক এক সময় করেছে। ও যে সঙ্কটে পড়েছিল, সেটা গ্রুপ থিয়েটারেরই সঙ্কট।’’ কী রকম? বাঁধা হল-এ সপ্তাহে চারটে করে শো ভরানোর মতো দর্শক গ্রুপ থিয়েটারের ছিল না। রুদ্রবাবুর কথায়, ‘‘সেটা করতে গেলে হয় ব্যর্থতা (নান্দীকারের ক্ষেত্রে যেটা ‘রঙ্গনা’য় হয়েছিল) নয় বিপথগামিতা, মানে নাটকের সঙ্গে আপস করাই ছিল নিয়তি।’’ ব্রাত্যর নাটকেও দেখি অমিয়র হাহাকার, ‘‘আমার সমস্ত বোধকে খেয়ে ফেলল ওই বিজ্ঞাপন!’’
১৯৭২ সালের ১৫ অগস্ট প্রথম অভিনয়। ‘বারবধূ’র মুখ্য অভিনেত্রী কেতকী দত্ত লিখেছেন, ‘শো-এ কোনও বিক্রি নেই।…পাগল পাগল অবস্থা…পাবলিসিটির জন্য স্লোগান মাথায় এল অসীমের— ভালবাসার ব্লো-হট নাটক।’ অক্টোবর থেকে নতুন বিজ্ঞাপন বেরোল। লোক টানার তাড়নায় বিতর্কিত দৃশ্যও ঢুকল। একটা শো-এ দৈবাৎ নায়িকার জামা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন অসীম। তার পর ওটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। ব্রাত্যর নাটকে অমিয় হেঁকে বলে, ‘‘চব্বিশটা জামার অর্ডার দাও। রোজ ছিঁড়ব।’’ ১৯৭৭ সালের ৩০ জুলাই ‘দেশ’ পত্রিকায় রুদ্রপ্রসাদ লেখেন, ‘অসীম চক্রবর্তী ব্রাসিয়ারের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে বারবধূকে এশীয় রেকর্ডের পথে নিয়ে যাচ্ছেন...।’
‘বারবধূ’ নাটকের দৃশ্য
প্রবীণ নাট্যকর্মী অসিত বসুর স্মৃতিও বলছে, গ্রুপ থিয়েটার মহলে ওই বিজ্ঞাপন এবং ছবি-পোস্টার নিয়ে খুবই সমালোচনা হয়। উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়রা এটা মানতে পারেননি। কেন? অসিতের কথায়, ‘‘ব্যবসায়িক সাফল্যটা কোনও কারণ নয়। থিয়েটার করে ব্যবসা হতেই পারে। ব্যবসার জন্য কোন স্তরে যাওয়া হবে, সেটাই বিতর্কের জায়গা।’’ পরবর্তী কালে ‘আগুনের বর্ণমালা’-র সময়ে রুদ্রপ্রসাদ মুক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘‘যৌনতা নিয়ে ছুৎমার্গ থাকা উচিত নয়।’’
অর্থাৎ যৌনতা নয়, প্রশ্নটা তাকে ব্যবহার করার ধরন নিয়ে। সময়ের গতিতে গ্রুপ থিয়েটারে যৌনতা-নগ্নতা বেড়েছে বই কমেনি। বিতর্কও হয়নি তা নয়। কিন্তু ‘বারবধূ’ ঘরানার ছবি-পোস্টার বা বিজ্ঞাপন
গ্রুপ থিয়েটারের মূল
ধারায় সে ভাবে আর ব্যবহৃত হয়নি। হলেও নজর কাড়ার জায়গায় যায়নি। ব্রাত্য মনে করাচ্ছেন, ‘‘অসীমের উত্তরাধিকার মানে কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন-পোস্টার নয়। অসীম গ্রুপ থিয়েটারকে পেশাদারি জমিতে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। সেই
ভাবনার কাছে আমাদের ঋণ।’’ ‘‘আবেগের মানচিত্রেই অসীমকে ধরতে চেয়েছি’’, বলছেন অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য।
বকেয়া অনাদায়ে পুরসভা প্রতাপ মঞ্চে তালা ঝুলিয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২৯ অক্টোবর। খানিক থমকেছিল ‘বারবধূ’। পুরসভারই এক মঞ্চে আজ ‘কলঙ্কিত’ নায়কের প্রত্যাবর্তন।