গত কয়েক বছর ধরে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বল-ভরসা ছোটপর্দার অভিনেতারা। সৌমিতৃষা কুন্ডু, দিব্যজ্যোতি দত্ত, প্রিয়া পাল, ভিভান ঘোষ, তিয়াশা লেপচা, কিংবা ভরত কল— রাজ্যে নির্বাচন মানেই প্রচারে এঁরা থাকবেনই। তালিকায় এ বছরের নতুন মুখ শিঞ্জিনী চক্রবর্তী।
ভোটের প্রচারের পাশাপাশি ধারাবাহিকের শুটিং। অনেক সময় যোগ হয় শহরতলির মঞ্চানুষ্ঠান। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত দম ফেলার ফুসরত মেলে না ছোটপর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের। এ বছরের প্রচার কি আরও জোরালো ছিল? কী ভাবে সব সামলালেন তাঁরা? সবিস্তার জানতে আনন্দবাজার ডট কম যোগাযোগ করেছিল এঁদের সঙ্গে।
সৌমিতৃষা এখনও দর্শকের কাছে ‘মিঠাই’। তাঁকে প্রচারেও দেখা গিয়েছে যথেষ্ট। যদিও ফোনে সাড়া মেলেনি তাঁর। তবে আমতা, উত্তরপাড়া, হাওড়া, লিলুয়া, বালি, বেলুড়, করিমপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর— কোনও জায়গা বাদ দেননি তিনি। ‘মিঠাই’ আসছে, খবর ছড়াতেই জনজোয়ার। সঙ্গে পুষ্পবৃষ্টি। সে কথার উল্লেখ করে সৌমিতৃষা লিখেছেন, “এই এক মাসে এত জনজোয়ার, এত ভালবাসা সারা মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় পেলাম, আমি কৃতজ্ঞ।”
ভোটপ্রচারের ফাঁকে সৌমিতৃষা কুণ্ডু। ছবি: ফেসবুক।
আপাতত ধারাবাহিকের শুটিং নেই। সেই ফাঁকে এই প্রথম শিঞ্জিনী ভোটপ্রচারে। কেমন লাগল? তাঁর কথায়, “আমি রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালবাসা বুঝি। এ বছর মাত্র একটি প্রচারেই যোগ দিয়েছিলাম। অদ্ভুত সাড়া পেয়েছি! বলতে পারেন, সাধারণ মানুষদের এই ভালবাসাই আমাদের পারিশ্রমিক।”
দীর্ঘ দিন ধরে ভোটের প্রচারে যুক্ত প্রিয়া, ভিভান। রাজনৈতিক প্রচারে ছোটপর্দার জনপ্রিয় মুখেরা এত যোগ দেন কেন? ভিড় টানতে? না কি সাধারণ মানুষ তাঁদের কথা বেশি শোনেন?
প্রিয়া এবং ভিভানের উত্তর, “কোনও দলই কোন অভিনেতাকে জোর করে না। যিনি যে দলকে বিশ্বাস করেন, তিনি নিজে থেকেই সেই দলের প্রচার করেন।” যেমন, ভিভান বা প্রিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রচার করেন। ভিভান বললেন, “এ বারের প্রচারে বেশি করে সময় দিতে পেরেছি। কারণ, তার আগেই ‘চিরসখা’ ধারাবাহিক শেষ হয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ— সর্বত্র চষে ফেলেছি। আমরা রাজনীতির বুলি আওড়াই না। সহজ ভাষায় কথা বলি। জনতা তাই আমাদের কথা শোনে।” পাশাপাশিই ধারাবাহিক ‘পরশুরাম: আজকের নায়ক’-এর শুটিং সামলেছেন প্রিয়া! কী করে পারতেন এত কিছু? “সকালে প্রচার করেছি, বিকেলে শুটিং। এ ভাবেই সামলেছি পুরোটা। প্রযোজনা সংস্থাও আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে।” সুস্থ থাকতে দুই অভিনেতাই প্রচুর জল খাওয়ায় বিশ্বাসী। প্রিয়া ছাতুর সরবতের বদলে এই সময় রাগী আর টক দই দিয়ে সরবত বানিয়ে নিতেন। “এতে পেট ভরা থাকত। আবার প্রচুর ফাইবার। ফলে, শরীর সুস্থ থাকত।”
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের প্রচারে গিয়ে নিজেই জানিয়েছেন, ছোটপর্দার অভিনেতারা প্রচণ্ড খেটেছেন! সেই তালিকায় নাম দিব্যজ্যোতি দত্তেরও। দিব্যজ্যোতি এই মুহূর্তে বড়পর্দা নিয়ে ব্যস্ত। ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন না। এতে চাপ কি কম ছিল? অভিনেতার কথায়, “বদলে মঞ্চানুষ্ঠান ছিল।” সব দিক সামলাতে গিয়ে রাতের পর রাত জেগেওছেন তিনি। অভিনেতার কথায়, “দিদিকে ভালবাসি। ওঁর জন্য সব করতে পারি।” দিব্যজ্যোতি মাংস খাওয়া ছেড়েছেন অনেক দিন। গরমে সুস্থ থাকতে তাঁর পাতে থাকত মাছ। মাঝেমধ্যে ডিম।
প্রচারে আছেন দিব্যজ্যোতি দত্ত, মঞ্চানুষ্ঠানেও। ছবি: ফেসবুক।
ভরত কল। ৫৬ বছরেও পরিশ্রমের দিক থেকে অল্পবয়সিদের হার মানান। প্রচারের ফাঁকে তাঁকেও নিয়মিত শুটিং করতে হয়েছে। প্রসঙ্গ তুলতেই ভরত বলেছেন, “রাজ্য বাঁচাতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর হাত শক্ত করতে হবে। এই জোরেই হয়তো পারি।”
ভোটের প্রচারে বেরিয়ে প্রত্যেক অভিনেতা নির্বাচনের ফলাফলের আগাম ‘জল মেপেছেন’! প্রত্যেকের দাবি, ‘এসআইআর’-এর ভয়ে যাঁরা ভোট দিতেন না এত দিন, তাঁরাও ভোট দিয়েছেন বা দেবেন। এতে ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের নানা ভাতা গ্রামের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ফলে, সেখানেও মুখ্যমন্ত্রী প্রচুর ভোট পাবেন বলেই আশা তাঁদের। ভরত যেমন বলেছেন, “২০০-রও বেশি আসন নিয়ে সরকার গড়বেন দিদি। মিলিয়ে নেবেন।” ২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপি-র লড়াইটা যে আরও জোরালো সে কথাও একেবারে অস্বীকার করতে পারেননি তাঁরা। প্রিয়া বলেছেন, “দিদি এ বার আরামবাগের অলিগলি চষে ফেলেছেন! একই ভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছেন। ভাবা যাচ্ছে না।”
প্রিয়া পাল এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
নির্বাচন যদি সত্যিই বদল আনে, তার প্রভাব পড়বে টলিউডে? ভরতের মতে, “৩৩ বছরের পেশাজীবনে কোনও রাজনৈতিক দল কখনও ছায়া ফেলেনি। আগামী দিনেও ফেলবে না, এটাই আমার আশা।” প্রিয়া, ভিভান কিন্তু জানিয়েছেন, বদল এলে তার প্রভাব টলিউডে পড়বে। উভয়ের কথায়, “এর আগে বামদল ক্ষমতায় ছিল। তখন টলিউড একরকম ছিল। তারও আগে ছিল কংগ্রেস। তখনও পরিস্থিতি বা আবহাওয়া অন্য ছিল। তৃণমূল কংগ্রেস আসার পর সব বদলেছে। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলে আবার বদলে যাবে টলিউড।”