Advertisement
E-Paper

কমার্শিয়াল নয়, ‘মাটি’তে প্রয়োজন ছিল ভাল অভিনেতার, বললেন দুই পরিচালক

রাত নেমেছে শহরের শরীরে। শেষ হয়েছে ‘মাটি’ ছবির প্রিমিয়ার। দু’রাত্তির চোখে ঘুম নেই দুই পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় আর শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মনে হয়েছে এ যেন সেই মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের রাত!

শেষ আপডেট: ১৩ জুলাই ২০১৮ ১৫:১৩
‘মাটি’ পোস্টারে পাওলি-আদিল।

‘মাটি’ পোস্টারে পাওলি-আদিল।

রাত নেমেছে শহরের শরীরে। শেষ হয়েছে ‘মাটি’ ছবির প্রিমিয়ার। দু’রাত্তির চোখে ঘুম নেই দুই পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় আর শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মনে হয়েছে এ যেন সেই মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের রাত! কিন্তু সেই রাতের মধ্যেই একরাশ আলো আর অশ্রু ছলকে পড়ল শহরের মাটিতে। এক জন দর্শক তো হল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে বললেন, ‘‘আমি আমার বাংলাদেশে যাইনি। কিন্তু মাটি মনে করিয়ে দিল আমার দাদুকে তো জুতোর বাক্সে নিয়ে আসা হয়েছিল। এ বার যাব!’’ আর শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে যখন দর্শক বলছেন, ‘মাটি’র মেঘলা আর জামিলের তার পর কী হল? মাটির সিক্যুয়েল হোক’, তিনি কেবল হাসছেন! দুই পরিচালকের মুখোমুখি স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রিমিয়ার দেখে বেরিয়ে মানুষ বলছে ‘মাটি’র সিকুয়্যেল হোক! আপনার ছবি তো হিট!

শৈবাল: এখন কিছুই বলা যাচ্ছে না। এটা বড়সড় পরীক্ষা! মানুষ দেখুক আগে। দর্শকই তো আসল। তবে পাওলি-আদিল দু’জনেরই ইচ্ছে, মাটির সিক্যুয়েল হোক।

লীনা: আমার কাছে এই দিনটা মাধমিক পরীক্ষার মতো কেটেছে।

আপনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব্বাইকে অভ্যর্থনা করেছেন! যে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় আজীবন আলোর পেছনে থেকেছেন, আজ মাটির আলো তাঁকে বাইরে নিয়ে এল!

লীনা: মাটি ছবি করার কথা চলছে পনেরো বছর ধরে। আমার ভেতরের জমা কথাগুলো বলার দরকার ছিল।

সব সাক্ষাৎকারেই দেখেছি প্রচার হয়েছে ‘মাটি’ আপনার জীবনের কথা। রীতিমতো ছবির ব্র্যান্ডিং হয়ে গিয়েছে এটা?

লীনা: আদিল বহু জায়গায় এই কথা বলেছেন। দেখুন, আজ যদি সত্যি কথা বলতে হয়, তা হলে বলব অনেক দেখা মিলিয়ে আমার একটা চরিত্র হয়। আমি না দেখা, না শোনা বিষয় নিয়ে গল্প বলতে পারি না। ধারাবাহিকের ক্ষেত্রেও আমার চারপাশের মানুষ এসে কথা বলে। লেখক হিসেবে মনে হয় লেখনের একটা আধার থাকে। সেই দিক থেকে ‘মাটি’ কিছুটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। তবে পুরো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে তো আর সিনেমা লেখা যায় না। আর প্রেক্ষাপট তো দেশভাগ। যার ফলে ছিন্নমূল পরিবারের দুর্দশার কথা বলেছে ‘মাটি’।

আরও পড়ুন, মুভি রিভিউ: পরতে পরতে ‘মাটি’র সোঁদা গন্ধ

(শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় চুপ। জরুরি মেল আর হোয়াটসঅ্যাপ দেখছেন!)

শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় এত অন্তরালে থাকতে পছন্দ করেন কেন?

দেখুন, এত কাজ করতে হয় সারা দিন যে আলাদা করে কোথাও যাওয়া, পার্টি করা এ সবের সময় হয় না।

লীনা: এখন কিন্তু শৈবাল নিজস্ব ক্ষেত্রে অনেক সাংগঠনিক দায়িত্ব নিয়েছে। এখন আর ততটাও অন্তরালে নেই! আসলে শৈবাল কথা বলতে ভালবাসে না!

‘মাটি’র পোস্টারে শহর মুড়ে গিয়েছে। এমনকি, গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে গিয়ে ‘মাটি’র প্রমোশন হয়েছে। ‘মাটি’ও আর অন্তরালে নেই!

শৈবাল: হ্যাঁ, খুব বড় ভাবেই প্রমোশন হয়েছে, সচরাচর বাংলা ছবিতে এই ধরনের প্রমোশন হয় না! আর সেটার প্রয়োজন ছিল!


‘মাটি’র একটি দৃশ্যে অপরাজিতা আঢ্য।

কেন?

শৈবাল: এই ছবিটায় বিশাল কোনও কমার্শিয়াল স্টার নেই। আছেন নামজাদা অভিনেতা। পাওলি-আদিল দু’জনেই অভিনেতা হিসেবে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন এবং আরও একটা কথা বলি, আদিল সারা ছবি জুড়ে এত বড় লিড রোলে বাংলা ছবিতে, এটা আগে হয়নি। এটাও এ ছবির বড় দিক। মাটির গল্পের ধাঁচটাই এমন যা কমার্শিয়াল, স্টার অভিনেতা নিলে হত না!

লীনা: আমার কাছে স্টারের সংজ্ঞাটা আলাদা। মাটির জন্য কমার্শিয়াল স্টাররা কাজ করবে কখনও মনে হয়নি। আমার প্রয়োজন ছিল ভাল অভিনেতাদের। আর সে দিক থেকে দেখতে গেলে পাওলির নিজস্ব একটা স্টারডম আছে। আদিলের স্টারডমটা অন্য জায়গায়। আদিল তো নায়ক সুলভ দেখতে নয়, কিন্তু ওর অভিনয় সব কিছুকে ছাপিয়ে চলে যায়।

শৈবাল: এখানে আমি একটা কথা বলি। আদিল নায়ক সুলভ নয় মানে? আদিলের চেহারা, ক্যামেরায় প্রেজেন্স দুর্দান্ত।

লীনা: আরে, আমি বলতে চাইছি টিপিক্যাল হিরো তো নয়। তবে আমাদের ছবিতে স্টারের ঘাটতি আদিল-পাওলি অভিনয় দিয়ে মেক আপ করে দিয়েছে।

লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের সূত্র আছে, কিন্তু শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়, আপনার মাটির টান কেমন করে জন্মালো?

শৈবাল: আমায় গল্পটা টেনেছিল। এটা করতে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে মিশতে বুঝলাম ওঁদের যন্ত্রণা কোথায়? আর ‘মাটি’ করতে গিয়ে আমিও বুঝলাম, এই যে মাইগ্রেশন শুধু দেশ থেকে দেশে হয় না! আমি হাওড়ায় থাকতাম, সেখান থেকে কলকাতা এলাম। হাওড়ার পুরনো বাড়ি, পাড়ার আড্ডার কাছে এখন বার বার যেতে ইচ্ছে করে। মাটি তাই শুধু দেশের নয়, ফেলে আসা সময়ের নস্ট্যালজিয়াকে নাড়া দিয়ে যায়।

আরও পড়ুন, প্রসেনজিৎ- জিৎ- দেবেই কেন আটকে টলিউড? প্রিয়াংশু বললেন...

‘মাটি’র সেটে আপনারা ঝগড়া করেছেন?

কিছু ক্ষণ চুপ সব!

লীনা: (শৈবালের দিকে তাকিয়ে) ফোনটা রাখো। তোমাকে তো প্রশ্ন করছেন!

শৈবাল: তুমি বল না!

লীনা: আমি খুব ঝগড়া করেছি। আমি রিয়্যাক্ট করেছি। ঝামেলা কিন্তু দৃশ্যায়ন নিয়ে হয়নি। আমাদের কাজ নিয়ে দু’জনের অসম্ভব ট্রাস্ট। কিন্তু লোকেশন বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে।

আমি তো দেখছি শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি প্রশ্ন করতে হবে। জবাব তখনই আসবে! মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সনের সঙ্গে কাজ করা কি সহজ?

শৈবাল: যখন মাটি আরম্ভ হয়েছে তখন মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন ছিল না! বাপ রে! তা হলে আরও ভয় পেতাম! (হাসি)

লীনা: এখানে আমার বলার আছে! মহিলা কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শৈবালের সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমি সারা দিন লিখে যাচ্ছি, সেই মাঝরাত অবধি। সেখানে তিন থেকে চার ঘণ্টা কমিশনে গেলেই শৈবাল বলবে, তুমি কমিশনে ব্যস্ত! আরে! প্রত্যেক মানুষের তো একটা সোশ্যাল কমিটমেন্ট থাকে! আমার মনে হয়, শৈবাল হয়তো ভাবে এতে কোম্পানির ক্ষতি হচ্ছে!

শৈবাল: শুধু আমার নয়, এই বাড়ির সকলের মনে হয়। এত কাজের পর আবার এত বড় দায়িত্ব! একটু তো নিজের সময় রাখতে পারত। নাটক দেখতে ভালবাসে, গান শুনতে ভালবাসে। সামনে কেউ বলতে পারে না। ভয় পায়।


সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে লীনা এবং শৈবাল।

লীনা: নাহ্, আমার এতেই আনন্দ!

শৈবাল: আমার একটা কথা বলার আছে। ওই যে মতবিরোধের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, হঠাৎ করে দেখতাম গল্প পাল্টে দিচ্ছে! আরে, শিল্পীরা আমায় বলছে আগে একটা স্ক্রিপ্ট দিল, আবার ফ্লোরে বদল!

লীনা: (সঙ্গে সঙ্গে উত্তর) এটা শিল্পীদের লিমিটেশন। ক্রিয়েটিভ কাজ থামানো বা ব্লক করা যায় না। আমি ভাবতে ভাবতে একটা থেকে আর এক জায়গায় শিফট করছি, সেটা সিনেমার ভালর জন্যই তো! শিল্পীদেরও সেই মানসিকতা থাকতে হবে। এটাই তো চ্যালেঞ্জ!

শৈবাল: আরও একটা বিষয় ছিল। বাংলাদেশে কোথাও শুট করছি। শুট হয়ে গেল, পরের জায়গায় গিয়ে কত ক্ষণে শুট শুরু করব ভাবছি। দেখতাম, লীনা ওঁদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ। কথা বলেই যাচ্ছে!

লীনা: আরে, এ রকম হয় নাকি! যেই শুট শেষ হল অমনি চলে আসবো! আমি তোমার মতো স্বার্থপর নই!

শৈবাল: হ্যাঁ, শুটের সময় আমি স্বার্থপর!

কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে কথা আছে আপনাদের প্রোডাকশন হাউজ খুব তাড়াতাড়ি কাজ তুলতে পারে। মেগা করেও শনি-রবি ছুটি দেয়!

শৈবাল: সিরিয়ালে আমাদের বাঙালি দর্শক যা দেখতে চান তাতে ভিজুয়াল গিমিকের জায়গা নেই। সোজা গল্প বলাই আসল উদ্দেশ্য। আমার টিম খুব এফিশিয়েন্ট। ফ্লোরে গিয়ে সময় নষ্ট করি না আমরা, এক্সপেরিমেন্ট করি না তখন।

লীনা: না, ভিজ্যুয়াল গিমিকের জায়গা নেই বলে আমি মনে করি না! আমাদের ধারাবাহিক অভিনয়-নির্ভর। অ্যাকশন বেস ধারাবাহিক হলে পাঁচটা লোকেশন দিতে হত। সেই চাপটা নেই এখানে। আমাদের ধারাবাহিকে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা অভিনেতা হিসেবে খুব পাওয়ারফুল। আর অবশ্যই আমাদের টিম খুব দ্রুত কাজ করতে পারে।

আরও পড়ুন, ইন্ডাস্ট্রিতে রাজনীতি নয়, কূটনীতি চলে: কমলেশ্বর

দু’জনের ড্রিম প্রজেক্ট আছে নিশ্চয়!

লীনা: শৈবাল বলুক সত্যি কিছু আছে কি না দেখি! (হাসি)

শৈবাল: আছে। সেটা ইংরেজি-বাংলা দু’টোতেই হবে। তবে মাটির সাফল্যের ওপরে আরও ছবি করার সিদ্ধান্ত কাজ করছে।

লীনা: একশো বার। এই বার শৈবালের সঙ্গে আমি একমত। নিজেদের প্রোডাকশনের ছবি। লস হলে ছবি করেই যাব এমন নয়। আর ভাল ছবি হলেই যে তা দারুণ চলবে, আজ বলতে পারছি না। তবে পরের ছবির গল্প রেডি। আর ড্রিম প্রজেক্ট তো আছেই। প্রজেক্টটা কোথাও বলিনি। করতে পারলে মনে হবে কিছু করে গেলাম!

একটু বলুন না!

শৈবাল: আমিও জানি!

লীনা: রবীন্দ্রনাথ নিয়ে। আমি যে ভাবে রবিঠাকুর পড়ি সেটার একটা ইন্টারপ্রিটেশন হবে।

ফেসবুকে ইতিমধ্যেই মাটি নিয়ে লেখা শুরু হয়ে গিয়েছে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে স্বপ্নময় চক্রবর্তী, সকলের মনেই ‘মাটি’। কিন্তু লীনা আর শৈবাল ওই আলো, প্রশংসা, মানুষের উচ্ছ্বাস থেকে বেরিয়ে রাতের শহরে পা বাড়ালেন! ম্যুর অ্যাভিনিউয়ের দিকে। ম্যাজিক মোমেন্টস-এর অফিস?

নাহ, ওটাই ওঁদের বাড়ি!

Tollywood Bengali Movie celebrities celebrity interview
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy