বাংলায় দেড় দশক পরে পালাবদল। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র জগতের কোন তারকার মতামত কোন পক্ষে, সেই দিকে নজর মানুষের। বাংলার সঙ্গীতজগতে সেই শিল্পীরাই বা কী বলছেন, যাঁদের হাত থেকে পর পর অনুষ্ঠান হাতছাড়া হয়েছে? কারও অভিযোগ ছিল, তিনি স্বজনপোষণের শিকার। কেউ আবার প্রতিবাদ করে হারিয়েছেন একাধিক কাজ। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে তাঁদের কী প্রত্যাশা?
আরজি করের নির্যাতিতার জন্য পথে নেমেছিলেন গায়িকা লগ্নজিতা চক্রবর্তী। প্রকাশ্যে ঘটনার নিন্দা করেছিলেন। তা ছাড়াও নিজের রাজনৈতিক মতামত বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট বলেছেন। শোনা যায়, আরজি করের গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদ করায় তাঁর হাতছাড়া হয়েছিল একাধিক কাজ। ডাক পাচ্ছিলেন না সরকারি অনুষ্ঠানেও। এ বার কি তিনি স্বস্তিতে? লগ্নজিতার স্পষ্ট বক্তব্য, “এক জন শিল্পীর কাছে তাঁর সর্ববৃহৎ পরিচয়, তাঁর শিল্প। আমার ক্ষেত্রে সেটা আমার গান। আমি চাই, এই সরকারের আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হোক এবং শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত হোক।”
লগ্নজিতা জানান, সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তাঁকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এ বার তাঁর আশা, আরজি করের মতো মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর কখনও না ঘটে। এমন ঘটনার প্রতিবাদ করলেও যেন আর হয়রানির শিকার না হতে হয়। গায়িকার কথায়, “আরজি করের ঘটনার পরে সাংবাদিক বৈঠক করে আমার অনুষ্ঠান এবং আমাকে বাতিল করা হয়েছিল দীর্ঘ দু’বছরের জন্য। সেই নিষেধাজ্ঞা আজ পর্যন্ত রয়েছে। এ শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, স্পষ্টতই প্রতিহিংসামূলক ছিল।”
তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে কিছুটা ইতিবাচক ভাবতে চাইছেন লগ্নজিতা। তাঁর কথায়, “এই সরকারের আমলে শিল্পীরা আর কোনও ভাবেই প্রতিহিংসার শিকার হবেন না এবং স্বাধীন ভাবে তাঁদের শিল্পচর্চা করতে পারবেন, এই আশা করি।”
বছরের পর বছর ধরে সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পাননি। জানান গায়িকা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই ৪ মে ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তিনি। “ফলাফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। এ বার যেন যোগ্যতা অনুযায়ী সকলে কাজ পায়”, বলেন ঋদ্ধি।
করোনা অতিমারীর সময়ে বিজেপির ‘কালচারাল সেল’-এ যোগ দিয়েছিলেন ঋদ্ধি। কিন্তু সেখান থেকেও বেরিয়ে এসেছিলেন। তবে গায়িকা জানান, তিনি তার আগে থেকেই সরকারি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার ডাক পাননি। তাঁর কথায়, “গত ১২-১৩ বছর ধরে আমি ডাক পাই না। মুখ্যমন্ত্রী তো সকলের, কোনও নির্দিষ্ট দলের নয়। সেখানে যদি স্বজনপোষণ হয় এবং নির্দিষ্ট ‘লবি’র কাছে সব ক্ষমতা চলে যায়, তা হলে তো সমস্যার। আমাদের মতো শিল্পীদের ধরে ধরে বাদ দেওয়া হয়েছিল।”
যোগ্যতা অনুযায়ী কেউ কাজ পাননি। অভিযোগ ঋদ্ধির। গায়িকার প্রশ্ন, “কেন রং, দল, এগুলি দেখে কাজ দেওয়া হবে? যোগ্যতাই তো মাপকাঠি। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও চাটুকারদের রবীন্দ্রসদনে গাইতে দেখেছি। অথচ, আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। ২৭ বছর ধরে আমি সঙ্গীতজগতে। সারা বিশ্ব জুড়ে আমার ছাত্রছাত্রী। এটা কি আমার প্রাপ্য?”
রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসা নিয়ে আশাবাদী ঋদ্ধি। নিজেকে এই দলেরই এক জন বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, “একটা সুস্থ সমাজ, সংস্কৃতি যেন বজায় থাকে। আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। আমাদের রুজিরুটি তো এটাই। দেশ-বিদেশে গানের কাজ না থাকলে হয়তো আত্মহত্যা করতে হত। আমার মতো অনেকেই এমন আছেন, যাঁদের কাঁধে সংসারের দায়িত্ব রয়েছে। আমি সমাজমাধ্যমে বলতে পারিনি, চাটুকারিতা করতে পারিনি। পাল্টিও খেতে পারিনি। যাঁরা জিতে নির্দিষ্ট আসনে বসবেন, তাঁরাও যেন সঠিক কাজটাই করেন। তৃণমূলের জমানার মতো বলব না, আগে যাঁরা কাজ পেয়েছেন তাঁরা যেন আর কাজ না পান। কিন্তু এটুকু চাই, সকলে যেন সমান ভাবে কাজ পায় এ বার থেকে।”
আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদ করে টানা তিন মাস কাজহারা ছিলেন সিধু তথা ব্যান্ড ক্যাকটাসও। প্রভাব পড়েছিল কাজের জগতে। তবে ২০২৫-এ অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। কিন্তু সঙ্গীতজগতের বেশ কিছু খামতি নিয়ে তিনিও কথা বলেছেন। সিধু প্রথমেই বলেন, “একটা পরিবর্তনের দরকার ছিল। শিল্পী হিসাবে নয়, সেটা এক জন নাগরিক হিসাবে মনে হয়েছে। ১৫ বছর একটি দলকে দেখলাম। খুব যে মুগ্ধ হয়েছি তা নয়, বরং নালিশ জমেছে। যারা এসেছে তাদের বিরাট সমর্থক, তা নয়। কিন্তু তাও আশা রয়েছে।”
আরও পড়ুন:
বাংলা সঙ্গীত জগকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি গত কয়েক বছরে। বিশেষ করে ছবির বাইরের গান থেকে গিয়েছে পিছনের সারিতে। মনে করেন সিধু। তাই তাঁর প্রত্যাশা, “শিল্প ও সংস্কৃতির দিকটি আরও একটু সংগঠিত হোক এবং রাজনীতি মুক্ত হোক। রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ হলেই কোনও শিল্পী উঁচু মানের হয়ে গেলেন, আর যাঁরা সেটা করলেন না, তাঁরা নিম্নশ্রেণির হয়ে থেকে গেলেন— এটা যেন না হয়।”
আশায় বুক বেঁধেছেন শিল্পীরা। স্বজনপোষণ ছাড়া কাজের পথ মসৃণ হবে এবং স্বাধীন ভাবে মতামত প্রকাশ করা যাবে, এই প্রত্যাশা প্রত্যেকের।