পরিচালক: অনিকেত চট্টোপাধ্যায়।

অভিনয়ে: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীলা মজুমদার, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, কাঞ্চন মল্লিক, অঞ্জন দত্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়

বেশ  কয়েক বছর আগের কলকাতা। বিবর্ণ পাড়া, বেরং বাড়ি, নোংরা সরু গলি। রঙের সমাহার নেই, নেই ঝলমলে আলোর রোশনাই। রয়েছে শুধু হৃদয়ের টান। এই পাড়ায় কেউ বিপদে পড়লে বুক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শঙ্কর, নারান, কালীরা। পাড়ার মুদির দোকান চালান শঙ্কর। তাঁর দোকানের নাম অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার। তার পাশেই ফ্যান্সি টেলার্স, একটু দূরে নমিতার টেলারিং-এর দোকান। আছেন কালী, নারান, বিশু। টুকটাক কাজের সঙ্গে সঙ্গে এঁরা গুলতানি মারেন সারাদিন।

রাতবিরেতে এঁরাই আবার ছুটে যান অসুস্থ বৃদ্ধকে হাসপাতালে ভর্তি করতে, বাড়ির লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে বিষ খেয়ে ফেলা মেয়ের কাছে বাড়ির লোকের আগে পৌঁছে যান, দোকানে ভিজে ভিজে আসা খরিদ্দারকে ছাতা মাথায় এগিয়ে দেন শঙ্কর মুদি, রোজ অফিসফেরত মাতালকে সঙ্গে করে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ক্রেডিট কার্ড কী জিনিস জানেন না শঙ্কর মুদি। তাঁর মুদির খাতা আছে, সেটা তাঁর ক্রেডিটের খাতা। পাড়ার সবার নাম আছে তাতে। সেখানেই ধারের হিসেব লেখেন তিনি। টুকরো টুকরো আন্তরিক ছবিতে উঠে আসে আমাদের বহু চেনা কলকাতা, আগের কলকাতা। যেখানে পয়সার চাকচিক্য নেই বটে, কিন্তু মানুষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়।

একসময় ছবিটা বদলাতে শুরু করে। জমি নিয়ে বোমাবাজি হয় পাড়াতে। পাড়ার পাশের মাঠে ঝকঝকে শপিং মল তৈরি হয়। যে ভবেনদা দোকান বন্ধ করে সবাইকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মিছিলে যেতে বলেন সেই ভবেনদাই শপিং মলের দালালি শুরু করেন। বড় পুঁজি গ্রাস করে নেয় ছোট পুঁজিকে। গ্লোবালাইজেশনের ধাক্কা এসে লাগে পাড়ার নড়বড়ে দরজায়। হঠাৎ পাল্টে যেতে থাকে সব কিছু।

আরও পড়ুন: প্রতিদিনের বন্ধু ‘শঙ্কর মুদি’কে চেনেন? 

চেনা পাড়া অচেনা লাগে নারানের, শঙ্করের। শপিং মলে ভিড় বাড়ে। পুরনো মুদির দোকান, টেলারিং শপ, সেলুনের আর কোনও কদর থাকে না। তছনছ হয়ে যায় পাড়া। শুধু কিছু বৃদ্ধ বয়স্ক মানুষ পুরনো মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন শঙ্কররা। অসম লড়াই লড়ার চেষ্টা করেন শেষ বারের মতো। তা-ও ভাঙতে থাকে, ভাঙতেই থাকে সব কিছু। পাড়ার সব আলো নিভে যায়, শুধু আলোকিত হতে থাকে শপিং মল। শেষ পর্যন্ত এক দিন যে মাস্টারমশাই তথাকথিত উন্নয়নের বিষময় ফলের কথা বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে শঙ্করের দেখা হয়ে যায় শপিং মলে।

আরও পড়ুন: মুভি রিভিউ ‘মুখার্জীদার বউ’: এ ছবি শেখাল, বন্ধুত্বই পারে সব বিবাদ মেটাতে​

শঙ্কর মুদি শুধুমাত্রই একটা পাড়ায় শপিং মল তৈরির গল্প নয়। এই সিনেমা সামগ্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের গল্প শোনায়, সমাজ পাল্টে যাওয়ার গল্প শোনায়, ভেঙে যাওয়া সময়ের গল্প শোনায়। কী ভাবে আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা মানুষের নৈতিক চরিত্র দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে দেয় সেই কথা বলেন শঙ্কর মুদি। সে জন্যই শেষ দৃশ্যে নিতান্ত আটপৌরে নমিতা সংসার বাঁচাতে ভবেনদার কাছে ধরা দেয়। দু’দিন আগেও পাড়ার যে মেয়েটার ডাকে তার অসুস্থ বাবাকে বাঁচাতে ছুটে আসত লোকজন, আজ সে জানলা খুলে সাহায্যের জন্য হাহাকার করে। এগিয়ে আসে না কেউ। আগের সেই পাড়াটাই যে মরে গিয়েছে, সেই মানবিকতা মরে গিয়েছে। উন্নয়নের ঝড়ে হারিয়ে যায় নিম্নবিত্তরা, শুধু টিকে যায় আমাদের মধ্যবিত্ত সমঝোতা। যারা সব দেখে শুনে, সব বুঝেও চুপ করে থাকে।

পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় একটা সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান-পতনকে ধরতে চেয়েছেন তাঁর সিনেমায়। রাজনীতি শুধুই সুবিধাভোগের যন্ত্র এখানে। যাঁরা মাথা তুলতে যান তাঁদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ এর মধ্যে না থাকতে চায়, না পড়তে চায়। এই জন্যই ‘কমরেড’ শুনে ছিটকে যান শঙ্কর মুদি। এই সব মানুষদেরকে, তাঁদের চারপাশে ঘটে চলা রাজনীতির খেলাকে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। কিছু সূক্ষ্ণ স্যাটায়ারের ব্যবহার থাকলেও ছবির মুডের সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্যই কোনও কমিক রিলিফ নেই সিনেমাতে। মাঝে মাঝে ছবির গতি একটু শ্লথ হয়ে যায়। গানগুলি ছোট হলেও কয়েকটা গান কম থাকলে ক্ষতি হত না। সদ্য প্রয়াত প্রতীক চৌধুরীর গলা শুনতে ভাল লাগে। কবীর সুমনের সঙ্গীত পরিচালনায় গানগুলি সুখশ্রাব্য।

প্রধান চরিত্রে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় যথারীতি অসাধারণ অভিনয় করেছেন। শঙ্কর মুদির আনন্দ, দুঃখ, বেদনা, তাঁর লড়াই, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া— কৌশিকের প্রতিটি অভিব্যক্তিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই চরিত্রে সত্যিই তাঁর কোনও বিকল্প ছিল না। কৌশিকের স্ত্রীর চরিত্রে শ্রীলা মজুমদার যোগ্য সঙ্গত করেছেন। যদিও তাঁকে হয়তো আর একটু ব্যবহার করা যেত। কালীর চরিত্রে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় বেশ ভাল। কৌশিকের চাপা অভিনয়ের পাশে কালীর সোচ্চার রাগ, ক্ষোভ, বিদ্রোহ সবটাই দরকার ছিল। বহুরূপীর ভূমিকায় রুদ্রনীলকে দেখতে খারাপ লাগে না। মাস্টারমশাইয়ের ভূমিকায় অঞ্জন দত্ত যথাযথ।

হল থেকে বেরিয়েই এই সিনেমা ভোলা যায় না। শঙ্কর মুদি ভাবায়, এই সিনেমার রেশ থেকে যায় মননে। একটা প্রজন্ম, যাঁরা পাড়াগুলি নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছেন তাঁরা প্রত্যেকে শঙ্কর মুদিদের চিনতেন। এখনও পাড়ার ছোট্ট দোকানঘরে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ছেন শঙ্কর মুদিরা। এই সব মানুষের কথা বলে এই সিনেমা। ‘শঙ্কর মুদি’র সাফল্য এখানেই।