জিতে নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলাম। আমার হাওড়া আমায় জিতিয়ে ফেরাল। পদ্মফুল, ফুলের মালায় প্রায় ঢাকা পড়ে যাওয়ার দশা। মানুষ উৎসব করছেন!
ঘড়িতে রাত ১২টা অনেক ক্ষণ পার। বাড়িতে ফিরেছি। পরিচ্ছন্ন হয়ে খেতে বসব। অনেক বছর পরে এই ব্যস্ততা। কাউন্টিংয়ের আগে থেকে সেই ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। বিশ্রাম নিতে পারিনি, সময়ও পাইনি। পরিস্থিতি বলছে, বিশ্রাম নেওয়ার সময় এটা নয়। আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রশ্ন, আগাম আভাস পেয়েছিলাম? বরাবর যে কোনও কিছুর তৃণমূলস্তরে পৌঁছে যাই। মানুষের সঙ্গে গভীরে মিশি। তাই কিছুটা বুঝতে তো পেরেছিলাম। এবং আমার চেনা মাটি। প্রতি মুহূর্তে নাগরিকজীবন কতটা তেতো, কতটা বিরক্ত— উপলব্ধি করেছিলাম। তাঁদের জন্য কোনও পরিষেবা নেই। যাঁরা চেয়েছেন, তাঁরা বদলে হুমকি শুনেছেন। খারাপ ব্যবহার পেয়েছেন। দিনের পর দিন এই আচরণ পেতে পেতে মানুষ আমায় ভোট দিয়েছেন। শুধু আমি একা নই, বাংলা জুড়ে এই ছবি।
পদ্ম ফোটালেন রুদ্রনীল ঘোষ। ছবি: ফেসবুক।
এরই ফাঁকে শুনলাম, আমার বন্ধু রাজ চক্রবর্তী অপমানিত। ওর গায়ে কাদা, গোবরজল ছোড়া হয়েছে। পেশাদুনিয়ায় আমাদের যাত্রা শুরু একসঙ্গে। তার পরেও বলব, প্রত্যেকেই তার জীবন কী ভাবে কাটাবে, সেটা নিজেই ঠিক করে। আমার উপলব্ধি, রাজ এতটাই গুণী যে, ওর কোনও প্রয়োজন ছিল না, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দুরবস্থার জন্য যে দলকে দুষছেন, তার সঙ্গে নিজেকে জড়ানো। রাজ এত কিছু বোঝে, এটা বুঝতে পারল না! আজকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের যে রায়, তা তাঁরা যথেষ্ট ঠান্ডা মাথাতেই নিয়েছেন। বাড়তি উচ্ছ্বাস ছাড়াই। তাই রাজের উপরে দেখানো রাগ, ওর সমর্থিত দলের প্রতি অসহিষ্ণুতা। রাজ চক্রবর্তীর উপরে কিন্তু নয়। রাজ চক্রবর্তীর পছন্দের উপরে। বন্ধু হলেও কারও ব্যক্তিগত পছন্দ অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে না।
আবার এটাও বলব, রাজ একের পর এক ছবি করে গিয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দল করি বলে, কোনও একটি নির্দেশ মেনে ও আমাকে সেই ছবি বা সিরিজ়ে নিতে পারেনি। এটাও তো ঘটনা। এই প্রেক্ষিতে আপনারা জিজ্ঞাসা করতেই পারেন, আগামী দিনে আমি কি রাজের ছবি বা সিরিজ়ে কাজ করব? আগেও বলেছি, আবার বলছি, আমি কোনও মানুষকে তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে বিচার করি না। একা রাজ নয়, সবাই খোলা মনে কাজ করুন টলিউডে, নিজের দলের কাছে বারবার এই অনুরোধ জানিয়ে এসেছি। আর এটা শুধু টলিউড নয়, যে কোনও কর্মক্ষেত্রেই এই পরিবেশ চাই।
আপনারা দেখেছেন, চাকরি চেয়ে রাস্তায় বসতে হয়েছে এই প্রজন্মকে। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে মারধরও খেয়েছেন। কখনও পুলিশ পিটিয়েছে, কখনও শাসকদলের গুন্ডারা। কিংবা আরজি কর-কাণ্ড। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ একের পর এক যন্ত্রণার সাক্ষী। বিনোদনদুনিয়ার যে বন্ধুরা আজ খ্যাতনামী, তাঁদের খ্যাতির নেপথ্যে জনগণ। আমার সেই সব বন্ধুর সহ্যশক্তি দেখে অবাক হয়েছি। ভেবেছি, দর্শক বা সাধারণ মানুষের এত যন্ত্রণা কী করে অগ্রাহ্য করছেন? যে বা যারা এত দুঃখ-যন্ত্রণার কারণ, ওঁরা কেন তাদের পক্ষ নেবেন? কেনই বা তারা থেকে যাক, এরকম চাইবেন? সেই জায়গা থেকেই রাজের সঙ্গে এই আচরণ।
ফলপ্রকাশের আগে দলীয় সদস্যদের সঙ্গে। ছবি: ফেসবুক।
আমি অভিনেতা থেকে নেতা। ইতিমধ্যেই টলিউডের আগামী দিনের ছবি কেমন হবে, তা-ই নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু হয়েছে। একটাই কথা বলব, যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ পাবেন সবাই। অভিনেতা থেকে সাংবাদিক— কারও উপরে কোনও ভাবেই আর খবরদারি ফলানো হবে না। কে অভিনয় করতে পারবেন আর কে পারবেন না, সাংবাদিক কতটুকু লিখতে পারবেন— এটাও তো এত দিন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হত। রইল বাকি ‘ব্যান’ সংস্কৃতি। সে সবও আর থাকবে না। অনেকে জানতে চেয়েছেন, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ঋদ্ধি সেন-সহ যাঁরা এত দিন ‘নিষিদ্ধ’ ছিলেন, তাঁরা ফিরবেন? দেখুন, কোন দলের প্রতিনিধির আঙুলের ইশারায় এই কাজগুলো হত, সকলেই জানেন। সেই দলই যদি না থাকে, তা হলে এই সব বাধাও থাকবে না। তার পরেও একটা কথা বলব, আমাকেও কিন্তু ‘ব্যান’ করা হয়েছিল। হয়তো গায়ে ‘ব্যান’ তকমা দেওয়া হয়নি। তখন তো কেউ আমার সমর্থনে টুঁ শব্দ করেননি! আমার পাশে এসেও দাঁড়াননি! তবে আমি তার প্রতিশোধ নেব না। মন থেকে চাইছি, সবাই কাজ পান।
আরও একটি বিষয় না বললেই নয়, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতদন্ত এবার এগোবে। জানেন, এমন অনেকে ওঁর মৃত্যুর প্রতিবাদ-মিছিলে পথে নেমেছিলেন, যাঁদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে রাহুলের মৃত্যুর জন্য দায়ী। দেখে খুব খারাপ লেগেছিল। এক মাস হয়ে গেল রাহুলের মৃত্যু হয়েছে। কাউকে গ্রেফতার হতে দেখেছেন? সব অন্যায়ের বিচার হবে ধীরেসুস্থে।