৬/৮৮ বিজয়গড় রোডের অনন্যা অ্যাপার্টমেন্ট। তিনতলা আবাসন। সবচেয়ে উপরের তলায় মায়ের সঙ্গে থাকতেন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার, অনন্যা আবাসনের সেই তিন তলার ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে গোটা পাড়া। কারণ, পাড়ার প্রিয় বাবিন আর নেই। লোকালয়ে সবার কাছে এই নামেই তিনিই পরিচিত।
সন্ধ্যেবেলা যখন প্রথমে খবরটা আসে, তখনও বাড়ির বাইরেটা সুনসান। কারণ, এই খবর আদৌ সত্যি কিনা, তা বুঝতে পারছিলেন না অধিকাংশেই। রাত বাড়তেই ভিড় বাড়তে থাকে। তত ক্ষণে সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন খবরটা সত্যি।
বিজয়গড়ের মোড়ে থিকথিক করছে ভিড়। একে একে দেখা যাচ্ছে টলিপাড়ার চেনা মুখেদের। সবার প্রথমে আসেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী। তখন প্রায় রাত ৯টা। তার পর দেবলীনা দত্ত, সৌম্য মুখোপাধ্যায় এলেন। খানিক বাদে দেখা গেল রাহুলের শুরুর জীবনের সঙ্গী ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির সহকারী পরিচালক অমিত দাসকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ছিলেন উপরে।
নীচে নেমে তিনি বলেন, “ওর সঙ্গে কত স্মৃতি। ১০ দিন আগে নধরের ভেলা দেখতে বাইক চালিয়ে এল। আগে ওর বড্ড ভয় ছিল বাইকে। সেটা আর নেই। উপরে গিয়ে বিছানার উপরে ওর ছাড়া জামাকাপড় দেখে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা ওর আবেগকে কন্ট্রোল করতে পারবে, কিন্তু ছেলেটা! ও নিশ্চয়ই বাবাকে খুঁজছে।”
রাহুলের আবাসনের নীচে ভিড় জমিয়েছেন প্রতিবেশীরা। নিজস্ব চিত্র।
দুঃসংবাদ পেয়েই শাশুড়িমায়ের কাছে ছুটেছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। কিছু ক্ষণ থেকে চলে যান ছেলে সহজের কাছে। সকলের থম থমে মুখ। সময়ের সঙ্গে ভিড় আরও বেড়েছে। এরই মধ্যে রটে গিয়েছে প্রিয়াঙ্কা আবার আসছেন। সঙ্গে ছেলে সহজ থাকবে কিনা সন্দেহ ছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১১:১৫। নীল গাড়ি নিয়ে ঢুকলেন প্রিয়াঙ্কা। এর মাঝে তিনতলা থেকে নামলেন অরূপ বিশ্বাস। রাহুলের স্ত্রীকে নিচ থেকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
শুধু স্টুডিয়োপাড়ায় নয়, বিজয়গড়ের পাড়ায়েও রাহুলকে সবাই ভালবাসতেন। কিছু দিন আগে পাড়ার ট্যুরনামেন্টে অংশগ্রহণ করেছিলেন অভিনেতা। এমন অনেক স্মৃতিই আওড়াচ্ছিলেন তাঁর প্রতিবেশীরা। রাহুলের ঘনিষ্ঠ এক প্রতিবেশী বললেন,“শ্যামলী কাকিমাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। আমার সাহস নেই ওঁর সামনে যাওয়ার। ১০ দিন আগে রাত আড়াইটে পর্যন্ত ক্রিকেট খেললাম। দেখা হলেই জড়িয়ে ধরত রাহুল। তারকাসুলভ ব্যপার ছিল না। প্রিয়াঙ্কাকে দেখলাম আজ বহুবছর পরে। ওদের বিয়ের আগে আমাদের বাড়িতেই প্রথম আইবুড়োভাত খাইয়েছিলাম। সহজকে জন্মাতে দেখলাম মানতে পারছি না যে, বাবিন নেই।”
আরও পড়ুন:
রাত বেড়েছে। ১২:৩০ নাগাদ এলেন সহিনী সরকার, শোভন গঙ্গোপাধ্যায়। তার কিছু পরেই এলেন সৌরভ দাস ও দর্শনা বণিকও। একই সঙ্গে দেখা গেল সঙ্গীতশিল্পী অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়কে। এত ভিড়ের মাঝে রাহুলের মোমোর প্রতি বিশেষ ভালবাসার কথাই মনে পড়ে গেল অনন্যা আবাসনের সামনের সেই দোকানির। বললেন, “দাদা মোমো আর রাইস খেতে ভালোবাসত, এমন যে হবে ভাবতে পারিনি।” এ দিকে, বাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশী কাকিমার প্রশ্ন, “ এত বড় তারকা একা একা নৌকো করে মাঝ সমুদ্রে চলে গেল, কোনও নিরাপত্তা নেই। মৃত্যুটা কেমন কেমন ঠেকছে।”
দুঃসংবাদ পেয়ে রাহুলের নাটকের দলের বন্ধু অভিষেক ছুটে চলে আসেন। তিনি বলেন,“কত আলুর পরোটা খেয়েছি এই ঘরে বসে, বাবিনদার বাবা ছিলেন বিজন ভট্টাচার্যের শিষ্য। রাহুলদারও অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা ছিল ছোট থেকে। সেটাই করে দেখিয়েছে। আগামিকাল আবার আসব শেষবার বাবিনদাকে দেখতে ।”
রাহুলের বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা। নিজস্ব চিত্র।
রাত গভীর হতেই ভিড় কিছুটা কমে। শিল্পীরাও একে একে রওনা দেন নিজেদের বাড়ির দিকে। রাত দেড়টা, তখনও প্রিয়াঙ্কা রাহুলের মায়ের সঙ্গে। পৌনে দুটো অভিনেতার বাড়ি থেকে বেরোলেন দেবলীনা দত্ত। তিনি বললেন, “প্রিয়াঙ্কার শক্ত থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই।” তত ক্ষণে ভিড় ফাঁকা। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে রাহুলের ঘরের টিমটিম করা নীল আলো। আপাতত সোমবার দুপুরের অপেক্ষায় বিজয়গড়। শোনা যাচ্ছে, দুপুরেই বাড়ি ফেরানো হবে অভিনেতার দেহ।