E-Paper

অভিনেত্রীর নীচে চাপা পড়েন রাহুল

এমন এক জায়গাই কেন শুটিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল? বিপদ বুঝেও কেন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত পদক্ষেপ করা হয়নি? শনিবার এই সমস্ত প্রশ্ন রেখেই পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন রাহুলের স্ত্রী।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০২
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

মেরিন ড্রাইভের রাস্তা থেকে জায়গাটি সমুদ্র সৈকতের প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে। সিমেন্টের জেটি থেকেও দূরত্ব প্রায় ৯০০ মিটার। কখন জল বাড়বে, কখন চকিতে জলের স্রোত টেনে নিয়ে যাবে, নিশ্চিত বলতে পারেন না স্থানীয়দের কেউই। শুধু সাবধানবাণী শোনা যায়, ‘‘জলে কিন্তু ঘূর্ণি তৈরি হয়। বালি টেনে ধরে!’’ তালসারির সমুদ্র সৈকতের এমন এক অংশেই কোনও রকম নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছাড়া এক সপ্তাহ আগে শুটিং চলছিল রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত ধারাবাহিকটির। সেই রবিবারের পরের রবিবার, রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার এফআইআর দায়ের করার পরের দিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে বোঝা গেল, এখানে একটু অসাবধান হলেই বিপদ। যা কিছু ঘটে যেতেপারে মুহূর্তে!

এমন এক জায়গাই কেন শুটিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল? বিপদ বুঝেও কেন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত পদক্ষেপ করা হয়নি? শনিবার এই সমস্ত প্রশ্ন রেখেই পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন রাহুলের স্ত্রী। প্রিয়াঙ্কা প্রথমে কলকাতার রিজেন্ট পার্ক থানায় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার আর্টিস্টস ফোরাম’-এর সদস্যদের সঙ্গে গিয়ে অভিযোগ জানান। কলকাতা পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৬১(২) (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র), ১০৬ (১) (গাফিলতির কারণে মৃত্যু) এবং ২৪০ (মিথ্যা তথ্য প্রদান) ধারায় জিরো এফআইআর রুজু করে। রাতেই অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ‍্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তদের সঙ্গে ওড়িশায় তালসারি মেরিন থানায় পৌঁছন প্রিয়াঙ্কা। সেখানে সরাসরি তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয়। বাকি ধারা অপরিবর্তিত থাকলেও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারার পরিবর্তে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৬ (১) গাফিলতির কারণে মৃত্যু ঘটানোর ধারা যুক্ত করে পুলিশ।

ওড়িশা পুলিশ সূত্রে খবর, রাহুলদের ধারাবাহিকের প্রযোজক সংস্থা 'ম্যাজিক মোমেন্টস্‌ মোশন পিকচার্স প্রাইভেট লিমিটেড’-এর কর্ণধার শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়, লীনা গঙ্গোপাধ্যায় এবং ধারাবাহিকের পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল, ফ্লোর এগ্‌জ়িকিউটিভ প্রোডিউসার শান্তনু নন্দী, প্রযোজক সংস্থার ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে। প্রিয়াঙ্কা তাঁর অভিযোগে লিখেছেন, ‘আমি জেনেছি, প্রযোজনা সংস্থা ওড়িশার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুটিং করার বৈধ অনুমতি নেয়নি এবং শুটিং স্পটে কোনও নিরাপত্তা বিধি বা প্রোটোকল মানা হয়নি। তালসারি সৈকতে শুটিং করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। শুটিং চলাকালীন স্থানীয়রা সতর্ক করে তা বন্ধ করতে বলেন, কারণ জায়গাটি উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া বিপজ্জনক এবং সেখানে চোরাবালি ও অনিয়মিত জোয়ারের ঝুঁকি থাকে। সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে শুটিং করা হয়েছে। যার ফলে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে।’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘প্রযোজনা সংস্থার তরফে রাহুলকে উদ্ধারের সঠিক সময় জানানো হয়নি। উল্টে পরস্পর বিরোধী কিছু বিবৃতি সামনে এসেছে, যা প্রমাণ করে, এই মৃত্যু মূলত প্রযোজনা সংস্থা ও তার সদস্যদের চরম অবহেলার ফল। কোনও রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা নিয়মবিধি না মেনে কাজ করার মতো অবহেলাজনিত কাজের কারণে আমার স্বামী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে।’

তালসারির যেখানে শুটিং হয়েছিল, সেটি পাড় থেকে সমুদ্রের প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে। তালসারির সিমেন্টের জেটির সিঁড়ি বেয়ে নেমে খাঁড়ি পার হয়ে ততটা যেতেও প্রায় ৯০০ মিটার পথ পেরোতে হয়। সেই শুটিংস্পট পর্যন্ত গিয়ে দেখা যায়, গোড়ালি ডোবা জল সেখানে। সমুদ্রের জল নেমে যাওয়ার আগে বালির উপর আঁকিবুকি চিহ্ন রেখে গিয়েছে। সেই জায়গা থেকে পাড়ের দিকে বা জেটির উপরে থাকা দোকানিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা বেশ কঠিন। সেখান থেকে সবটাই এক আঙুল সমান উচ্চতার দেখায়। শুটিংস্পট দেখিয়ে দিতে গিয়ে তালসারির মৎসজীবী পাঁচু পাত্র বললেন, ‘‘এখানে কখন জল বাড়বে, কখন পায়ের নীচ থেকে বালি সরে গর্ত বেরিয়ে আসবে, বলা যায় না।’’ তিনি বলে চলেন, ‘‘অনেক ক্ষণ শুটিং করা তো দূর, এখানে মিনিট দশেকের জন্যও কেউ এসে দাঁড়ান না। ওই দিন যখন ঘটনা ঘটে, তখন জোয়ার আসছে। জোয়ারের জল ওই অভিনেতা আর অভিনেত্রীকে যে ঘিরে ফেলেছে, পাড়ে বা জেটিতে বসে তা বোঝা সম্ভবই নয়। জলে যখন প্রায় সব ডুবে গিয়েছে, তখন জেটিতে থাকা ভগীরথ জেনা নামে একজনের বিষয়টি নজরে পড়ে। ভগীরথ নিজের নৌকা নিয়ে কাছে এসে বুঝতে পারেন, দু'জন বিপদে পড়েছেন। কিন্তু একার পক্ষে ওই অবস্থায় নৌকা সামলানো আর জল থেকে কাউকে তোলা সহজ কথা নয়। ভগীরথ একটি দড়ি নামিয়ে দেন, সেটা ওই অভিনেত্রীকে ধরে থাকতে বলেন। নিজে এর পরে রাহুলকে বাঁচাতে ঝাঁপ দেন। এর পরে কোনওমতে দু'জনকে নিয়ে বালির ঢালে নৌকা ভেড়ান। সেখান থেকে শুটিং ইউনিটের আরও কয়েক জনকে নৌকায় তুলে নেন। তাঁরাও বিপদে ছিলেন। তাঁদের কথা কেউ সামনে আনছেন না।’’এ দিন মাছ ধরতে গিয়েছিলেন ভগীরথ। তিনি ফোনে বলেন, ‘‘অভিনেতাকে জেটিতে নিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি বেঁচে ছিলেন। বুকের উপরে চাপ দিয়ে জল বার করার চেষ্টা করছিলাম। শুটিংয়ের কয়েক জন লোক বললেন, বেশি চাপ দিও না, আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। রাতে শুনলাম, উনি মারা গিয়েছেন।’’ তাঁর আরও দাবি, ‘‘পাড়ের কেউ বুঝতেই পারেননি। এত ভিতরে শুটিং হচ্ছিল যে, ব্যাপারটা পাড়ে পৌঁছতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। জল ততক্ষণে জেটি পর্যন্ত উঠে গিয়েছে। অভিনেতাকে উদ্ধার করে আনতে কম করে হলেও আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছিল। জলের মধ্যে অনেকটা সময় রাহুল নীচের দিকে ছিলেন, অভিনেত্রী তাঁর বুকের উপরে। সেই কারণেই অভিনেত্রীর থেকে অভিনেতার অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে যায়। ৩০ মিনিটেরও বেশি ওই অবস্থায় বালির জলে থাকলে করার কিছুই থাকে না।’’ প্রশ্ন উঠছে, জল বাড়ছে দেখেও কেন শুটিং বন্ধ করা হল না? প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার বন্দোবস্ত নেই জেনেও কেন আরও আগে রাহুলকে উদ্ধারের জন্য হাঁকডাক করা হল না? তালসারির ওই অংশের মৎসজীবী, দোকানি— সকলেরই বক্তব্য, ‘‘উদ্ধার করতে করতেই আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছিল। দিঘার হাসপাতালে নিয়ে যেতে আরও সময় গড়িয়েছে।’’

ওড়িশার তালসারির এই সৈকতেই জোয়ারের সময়ে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ঘটনার এক সপ্তাহ বাদে রবিবার।

ওড়িশার তালসারির এই সৈকতেই জোয়ারের সময়ে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ঘটনার এক সপ্তাহ বাদে রবিবার। — নিজস্ব চিত্র।

ঘটনা সামনে আসার পরে প্রযোজক সংস্থার তরফে দাবি করা হয়েছিল, দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে রাহুলকে কাছের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দাবি আগেই উড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ। খোঁজ করে দেখা গেল, ঘটনাস্থলের কাছে চিকিৎসাকেন্দ্র বলতে এক মাত্র রয়েছে বাড় বড়িশা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখানকার মেডিক্যাল অফিসার সূর্যশেখর চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এখানে শুধু বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয়। ওই অভিনেতাকে এখানে আনা হয়নি।’’ তালসারি মেরিন পুলিশের অফিসার রতিকান্ত বেহেরার দাবি, "তালসারি থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে থানার পাশ দিয়ে উদয়পুর দিঘা মোড় থেকে দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অভিনেতাকে। এই পথে স্বাস্থ্যকেন্দ্র পড়ে না।" পুলিশেরই একটি সূত্রের দাবি, মেরিন ড্রাইভ রোডে জায়গায় জায়গায় বাধা রয়েছে। চার চাকার গাড়ি চলাচলের জন্য সেখানে রাস্তা বন্ধ করে রাখা আছে। তার উপর ঘটনা রবিবারে হওয়ায় পর্যটকের ভিড়ে দিঘার রাস্তায় যানজট ছিল। সন্ধ্যা প্রায় ছ'টা নাগাদ যখন অভিনেতাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে যাওয়া হচ্ছে, তখন রাস্তায় যথেষ্ট যানজট ছিল, দাবি পুলিশের। মৃতের পরিবারের তরফে অভিযোগ জমা পড়তেও সাত দিন পেরিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইন্ডাস্ট্রির একটি অংশ। প্রিয়াঙ্কা বলেছেন, ‘‘প্রযোজক সংস্থা চরম অবহেলা করেছে এবং আইনি দায় এড়াতে পরিকল্পিত ভাবে মিথ্যা বয়ান সাজিয়ে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি এবং আমার নাবালক পুত্র মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। শোকের কারণে আমি এতটাই বিধ্বস্ত ছিলাম যে, লিখিত অভিযোগ জানাতে দেরি হয়েছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rahul Arunoday Banerjee police investigation Tollywood

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy