যোগাভ্যাস করতে করতে গলার রেওয়াজ। কুম্ভকাসনা (যাকে জিম-এর ভাষায় প্ল্যাংক বলা হয়) করতে করতে সরগম-এর সাতটি স্বর গাইতে হবে। এমনই পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাচ্ছেন ইমন চক্রবর্তী। কণ্ঠের সঙ্গে যোগের কী সম্পর্ক?
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রশিক্ষণ শৈশব থেকেই নিয়েছেন ইমন। তবে ইদানীং তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সেখান থেকে কণ্ঠকে সতেজ রাখার বহু নতুন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন ইমন। যোগাসনের সময়ে গান গাওয়া নিয়ে ইমন বলেন, “শরীরে ‘কোর মাসল’ অর্থাৎ দেহের কেন্দ্রস্থলের পেশি যদি দুর্বল হয়, তা হলে তার প্রভাব গানের উপর পড়ে। পণ্ডিতেরা বলেন, নাভি থেকে শব্দের উৎপত্তি হয়। আমি এটা শুনে অবাক হতাম। এখন বুঝতে পারি, শরীরের কেন্দ্রের পেশি যত শক্তিশালী হবে, গান গাওয়া তত ভাল হবে।”
‘প্ল্যাংক’ অবস্থায় থেকে একটি স্বর কতক্ষণ ধরে রাখতে পারবে সঙ্গীতশিল্পী, তার উপর গান গাওয়া অনেকটাই নির্ভর করে। জানান ইমন। তাঁর কথায়, “গান গাওয়ার ক্ষেত্রে দম রাখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা এখন কেউ বসে গান গাই না। মঞ্চে লাফালাফি করেই গাইতে হয়। ফুসফুসের সঙ্গে ‘কোর মাসল’-এর সহযোগিতাও সেখানেও প্রয়োজন। তাই যোগাভ্যাস আমার জীবনে এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেওয়াজের সময়ে তানপুরার সঙ্গে প্রতিটি স্বর গাওয়ার অভ্যাস ছিল ইমনের। কিন্তু এতে গানের ক্ষেত্রে দম রখের রাখার দক্ষতা সেই ভাবে উন্নত হয়নি গায়িকার। তিনি বলেন, “আসলে এই রেওয়াজে সুর কতটা সঠিক ভাবে লাগছে, সেইটা পোক্ত হয়। কিন্তু দম রাখতে পারার জন্য কী প্রয়োজন, সেটা আমি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে আরও ভাল করে শিখেছি। গান গাওয়ার সময়ে মসৃণ শ্বাসপ্রশ্বাস রাখার জন্য যোগাভ্যাস, শরীরচর্চা, প্রাণায়াম করতেই হবে।”
যোগাভ্যাসের সঙ্গে রেওয়াজ। ছবি: সংগৃহীত
যোগাভ্যাস যেমন শারীরিক ভাবে উপকার করেছে, তেমনই মানসিক ভাবেও সাহায্য করেছে ইমনকে। বিয়ের পর থেকে যোগাভ্যাসে মন দেন তিনি। ইমন বলেন, “আমার পিসিওডি (পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজ়ি়জ়) রয়েছে। বিয়ের সময়ে আইবুড়ো ভাত খাওয়া ইত্যাদির জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন এক বন্ধু যোগাসনের পরামর্শ দেন। আমার উদ্বেগের সমস্যাও ছিল। খুব চিন্তা করতাম। দ্রুত রেগে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। যোগাসন শুরুর পরে সেটা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।”
আরও পড়ুন:
গান গাওয়ার জন্য আরও বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলেন ইমন। তার মধ্যে সর্বপ্রথম নিয়ম হল, কথা না বলা। গায়িকার কথায়, “আমি দিনে একটা বা দুটোর বেশি ফোনে কথা বলি না। নির্দিষ্ট গতি ও নির্দষ্ট স্বরের উপরে কথা বলি না। রেগে গিয়ে চিৎকার করে কথা একদম নয়। এতে কণ্ঠনালীর উপরে চাপ পড়ে। দেশের বায়ুদূষণ সাংঘাতিক পর্যায়ে, তাই মাস্ক পরে বেরোই। আসলে এক জন সঙ্গীতশিল্পী একই সঙ্গে, আড্ডা মারবে, পার্টি করবে, আবার গানও গাইবে— সেটা হয় না।”
খাওয়াদাওয়াও নিয়মে বেঁধেছেন ইমন। পছন্দের আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয়, ফুচকার টক জল, টক দই সমস্ত বাদ দিয়েছেন। গায়িকার স্পষ্ট বক্তব্য, “সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ঘরভর্তি ধূপধুনো, যা গলার ক্ষতি করে। তখন এক জন শিল্পীকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তার কাছে ঈশ্বর কে?”