Advertisement
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সব বাবাই আসলে পিকুর বাবা

বলিউডি ছবিতে আবারও বাঙালি নস্টালজিয়া। বাংলায় করতে চান বায়োপিকও। বললেন সুজিত সরকার। শুনলেন স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়বলিউডি ছবিতে আবারও বাঙালি নস্টালজিয়া। বাংলায় করতে চান বায়োপিকও। লোকে সুজিত সরকারকে ভালবাসে বলে ‘পিকু’ দেখতে যাচ্ছে বা ‘পিকু’কে ভাল বলছে এমনটা নয়। সিনেমাটা যাঁরা ভালবাসেন, সেই সিনেমাপ্রেমী মানুষই আজ ‘পিকু’র জন্য উচ্ছ্বসিত। বললেন সুজিত সরকার। শুনলেন স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০১৫ ০০:০১
Share: Save:

এর মধ্যেই ৫০ কোটি টাকা কালেকশন করে ফেলেছে ‘পিকু’। কেমন লাগছে?

Advertisement

দেখুন, লাভ-লোকসান নিয়ে অত ভাবি না। ওটা প্রোডিউসরের ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু আমার ছবিটা আমার হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। লোকে এখন ‘পিকু’কে, ভাস্কর ব্যানার্জিকে অ্যাডপ্ট করতে চাইছে। এখনই ট্যুইট করে একজন জানালেন তিনি তাঁর মেয়ের নাম পাল্টে পিকু রাখছেন। একজন পরিচালক হিসেবে দর্শকদের থেকে এত পজিটিভ রেসপন্স, সত্যি বলতে কী আমি তো একেবারে লজ্জায় পড়ে যাচ্ছি।

কর্ণ জোহর ট্যুইট করে কী বললেন?
কর্ণের তো অসম্ভব ভাল লেগেছে। মনে আছে ও লিখেছিল ‘পিকু ইজ অল হার্ট অ্যান্ড স্টমাক... অ্যান্ড সো মাচ মোর।’ শুধু কর্ণই নয়, অনুরাগ কাশ্যপ, সুজয় ঘোষ এমনকী রাজু হিরানিও ছবিটা দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছেন। আমার কোনও ছবিতে ইন্ডাস্ট্রি এত পজিটিভ প্রতিক্রিয়া জানায়নি যেমনটা ‘পিকু’তে করল। তবে প্রমোশনের কথা যখন উঠল তখন একটা কথা বলি?

বলুন না...

Advertisement

মুম্বইতে ঠিক হয়েছে ছবির প্রমোশনের জন্য আমরা বাজেট কমাব। ধরুন যে ছবি করতে ১০ টাকা লাগছে, তার প্রমোশনের জন্য আট টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। এতে ছবির বাজেটও বেড়ে যাচ্ছে অনেক। ছোট বাজেটের ভাল ছবি করার জন্য খরচ কমিয়ে দিতে হবে। তাতে আরও ছবি করার সুযোগ বাড়বে।

অনুরাগ কাশ্যপ আপনার খুব বন্ধু। ‘পিকু’র প্রমোশনেও তো খুব সাহায্য করেছেন আপনাকে...

আসলে এটা বন্ধুত্বের বিষয় নয়। লোকে সুজিত সরকারকে ভালবাসে বলে ‘পিকু’ দেখতে যাচ্ছে বা ‘পিকু’কে ভাল বলছে এমনটা নয়। সিনেমাটা যাঁরা ভালবাসেন, সেই সিনেমাপ্রেমী মানুষই আজ ‘পিকু’র জন্য উচ্ছ্বসিত।

অনুরাগ তো প্রমোশনে এত সাহায্য করেছেন। ‘বম্বে ভেলভেট’ দেখেছেন? ‘পিকু’র বাজারকে কি ক্রস করতে পারবে?

ছবিটা এখনও দেখিনি। দেখব তো নিশ্চয়ই। এই ইন্ডাস্ট্রিতে অনুরাগ
কাশ্যপের অবদান অনেক বড়। বারবার ও নিজেকে যে ভাবে ভেঙেছে, সেটা দেখার মতো। ‘বম্বে ভেলভেট’য়ের জন্য ওকে অভিনন্দন।

মুম্বইতে এখন আর কমার্শিয়াল ছবি ও নিউ এজ ছবিকে আলাদা করা যায় না। রাজু হিরানি, অনুরাগ কাশ্যপ, কর্ণ জোহররা সেই বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছেন। আপনিও কি সেই লিগ-এ ঢুকে পড়লেন?

এখন সত্যিই আর কমার্শিয়াল-অফবিট ছবিকে আলাদা করা যায় না। তবে আমি খুব সচেতন ভাবে এই ধারার কথা ভেবেই ‘পিকু’ তৈরি করেছি, তা কিন্তু নয়। ‘পিকু’ করার পরে আমি তো আজও ভাবতে পারি যে সম্পূর্ণ কমেডি ছবি করে আমি সফল হব। নইলে ‘ইয়াঁহা’-র মতো সিরিয়াস মেকিং-এর পর আমি যে কী ভাবে ‘ভিকি ডোনর’য়ের মতো কমেডি ছবি বানিয়ে ফেললাম, তা ভেবে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। গল্পের টানে এক একটা ছবি এক-এক ধারার হয়েই যায়। তবে আর যাই হোক, ‘দবাং’-এর মতো মশালা ছবি কখনও বানাতে পারব না।

‘পিকু’ তবে কোন ধারার?

‘পিকু’ আসলে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের ছবি। ছবিটা দেখলেই বুঝতে পারবেন এখানে আধুনিকতার মোড়কে শিকড়ে ফেরার গল্প বলা হয়েছে।

এই শিকড়ের নাম কি সত্যজিৎ রায়? ছবিতে পরিবারের সঙ্গে টেবিলে খাওয়াদাওয়ার দৃশ্য দেখে সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখা প্রশাখা’র কথা মনে পড়ে...

সত্যজিতের সব ছবি দেখে, নিংড়েই আমি ‘পিকু’ তৈরি করেছি।

ছবিতে পিকু সাদামাঠা পোশাক পরে। বাবার খেয়াল রাখে। অথচ যৌন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তার কাছে যৌনতা হল ‘নিড’। কিন্তু ছবিতে কোথাও যৌনদৃশ্য নেই। এক নতুন আধুনিকতার কথা বলে এই ছবি...

‘পিকু’র জন্য যখন দীপিকাকে ভাবি, তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল ছবিটা একটা আদ্যোপান্ত প্রেমের গল্প হবে যেখানে দীপিকার সেক্সুয়ালিটি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু সেটা কেন করব বলুন? এখন সিনেমার দর্শকরা অনেক বেশি বুদ্ধিমান। ছবিতে পিকুর মাসি যখন জানতে চায় তার সেক্সুয়াল লাইফটা ঠিক আছে কি না, সে সেটাকে কোনও সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যা না করে নিজস্ব চাহিদা বলে প্রকাশ করে। আপনি যদি ভেবে দেখেন, দেখবেন আজকের প্রজন্মের মেয়েরা কিন্তু সেক্সুয়াল লিবারিজমেই বিশ্বাস করে। সেটাই এই ছবিতে তারা রিলেট করতে পেরেছে। এটাই ছবিটার ইউএসপি। আমি যিশু-দীপিকার যৌনদৃশ্য তৈরি করতেই পারতাম। বুদ্ধিমান আধুনিক দর্শকদের কথা ভেবেই তা সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছি।

কিন্তু তা হলে তো সবচেয়ে বেশি আধুনিক বলতে হয় পিকুর বাবা ভাস্কর ব্যানার্জিকে?

একদম তাই। এক দিকে পুরনো কলকাতার বনেদি বাড়ির বাবু-চরিত্র, অন্য দিকে মেয়ের যৌন সম্পর্ক নিয়েও তিনি সরব। সময়টা যা, সেটাকেই ছবিতে নিয়ে এসেছি। ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ করার সময়ও অনিন্দ্যকে বলেছিলাম ঠিক যেটা ফিল করছ, সেটাই লেখো। কোনও গিমিক তৈরি করে দর্শককে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা কোরো না। তাতে ফল উল্টো হবে।

নিন্দুকেরা বলেন, ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ যত ভাল ছবিই হোক, সুজিত সরকার না থাকলে ছবির এত সাফল্য আসত না...

এ ভাবে ভাবাটা ঠিক নয়। অনিন্দ্য খুব ট্যালেন্টেড। দারুণ লেখে। তবে ইমোশনাল সাপোর্টের একটা গুরুত্ব তো থাকেই। আমি সেটাই করেছি শুধু। ভাল বাংলা ছবি আমি সব সময়ই করতে চাই।

পরের বাংলা ছবি কী?

এই রে, সেটা এখনও চিন্তা করিনি। দেখুন ছবি প্রোডিউস করতে আমার ভালই লাগে। তাই বলে লোকে যদি এটা ভাবে আমি একের পর এক ছবি প্রোডিউস করে ছবির কারখানা তৈরি করব, সেটা ভুল। বাংলায় বায়োপিক করার ইচ্ছে আছে আমার। বাঙালি সংস্কৃতিটা আমাকে বড্ড টানে।

বাঙালি সংস্কৃতির টানেই ‘পিকু’তে অমিতাভ বচ্চন নেচে উঠেছেন ‘জীবনে কী পাবো না’র তালে। গানগুলো কি আগে শুনেছিলেন?

না, আগে শোনা ছিল না। অনুপমকে একদিন ফোন করে বললাম আমাকে এমন একটা গান দাও যেটা শুনে বাঙালি বুড়োরা আবার নাচতে শুরু করবে। ও বলল ‘জীবনে কী পাবো না’র কথা।

কিন্তু গানটা তো রিমিক্স হওয়ার কথা ছিল...

প্রথমে ভেবেছিলাম গানটায় আর একটু রিদম দিয়ে আধুনিক ভার্সান দেব। কিন্তু গানটা শোনার পর মনে হয়েছিল রিমিক্স করলে গানের নস্টালজিক চার্মটা হারিয়ে যাবে।

ছবি জুড়ে এই যে নস্টালজিক বাঙালি চার্ম, বনেদি বাড়ি, গঙ্গার ঘাটে রোল খাওয়া, কলকাতার কচুরি-জিলিপি, এগুলো দেখে বাঙালিরা উচ্ছ্বসিত। আর অবাঙালিরা?

দেখুন আমি দেখেছি বাঙালিরা নিজেদের বিভিন্ন আচরণে নিজেরাই হাসতে পারে। এটা একটা বিরল ক্ষমতা। ছবিতে পরিবারের বিভিন্ন লোক নিজেদের নিয়েই হাসিঠাট্টা করে। কিন্তু ছবিটা দেখতে দেখতে আমি খেয়াল করেছি একজন বাঙালি ছবির যে সব দৃশ্যে হো হো করে হাসছে, ঠিক সেই দৃশ্যেই জয়পুরের একজন মানুষ হেসে উঠছে। এবং শুধু হেসে ওঠাই নয়, অবাঙালিরাও ভাস্কর ব্যানার্জির মতো চরিত্রকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। এই হ্যাং-ওভারটা আমায় খুব আপ্লুত করেছে।

ভাস্কর ব্যানার্জির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন দীপিকা পাড়ুকোন। মুম্বইতে এত অভিনেত্রী থাকতে ওঁকে কেন নিলেন?

ওর লুকের মধ্যে একটা বাঙালিয়ানা আছে। আর আজকাল তো হিরোইনরা চায় ছবিতে তাঁর সংলাপ সবচেয়ে বেশি থাক। দীপিকার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম ও একেবারেই ওর স্টারডম নিয়ে সচেতন নয়। উল্টে সেটে আমাকে বলত, ‘লাইন কমিয়ে দিয়ে এই জায়গাটায় এক্সপ্রেশন দিই?’ ও যে ভাবে এই ছবিতে নিজের চোখের ব্যবহার করেছে, এক কথায় সেটা ব্রিলিয়ান্ট।

ভাস্কর ব্যানার্জির পর অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে আপনি নাকি আরও কাজ করতে চান? শোনা যাচ্ছে ‘পিকু’র নাকি সিকোয়েল হবে?

অমিতাভজির সঙ্গে কাজ করা একটা বড় অভিজ্ঞতা। সংলাপের পরেও উনি হঠাৎ করে এমন কতগুলো এক্সপ্রেশন দিয়ে দিতেন শট-এ, চমকে যেতাম আমরা। কাজ তো করতে ইচ্ছে করেই। তবে ‘পিকু’র সিকোয়েল করব ভেবে তো ছবিটা বানাইনি। এখন এই মুহূর্তে কোনও প্ল্যান নেই।

এই মুহূর্তে কী প্ল্যান?

‘পিকু’ সবাই এনজয় করছে। সেটাই আমি এনজয় করছি এখন।

এত যে হাসিখুশি দেখছি, লোকে তো বলে আপনি খুব গম্ভীর...

পরিচালককে সকলেই গম্ভীর বানিয়ে রাখেন। তার ওপর আমার তো দাড়ি আছে। আমার মেয়েরা জানে আমি কতটা পাগলাটে আর মজার লোক।

বয়স হলে আপনিও কি তা হলে পিকুর বাবার মতোই হবেন?

সব বাবাই আসলে পিকুর বাবা। আমি কী হব জানি না। হলে মন্দ হয় না। আমার মেয়েদের এই কঠিন পৃথিবীর সঙ্গে, বাস্তবের সঙ্গে একা লড়াই করার ক্ষমতা দিয়ে যেতে পারব।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.