রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষযাত্রায় বামেদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। প্রয়াত অভিনেতা বামপন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেই যুক্তিতে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে লাল পতাকা নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কয়েক জন বাম নেতানেত্রী ও সমর্থক। শেষযাত্রায় গান গাওয়ার পাশাপাশি স্লোগানও দিয়েছিলেন তাঁরা। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে নানা মন্তব্য উঠে আসে। ভোটের আগে প্রয়াত শিল্পীকে নিয়ে স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা তোলার লক্ষ্যেই তাঁরা ওই কাণ্ডটি করেছেন বলে অনেকেই কটাক্ষ করেন।
কিন্তু সেই দিনের পর থেকে তাঁরা কি চুপ? বামপন্থী মনের অভিনেতা রাহুলের মৃত্যুর তদন্তের দাবিতে তাঁরা আর সরব হলেন না কেন? এমন বেশ কিছু প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। এই প্রসঙ্গে সিপিএমের যুবনেতা সৃজন ভট্টাচার্যের স্পষ্ট বক্তব্য, রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুকে তাঁরা রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করতে চান না। বামনেতার কথায়, “ওঁর মৃত্যুতে শিল্পীরা লড়ছেন। সেই শিল্পীদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাঁরা পরিচিত বামপন্থী। কেউ কেউ আর্টিস্টস ফোরামের নির্বাচিত পদাধিকারী। যদিও সেই শিল্পীদের মধ্যে বহু ধান্দাবাজ ব্যক্তিও রয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হল চলচ্চিত্র জগৎ তো এই লড়াইয়ে নেমেছে। আমাদের আলাদা করে রাহুলদার মৃত্যুকে ব্যবহার করার কোনও উদ্দেশ্য নেই। রাহুলদা আমাদের প্রত্যেকের ভালবাসার মানুষ ছিলেন।”
শেষযাত্রায় বামপন্থীদের আন্তর্জাতিক গান গেয়েছিলেন বাম সমর্থকেরা। মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ উঠেছিল সেই দিন। তৃণমূল নেত্রী শতাব্দী রায়েরও একই বক্তব্য। তিনি বলেন, “আজকাল মৃত্যু নিয়ে এত বেশি রাজনীতি হচ্ছে। শেষ সময়ে নিজের লোকেরা একটা মানুষকে আঁকড়ে থাকতে চান। কিন্তু অন্য দলগুলি ঝাঁপিয়ে পড়েন রাজনীতি করার জন্য। এই অবস্থা সত্যিই খুব শঙ্কার। এখন মনে হয়, আমাদের মৃত্যু হলে তা যেন কেউ জানতে না পারে। নিজস্ব দুঃখগুলো আর ব্যক্তিগত থাকছে না।”
শতাব্দী আরও প্রশ্ন তোলেন, “ভাবছিলাম, কেন হঠাৎ ওরা চুপ করে গেলেন? কেন ওঁরা তদন্তের দাবি তুলছেন না সেই ভাবে? লাল পতাকা দেওয়ার থেকে তো তদন্তের দাবি তোলা বেশি প্রয়োজনীয়।” এই প্রসঙ্গে বাম সমর্থক ও পরিচালক সৌরভ পালোধীর বক্তব্য, “আমরা এখনও সরব আছি। আমি, চন্দনদা, বাদশাদা, দেবদূতদা সবাই সরব। সেই দিনও প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দাবি করেছিলাম। অবশেষে তা হয়েছে। আমরা সবাই খুশি। আরও খুশি কারণ, রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে যৌথ ভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই লড়াই সবার, সেটাই তো খুব ভাল দিক।”
এই লড়াই ‘কমরেড’ রাহুলের জন্য যেমন, তেমন নাটকের মঞ্চে সতীর্থের জন্যও। জানান সৌরভ। তাই শেষযাত্রায় শ্রদ্ধা জানাতে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি ও অন্য বাম সমর্থকেরা। তাঁর কথায়, “রাজনৈতিক ভাবে ওর জন্য পতাকা নিয়ে মিছিল দেখা যায়নি, এটা প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু লড়াইটা যখন সবাই মিলেই লড়ছে, তখন পতাকা নিয়ে মিছিল করার তো প্রয়োজনই পড়েনি। রাহুলদার মৃত্যু নিয়ে সিপিএমের রাজনীতি করার প্রয়োজন পড়লে, ভোটের প্রচার ছেড়ে দিয়ে এখানে চলে আসত। দীপ্সিতা সেই দিন ভোটের প্রচার ছেড়ে কেবল ওকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল।”
যদিও দীপ্সিতার বক্তব্য, সমাজমাধ্যমে তাঁরা অনবরত রাহুলের মৃত্যুর তদন্তের দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, “রাহুলদার তদন্তের দাবি প্রথম দিন থেকেই চাইছি। পিছিয়ে আসার কোনও প্রশ্নই নেই। রাহুলদা আমাদের সঙ্গে মিছিলে হাঁটতেন। আমরা বিশ্বাস করি, এটা কোনও দুর্ঘটনা নয়। কিছু মানুষ অসৎ, তাঁরা মানুষের জীবনকে জীবন মনে করেন না। তাঁদের অসচেতনতা এবং ক্ষমতার দম্ভের জন্য এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।”
শেষযাত্রার আগে রাহুলের বাড়ির সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন বিজেপি নেত্রী পাপিয়া অধিকারীও। কিন্তু তাঁকে ঘিরে ধরেছিলেন স্থানীয়েরা। কেউ কেউ সেখান থেকে চলে যেতেও বলেছিলেন। সেই দিন শেষযাত্রার বামেদের উপস্থিতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য, “বামেরা আসলে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। যে কোনও ঘটনা পেলেই ওদের শুরু হয়ে যায়। ওদের আর কিছুই করার নেই।” এর পরেই কেন তাঁকে সেই দিন ফিরে আসতে হল, তার বিবরণ দেন পাপিয়া। তাঁর বক্তব্য, “আমাকে দেখলেই আসলে আমার সমর্থকেরা ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলেন। পথচলতি মানুষ বুঝতে পারেননি রাহুলের ঘটনা। তাঁরা আমাকে দেখেই তাই ‘ভারতমাতা কি জয়’ রব তুলতে থাকেন। ওর পাশেই ছিল বামপন্থীদের অফিস, তাঁরা আপত্তি জানাতে থাকেন প্রচারে আসার জন্য। অথচ, আমি কিন্তু শুধু দেখা করতেই গিয়েছিলাম।”
আরও পড়ুন:
সৌরভের অবশ্য বক্তব্য, “ওঁকে পাড়ার লোকেরা সেই দিন সেখান থেকে ফিরে যেতে বলেছিলেন। রাহুলদার গায়ে আমরা লাল পতাকা দিয়েছিলাম। কেউ চাইলে নামাবলিও দিতে পারতেন। তবে এক জনের শেষযাত্রায় ‘ভারতমাতা কি জয়’ কী ভাবে প্রাসঙ্গিক আমার জানা নেই। সিপিএম কিন্তু পার্টির স্লোগান তোলেনি সেই দিন। বামেদের অন্তত কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।” প্রায় একই বক্তব্য সৃজনেরও, “রাহুলদার মৃত্যুকে সঙ্কীর্ণতার স্বার্থে ব্যবহার করা আমাদের উদ্দেশ্য সেই দিনও ছিল না, আজও নেই। বরং রাহুলদার দরজা আগলে দাঁড়িয়েছিলেন কিছু তৃণমূলের লোক। তাঁরাই ঠিক করছিলেন, কাদের উঠতে দেওয়া হবে উপরে। বিজেপি প্রার্থীর স্লোগানও ভাল লাগেনি। সেই দিন ওদের কুৎসিত রূপটা বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। আর শিল্পীদের মধ্যেই রাহুলদার জন্য তো বামপন্থীরাও সরব হয়েছেন।”
উল্লেখ্য, গত শনিবার থেকে আর্টিস্টস ফোরাম রাহুলের বিচারের দাবিতে সরব হয়েছেন। পাশাপাশি ফেডারেশনের সঙ্গে একজোট হয়ে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিরাপত্তার দিক নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা। টেকনিশিয়ানস স্টুডিয়োয় একজোট হয়েছিলেন সকলে। মঙ্গলবারই কর্মবিরতি শেষের ঘোষণা করেন তাঁরা। তবে আর্টিস্টস ফোরাম সিদ্ধান্ত নেয়, প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর সঙ্গে আর কেউ কাজ করবেন না।