বাংলা ছবির মুক্তি কি উৎসবকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে? গত কয়েক বছরের হিসাব বলছে, উদ্যাপনের আমেজে হিন্দি ছবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই সময়ে মুক্তি পেয়েছে একাধিক বড় বাজেটের বাংলা ছবি। অবশ্য বরাবরই পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপুজো বা বড়দিনের মরসুমে দর্শক টানতে প্রেক্ষাগৃহে ছবির ভিড় বাড়ে।
এ বছরের কথাই ধরুন। ২৩ জানুয়ারি ছিল সরস্বতীপুজো। সেই দিন মুক্তি পেয়েছিল তিনটি বাংলা ছবি-- ‘বিজয়নগরের হীরে’, ‘হোক কলরব’, ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’। সঙ্গী সানি দেওলের ছবি ‘বর্ডার ২’। ফেব্রুয়ারি মাসে এখনও পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে মাত্র দুটো বাংলা ছবি, ‘মন মানে না’, ‘খাঁচা’।
এ দিকে, গত বছর রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, বাংলা ছবিকে প্রতি দিন একটি করে প্রাইম টাইম শো দিতে হবে। একাধিক বাংলা ছবি মুক্তি পেলে হিন্দি নয়, নিজের ভাষার ছবিকেই প্রেক্ষাগৃহে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। ফলাফল? সোমবার ‘মন মানে না’ ছবিটি মাত্র তিন জন দর্শক দেখতে আসায় শো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন বিনোদিনী প্রেক্ষাগৃহের মালিক জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। এ কথা তিনি আনন্দবাজার ডট কম-কে নিজে জানিয়েছেন। তাঁর চারটি শো-এর দু’টি বন্ধ যাচ্ছে বাংলা ছবির অভাবে। খবর, বছরের অন্য সময় হিন্দি ছবি না নেওয়ায় জয়দীপ-সহ একাধিক হলমালিকের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন হিন্দি ছবি পরিবেশকরাও। তাই অসময়ে তাঁদের দ্বারস্থ হলে পাশে দাঁড়াচ্ছেন না তাঁরাও।
এমন আবহে সোমবার পরিবেশক, প্রযোজক এবং হলমালিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুখোমুখি স্ক্রিনিং কমিটি এবং ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। আলোচনা থেকে কী উঠে এল? বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ এবং হলমালিকদের অবস্থা বিবেচনা করে স্ক্রিনিং কমিটি এবং ইম্পা কি কোনও পদক্ষেপ করতে চলেছে? প্রশ্ন করা হয়েছিল তাঁকে। পিয়া সাফ জানান, জুন মাস পর্যন্ত তৈরি স্ক্রিনিং কমিটির সিনে ক্যালেন্ডার পরিবেশকদের অনেক সুবিধা করে দিয়েছে। কোন মাসে কোন ছবি মুক্তি পাচ্ছে, সেটা আগাম জানা থাকলে পরিবেশকদের কাজ করতে সুবিধা হয়, জানিয়েছেন তাঁরা।
উৎসবের সময় ছাড়া সিনে ক্যালেন্ডারের বাকি মাসগুলো যে ফাঁকা! এ দিকে ছবির অভাবে বন্ধ হওয়ার মুখে একাধিক প্রেক্ষাগৃহ। এই সমস্যার সমাধান কী? পিয়ার কথায়, “এই সমস্যা তৈরি হবে বলেই আগের একাধিক বৈঠকে কমিটির তরফ থেকে প্রথম সারির প্রযোজক এবং অভিনেতা-প্রযোজকদের অনুরোধ জানানো হয়েছিল, বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়কে আঁকড়ে না থেকে সারা বছর বাংলা ছবি মুক্তি পাক। এতে সার্বিক মঙ্গল। পরিবেশক, হলমালিকেরাও লাভের মুখ দেখবেন। বাংলা ছবির বাণিজ্য হবে।” পিয়ার যুক্তি, “যাঁরা তারকা, তাঁরা ইতিমধ্যেই অ্যাসিড টেস্টে উত্তীর্ণ। তাঁদের ছবি যখনই আসবে, দর্শক দেখবেন। সেই ভরসা নিয়েই তাঁরা উৎসব ছাড়াও ঘুরেফিরে অন্য সময়েও আসুন। বাংলা সিনেমা বাঁচুক।”
বৈঠকে এমন কথাও উঠে এসেছে, প্রেক্ষাগৃহই যদি না থাকে, তা হলে উৎসবের আবহে প্রযোজক, পরিচালকদের ছবিমুক্তি নিয়ে ধুন্ধুমার হবে কী করে?
ভাল বাংলা ছবির অভাবে ধুঁকছে ইন্ডাস্ট্রি, এ কথা শুধুই শহরের হলমালিকদের নয়। শহরতলি, গ্রামের হলমালিকদেরও একই অবস্থা। বারাসাত, বসিরহাটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাণীরূপা সিনেমাহল। তার মালিক এবং ইম্পার সহ-সভাপতি সুভাষ সেন এ দিন বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর আফসোস, “এখন বাংলা ছবি শহুরে দর্শকের কথা ভেবে তৈরি হয়। পরিচালকেরা নিজের ভাবনা দর্শকের মাথায় জোর করে চাপিয়ে দেন। আমরা কিন্তু এখনও সিনেমা মানে বুঝি, শুধুই ‘এন্টারটেনমেন্ট’। তাই গ্রামের দর্শক এখনও ‘খাদান’ বা ‘প্রজাপতি ২’-এর জন্য মুখিয়ে থাকেন। এই ধরনের ছবি তো কেবল দুর্গাপুজো বা শীতে আসবে। আমরা সারা বছর চলব কী করে? নামীদামি পরিচালকেরা তো আমাদের কথা ভাবেন না!”
একটা সময় ৭৫টি সিনেমাহল নিয়ন্ত্রণ করতেন নিমাই পাঁজা। তিনি একাধারে পরিচালক-প্রযোজক-পরিবেশক। ইন্ডাস্ট্রি জানে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত থেকে শুরু করে তাবড় তারকা ছবিমুক্তির আগে নিমাইবাবুর সঙ্গে আলোচনায় বসতেন। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হতে হতে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছেন ১৭-য়! নিমাইবাবু অবশ্য শুরুতেই দোষ দিয়েছেন করোনাকালকে। তাঁর কথায়, “ওই যে মানুষ ঘরে ঢুকে গেলেন, আর প্রেক্ষাগৃহে আসতেই চাইছেন না! ওটিটি, সিরিজ়ের ধাক্কায় সিনেমা খাবি খাচ্ছে।” পাশাপাশি, ভাল বাংলা ছবি তৈরি হচ্ছে না, এটাও মত তাঁর।
সমস্যার সমাধান কোথায়? পিয়ার কথার অনুরণন শোনা গিয়েছে জয়দীপ, সুভাষ, নিমাইবাবুদের কণ্ঠে। এ বার হলমালিকদের দুর্দিনে ‘বাংলা ছবি’কে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন তাঁরা। পিয়া এ দিনের বৈঠকে হলমালিকদের অনুরোধ জানিয়েছেন, ২:১ অনুপাতে বাংলা এবং হিন্দি ছবি দেখানোর ভাবনাচিন্তা যদি তাঁরা করেন। যাতে বাংলা ছবি না থাকলে হিন্দি ছবির পরিবেশকেরা একেবারে মুখ ফিরিয়ে না থাকেন।