Advertisement
E-Paper

কলকাতায় খেলা থাকলে শাহরুখকে টিকিট পাঠাব

বাপি বাড়ি যা স্টাইলে বলছেন আইএসএল-এ টিম কলকাতার মালিক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। কী ভাবে শাহরুখকে হারালেন তাঁরা? ড্রেসিংরুমের খবর দিচ্ছেন অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়।আশঙ্কা, আতঙ্ক, ভয়, সব মিলিয়ে আর্তনাদের মতো শোনায় ওই কণ্ঠস্বরগুলো। আর এই কয়েক বছরে যা আমার খুবই চেনা। কলকাতায় কোনও ফুটবল টুর্নামেন্ট, এএফসি কাপের ম্যাচ, এমনকী সর্বভারতীয় টুর্নামেন্ট হলেও ছবিটা একই। ফুটবল কর্তাদের অবশ্যম্ভাবী ফোনটা আসবেই। ‘দেখো না, কোনও চ্যানেল যদি ম্যাচগুলো সরাসরি দেখাতে রাজি হয়। টেলিকাস্ট রাইটসের জন্য কোনও টাকাপয়সা লাগবে না। শুধু ম্যাচটা দেখাবো।’

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৪ ০০:০০
প্রিন্স অব কলকাতা থেকে ওনার অব ‘টিম কলকাতা’

প্রিন্স অব কলকাতা থেকে ওনার অব ‘টিম কলকাতা’

আশঙ্কা, আতঙ্ক, ভয়, সব মিলিয়ে আর্তনাদের মতো শোনায় ওই কণ্ঠস্বরগুলো। আর এই কয়েক বছরে যা আমার খুবই চেনা। কলকাতায় কোনও ফুটবল টুর্নামেন্ট, এএফসি কাপের ম্যাচ, এমনকী সর্বভারতীয় টুর্নামেন্ট হলেও ছবিটা একই। ফুটবল কর্তাদের অবশ্যম্ভাবী ফোনটা আসবেই। ‘দেখো না, কোনও চ্যানেল যদি ম্যাচগুলো সরাসরি দেখাতে রাজি হয়। টেলিকাস্ট রাইটসের জন্য কোনও টাকাপয়সা লাগবে না। শুধু ম্যাচটা দেখাবো।’ এবং কঠোর বাস্তবটা হল তার পরও কোনও চ্যানেল রাজি হয় না। ন্যাশনাল স্পোর্টস চ্যানেলগুলো তো নয়ই। এমনকী বাংলা নিউজ চ্যানেলগুলো, যেগুলো ফুটবল দেখিয়ে টিভি রেটিং বাড়াত, তাদেরও যেন আগ্রহ একেবারে পড়তির দিকে। বছর দু’য়েক আগের কথা। শিলিগুড়িতে ফেডারেশন কাপ হচ্ছে। দেশের এক নম্বর নক-আউট টুর্নামেন্ট। সেমিফাইনাল অবধি কোনও টেলিকাস্ট পার্টনার নেই। চার দিকে প্রবল সমালোচনা। হাত গুটিয়ে নিয়েছে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের কমার্শিয়াল পার্টনার আইএমজি রিলায়্যান্স। মাথায় হাত ফেডারেশনের কর্তাদের। বারবার ফোন আসছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট সুব্রত দত্তর। যে করে হোক একটা টিভি পার্টনার জোগাড় করতেই হবে। তাঁর রাজ্যে খেলা। সুতরাং নিজের কাছেও বিরাট একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নিদেনপক্ষে একটা বাংলা চ্যানেলও পাওয়া গেল না। শেষ অবধি ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনাল, ফাইনাল টিভিতে দেখাল ডিডি স্পোর্টস। তা-ও অর্থের বিনিময়ে। ম্যাচ প্রোডাকশনের খরচের সবটাই দিতে হবে তাদের। তার পরেও রীতিমতো নিম্নমানের টিভি প্রোডাকশন।

গোটা দেশের সামগ্রিক ফুটবল চিত্রটা আসলে এ রকমই। কলকাতায় কিংবা গোয়ায় এএফসি কাপের খেলা হয় কোনও রকম টেলিকাস্ট ছাড়াই। অথচ এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের কড়া নিয়মাবলির অন্যতম হল ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার হতেই হবে। এবং সেই সম্প্রচারের ভিডিয়ো রেকর্ডিং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাঠাতে হবে কুয়ালালামপুর এএফসি দফতরে। কলকাতা থেকে গত দু’বছর এএফসি কাপ খেলছে ইস্টবেঙ্গল। শুধু খেলছেই না, সেমিফাইনাল অবধি উঠেছিল। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয় হল লাল-হলুদের অধিকাংশ এএফসি ম্যাচ টেলিকাস্টই হয়নি। স্থানীয় ক্যামেরাম্যান ভাড়া করে একটা ক্যামেরায় ম্যাচের রেকর্ডিং করে কুয়ালালামপুরে ক্যাসেট পাঠিয়েছেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারা।

হতাশার ছবিটা শুধু এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা-ও নয়। নিয়মিত শুনবেন, একটা না একটা ক্লাব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এবং কী সব ক্লাব! প্রথম জাতীয় ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন জেসিটি মিলস্, ফাগোয়ারা। আই লিগ চ্যাম্পিয়ন মাহিন্দ্রা ইউনাইটেড। ভারতীয় ফুটবলে অর্থ বিনিয়োগ আসলে ভস্মে ঘি ঢালা এটা বোঝামাত্রই সরিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। এরা না হয় কর্পোরেট ক্লাব। সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের পছন্দ, অপছন্দের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে সেখানে। কিন্তু কলকাতার ক্লাব ইউনাইটেড স্পোর্টস? একটা চিটফান্ড সংস্থাকে স্পনসর পেয়ে দারুণ টিম গড়ে এক বছর আগে আই লিগে চতুর্থ স্থান পেল। পরের বছর রাজ্যে চিটফান্ড বিতর্ক। স্পনসর উধাও। আই লিগে চতুর্থ স্থানে থাকা দলটা স্পনসরই পেল না। কোনও রকম আর্থিক চুক্তি ছাড়া খেলে কোনও রকমে হয়তো ক্লাবটাকে আই লিগে টিকিয়ে রাখতে পারবেন ফুটবলাররা। কিন্তু তার পর? এ বছরও স্পনসর না পেলে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আরও একটা টিম মুছে গেল ভারতীয় ফুটবল থেকে। শুধুমাত্র স্পনসরশিপের অভাবে!

Advertisement

আর সেই ভারতীয় ফুটবলে শুধু এক বছরে বিনিয়োগ হতে চলেছে ৬০০ কোটি টাকা। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত কর্তারাই বিশ্বাস করতে পারছেন না সংখ্যাটা। দিল্লির ফুটবল হাউস কিংবা কলকাতায় যার সঙ্গেই কথা হল, কারও যেন বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। কাটবেই বা কী করে? এক বছর আগে পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবলে মোট স্পনসরশিপ অর্থ ছিল সাকুল্যে ১৪ কোটি ২০ লক্ষ। তবুও সেটাও গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ২০০৮ সালে এই সংখ্যাটা ছিল সাড়ে ৮ কোটি টাকা। সিংহভাগটাই বোধহয় ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের ইউবি গ্রুপ থেকে পাওয়া অর্থ। বাকিটার হাল এক বার ভাবুন!

আইএমজি-রিলায়্যান্স পারল। আপনারা পারেননি কেন? প্রশ্নটা ছিল এআইএফএফ ভাইস প্রেসিডেন্ট সুব্রত দত্তকে। কলকাতায় বসে তাঁর বিশেষ কিছু করার নেই জেনে নিয়েও মনে হল অজুহাত খুঁজছেন, “আসলে বিগত কয়েক বছর ভারতীয় ফুটবলের কমার্শিয়াল রাইটসই আর আমাদের হাতে নেই। প্রিয়দা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এই রাইটস জি-স্পোর্টসকে বেচে দিয়েছিলেন। পরে এই স্বত্বটাই জি-স্পোর্টস থেকে আইএমজি-রিলায়্যান্স নিল। আমাদের হাতে কিচ্ছু ছিল না।” থাকলেও যে বিরাট কিছু করতে পারতেন, তেমনটা অবশ্য মনে হয় না। এ দেশে ম্যারাথনের জন্য স্পনসররা প্রতি বছর ৪২ কোটি টাকা খরচ করে। ২০১৩-র পরিসংখ্যান বলছে সে তথ্য। গল্ফের জন্য খরচ হয়েছে ফুটবলের দ্বিগুণ। ২৮ কোটি টাকা। এই নন-টিভি স্পোর্টসগুলোর টিভি প্রোডাকশন করতে কালঘাম ছুটে যাবে। দর্শকও বিশেষ পাবেন না। অথচ এ সব খেলায় স্পনসরশিপের ছড়াছড়ি। কিন্তু ফুটবলে নেই!

দোজ ওয়্যার দ্য ডেজ: কিং খান ও দাদা

“এই জন্যই রিলায়্যান্সের বড় একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য,” বলছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। “রিলায়্যান্স শুরুতেই বিপণনের দিকটা ভেবেছে। এই যে সচিন, সলমন থেকে গাঙ্গুলি, রণবীর, জনদের ফুটবলের মুখ হতে রাজি করিয়েছে, এটাই সব চেয়ে বড় কাজ। এই ভাবনাটাই কাজে দেবে। সঙ্গে চাই ভাল মানের কম্পিটিটিভ ফুটবল। তা হলেই দেখবেন গোটা ছবিটা বদলে যাচ্ছে ক্রমশ,” জানান তিনি। সৌরভের নিজের এই ভাবনাটা মাথায় ঢুকেছিল প্রায় বছর খানেক আগে। ঘরোয়া আড্ডায় এই নতুন লিগের কথা বলাতেই কলকাতার ফুটবল ফ্র্যাঞ্চাইজির সম্পর্কে বেশ আগ্রহ দেখান। পরে লন্ডন থেকে নিজে যোগাযোগ করেন রিলায়্যান্সে তাঁর পরিচিত এক বড়কর্তার সঙ্গে। সেই সূত্রেই যোগাযোগ হয় মুকেশ অম্বানীর অফিসের সঙ্গে। মুম্বইয়ে গিয়ে তাঁর অফিসের লোকজনের সঙ্গে মিটিংও সারা হয় আমাদের। সচিনের অবসরের সময় মুম্বইয়ে সচিনের দেওয়া পার্টিতে সৌরভের কথা হয় মুকেশ অম্বানীর সঙ্গে। কলকাতা নিয়ে তাঁর ইচ্ছের কথা বলেন অম্বানীকেও। তবে তত দিনে ফুটবল মহলে চেনা গুঞ্জন, কলকাতার ফুটবল ফ্র্যাঞ্চাইজিরও দখল নেবেন শাহরুখ। মালিকানা পেয়েই গিয়েছেন খবরই চাউর ছিল চার দিকে। সৌরভ অবশ্য নিজের মতো চেষ্টাটা চালিয়েই যাচ্ছিলেন। শুরু করে দিয়েছিলেন ঘর গোছানোর কাজ। শিল্পপতি হর্ষ নেওটিয়া দীর্ঘ দিনের বন্ধু। হর্ষকে বলতে তিনিও রাজি। নিজের মতো করে খোঁজখবর শুরু করলেন তিনিও। কনসর্টিয়ামে নিয়ে এলেন তাঁর শিল্পপতি বন্ধু সঞ্জীব গোয়েন্কা আর উৎসব পারেখকে। সঞ্জীবকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে হর্ষ বলেছিলেন, “কিছু কোটি টাকা ক্ষতি করতে রাজি আছ?” বন্ধুর প্রস্তাবে সঞ্জীব রাজি। সবার প্রবল উৎসাহ। হর্ষের কনক্লেভে হল প্রাথমিক মিটিং। ফিনান্সিয়াল প্রজেকশনে দেখা যাচ্ছিল প্রথম কয়েক বছরে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি। তবু কলকাতা ঘিরে আবেগটা অস্বীকার করতে পারছিল না কেউ। কলকাতার ফুটবল টিমের মালিকানা থাকুক কলকাতার মানুষের হাতে প্রাথমিক তাড়নাটা ছিল সেটাই। নিজের নিজের ক্ষমতায় সবাই তখন ব্যস্ত নিলামের দরপত্র তৈরি করতে। কোনও দিন উৎসব পারেখের অফিসে মিটিং, আবার কখনও হর্ষের বাড়িতে। বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কমেন্ট্রিতে গিয়েছেন সৌরভ। মন পড়ে এখানেই। হোয়্যাটসঅ্যাপে সারাক্ষণ যোগাযোগ রাখছেন কী হচ্ছে কলকাতায় জানতে। মাঝে দু’দিনের ছুটি পেয়ে চলেও এলেন কলকাতায়। ফ্র্যাঞ্চাইজির কাজে।

এ রকম সময়েই গোলের ঠিকানা লেখা পাস-টা এল সৌরভের পা থেকেই। কলকাতার ছেলে পৃথ্বীজিৎ দাস। লন্ডনের ব্যাঙ্কার। প্যাশন ফুটবল। আর প্যাশনের দৌলতেই জানাশোনা সেখানকার ফুটবলের বেশ কিছু রথীমহারথীর সঙ্গে। চেলসি আর ম্যান ইউ-য়ের প্রাক্তন সিইও পিটার ক্যানিয়নের সঙ্গে একটা ফুটবল ফান্ডের ব্যবসাও চালান। তিনি হঠাৎই সৌরভকে এসএমএস করলেন, “ইউরোপের এক প্রথম সারির ক্লাব ইন্ডিয়ান সুপার লিগে বিনিয়োগে আগ্রহী। আপনারা কি পার্টনারশিপে রাজি?” সৌরভ তখন বাংলাদেশে।

পৃথ্বীজিতের সঙ্গে কয়েক দফা মিটিংয়ের পর ওকে দেখা করানো হল হর্ষ, উৎসবের সঙ্গে। সৌরভ ততক্ষণে কনফারেন্সে কথা বলে নিয়েছেন ইউরোপের সেই ক্লাব ‘অ্যাটলেটিকো দি মাদ্রিদ’য়ের কর্তা মিগুয়েলের সঙ্গে। প্রাথমিক ভাবে দু’পক্ষই রাজি। চূড়ান্ত কথাবার্তার জন্য দুবাই গেলেন হর্ষ নেওটিয়া। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কর্তারা এলেন সেখানে। হাতে সময় খুব কম। এগিয়ে আসছে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। কলকাতার জন্য যে অনেকেই ঝাঁপাবে, বুঝতে পারছেন সবাই। কোনও সন্দেহ নেই প্রবল এবং প্রধান প্রতিপক্ষ শাহরুখ খান কী ভাবে নিজেদের দরপত্রকে আরও আকর্ষণীয় করা যায়, কী ভাবে ফুটবলের উন্নতির, ফ্র্যাঞ্চাইজির ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কের একটা রোডম্যাপ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে ব্যস্ত। একেবারে শেষ দিন বিড ডকুমেন্ট জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের ঠিক দশ মিনিট আগে জমা পড়ল আমাদের দরপত্র। আর তার ঠিক পাঁচ মিনিট পর আইএমজি রিলায়্যান্স অফিসে দেখা গেল কিছু চেনা মুখ। ওঁরা শাহরুখ খানের লোকজন। কলকাতার ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজি যে ওঁরাই চালান।

কিং-কে সরিয়ে দাদার রাজ্যাভিষেক নিয়ে সৌরভের ‘অফিশিয়াল’ বক্তব্য হল, “শাহরুখ দাদার মতো। ক্রিকেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি ওর, ফুটবলেরও ওর। যখন খুশি ও আসবে আমাদের সঙ্গে। কলকাতায় আমাদের টিমের খেলা হলে ওকে টিকিট পাঠাব।” তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ঘোষণার দিন হর্ষ নেওটিয়ার বাড়িতে সেলিব্রেশন পার্টি অবধি অবশ্য এতটুকু মনে হয়নি ব্যাপারটা এ রকম দাদা-ভাইয়ের বিষয় ছিল। বরং বেশিটাই ছিল তীব্র পেশাদারি মাপজোক। কিছু ফেলে আসা অপ্রিয় মুহূর্তের হঠাৎ স্মৃতিতে উঁকি দেওয়া আর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই চেনা তীব্র জেদ!

ফ্র্যাঞ্চাইজি ঘোষণা হবার পরেই পরের ভাবনাগুলোর শুরু। সল্টলেক স্টেডিয়ামকে ঠিক কী ভাবে কাজে লাগানো হবে, রবীন্দ্র সরোবরের ঠিক কী অবস্থা, অ্যাকাডেমির জন্য কী কী ব্যবস্থা হতে পারে ভাবনা অনেক। সৌরভ নিজে বিশ্বাস করছেন ক্রিকেটের পর দ্বিতীয় খেলা হিসেবে প্রবল সম্ভাবনা আছে ফুটবলের। আসলে গোটা ভারতের ক্রীড়া মানচিত্রটা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিদেশি স্পোর্টস চ্যানেলগুলোর সৌজন্যে আন্তর্জাতিক ফুটবল ভারতের মাটিতে জনপ্রিয় হওয়ায় প্রচুর মানুষ এখন রিয়্যাল, বার্সিলোনা, চেলসি, আর্সেনাল, ম্যান ইউ-এর ভক্ত। কলকাতা কিংবা মুম্বইয়ের মতো শহরগুলোতেই এখন এদের ফ্যান ক্লাব পাবেন। শহুরে যুব সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ফুটবল দেখে। স্কুলপড়ুয়ারা রুনি, মেসি, রোনাল্ডোর জার্সি পরে মাঠে নামে। কিছু দিন আগে একটা সর্বভারতীয় পত্রিকায় এক বিখ্যাত বহুজাতিক সংস্থার সিইও-র ইন্টারভিউ পড়ছিলাম। মজা করেই বলেছেন, “আমাদের অফিসে যাঁরা এখন ক্রিকেট নিয়ে বেশি মাতামাতি করে, তাঁদের আমরা বুড়ো বলি।”

আসলে কর্পোরেট দুনিয়াও ক্রিকেটের বাইরে একটা খেলা খুঁজছিল। রণবীর কপূরকে নিয়ে পেপসির সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপনটা মনে আছে? ‘চেঞ্জ দ্য গেম’। গেম চেঞ্জার সত্যিই কিছু খুঁজছিল এরা সবাই। কারণ ক্রিকেটের স্পনসরশিপের পরিমাণ সত্যিই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল প্রায় সবার। বিকল্প রাস্তাটার খোঁজ পেতে চাইছিল প্রায় সবাই। এবং মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা যে চালু হয়ে গিয়েছিল, বিসিসিআই-এর কর্তারা নিজেরাও বোধহয় বুঝতে পারছিলেন। ২০১২-র আগে সহারা ইন্ডিয়া ভারতীয় বোর্ডকে প্রতি ম্যাচ পিছু ৩ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা দিত। ২০১৩-তে তাদের চুক্তি শেষ হওয়ার পর আবার নিলাম ডাকল বিসিসিআই। এ বার বেস প্রাইস দেড় কোটি টাকা প্রতি ম্যাচ। মাত্র দু’টো কোম্পানি নিলামে অংশ নিল। সহারা আর স্টার ইন্ডিয়া। স্টার স্পনসরশিপের স্বত্ব পেল। কিন্তু কত টাকায়? ম্যাচ পিছু ১ কোটি ৯২ লক্ষ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে ১ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা রেভিনিউ লস বোর্ডের। অথচ ভারতে স্পোর্টস স্পনসরশিপের পরিমাণ বাড়ছে। অন্তত ১৪ শতাংশ হারে বাড়ছে ভারতের বাজারেই। হকি ইন্ডিয়া লিগ শুরু হয়ে গিয়েছে। শুরু হয়ে গিয়েছে ইন্ডিয়ান ব্যাডমিন্টন লিগও। দু’টোই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। হয়তো প্রাথমিক ভাবে লাভের মুখও দেখছে না ফ্র্যাঞ্চাইজিরা। কিন্তু সবাই আত্মবিশ্বাসী। সুযোগ আসবেই।

দেশের খেলার মানচিত্রটা বদলাতে একটা বড় উদ্যোগ নিচ্ছে স্টার গ্রুপও। একসঙ্গে ছ’টা স্পোর্টস চ্যানেল শুরু করা এই উদ্যোগেরই একটা অংশ। তাদের কর্তাব্যক্তিরা মনে করছেন যে ভাবে এন্টারটেনমেন্ট কিংবা নিউজ টেলিভিশনকে আঞ্চলিক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, স্পোর্টসের ক্ষেত্রে তা হয়নি। অথচ ভারতের মাটিতে সে সম্ভাবনা প্রচুর। আমেরিকায় যেমন আঞ্চলিক ভাবে জনপ্রিয় বাস্কেটবল কিংবা বেসবলকে গ্লোবাল ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করা গিয়েছে, ভারতের মাটিতে সে রকম অনেক কিছুই আছে যাকে বাণিজ্যিক উপাদানে পরিণত করা যায়। আর সেখান থেকেই ভারতের মাটিতে ক্রিকেট, হকি, ব্যাডমিন্টনের পর আসছে কবাডি, ইন্ডিয়া লিগ। একই মডেল স্টার স্পোর্টস দেখাবে। টিম কিনেছেন অভিষেক বচ্চন-সহ বেশ কিছু বাণিজ্যিক সংস্থা। কলকাতার কবাডি টিমের মালিক যেমন কিশোর বিয়ানি ফিউচার গ্রুপ বিগ বাজারের মালিক। আর ফুটবল? ইন্ডিয়ান সুপার লিগ? ওখানে তো রুপার্ট মার্ডকের সংস্থা রীতিমতো অংশীদার। সুতরাং ইন্ডিয়ান সুপার লিগ টিভির পর্দায় কতটা জাঁকিয়ে থাকবে, নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন। সঙ্গে যোগ করুন ওই মুখগুলো। সচিন, সৌরভ, সলমন, জন, রণবীর।

আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল ভারত বিশ্বকাপে ফুটবল খেললে বিশ্বকাপের মাঠের মাঝখানে তেরঙ্গাটা পুঁতে দিয়ে আসবেন। তার স্বপ্ন আদৌ কোনও দিন সফল হবে কি না জানি না। কিন্তু এ বার অন্তত ভারতের ফুটবলে এসে গিয়েছেন এমন দু’জন, যাঁদের ওই তিনটে রং নিয়ে অসাধারণ মমত্ব, তুলনাহীন গর্ববোধ। একজনের মাথায় হেলমেটের মাঝখানে জ্বলজ্বল করত ওই তিনটে রং। অন্য জন? এখনও গর্ব করে বলেন ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতের পতাকা হাতে জোহানেসবার্গ স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণের গল্প। পিছনে পুরো ভারতীয় ক্রিকেট দল।

না, তাই শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে সচিন, সৌরভদের দেখবেন না প্লিজ। ফুটবলের সঙ্গে ওঁরা যখন এক বার জড়িয়েছেন, ভারতীয় ফুটবলকেও নিশ্চয়ই ওঁরা ভুলে যাবেন না!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy