নৈশাহার সেরে যথাসময়ে শুতে এলেন। হঠাৎ খেয়াল হল, ঘণ্টা খানেক কেটে গিয়েছে অথচ আপনি তখনও বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মোবাইল স্ক্রল করছেন। শীতে ঠান্ডাবোধ হচ্ছে কিন্তু বালিশ গুছিয়ে যথাযথ ভাবে লেপ-কম্বল টানতে যত আলস্য। এর নেপথ্যে এক ধরনের মানসিক সমস্যা রয়েছে বলে জানাচ্ছেন ঘুমের ব্যাপারে পরামর্শদাতা এক চিকিৎসক।
অহমদাবাদের ওই চিকিৎসকের নাম নীল বি প্যাটেল। তিনি এক জন পেশাদার সমনোলজিস্ট বা ঘুমের চিকিৎসক। নিজের এক ইনস্টাগ্রাম ভিডিয়োয় তিনি বলছেন, ‘‘রাতে ঘুম পাওয়ার পরেও বিছানায় না গিয়ে জেগে থাকার অভ্যাস নতুন প্রজন্মের মধ্যে বেড়ে গিয়েছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অভ্যাসকে বলা হয়— ‘রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্র্যাস্ট্রিনেশন’।’’ মূলত সারাদিন নিজের জন্য সময় না পাওয়া বা কাজের চাপে থাকায়, রাতে সব কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরের সময়টুকুকে খুব ‘দামি’ মনে হয়। মনে হয়, ওটাই নিজের সঙ্গে কাটানোর মুহূর্ত। তাই ওই সময়ে ঘুমোতে যেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু তাতে আখেরে ক্ষতি হয় নিজেরই। ঘুমের দেরি হয়। কম ঘুম হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। অথচ ক্ষতি হচ্ছে জেনেও রুটিনে বদল আনতে পারেন না এই সমস্যায় ভুক্তভোগীরা। চিকিৎসক জানাচ্ছেন, একটু চেষ্টা করে দৈনন্দিন রুটিনে কয়েকটি বদল আনলে সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
১. জানলা দিয়ে ঘুম পালালো
শরীর জানে তার ঘুমের সময় কখন। নির্দিষ্ট সময়ে সে মস্তিষ্ককে ঘুমের সংকেতও পাঠায়। ওই সময়কে বলা হয় ‘স্লিপ উইন্ডো’। সেই সময়ে যদি বিছানায় না গিয়ে জোর করে কেউ জেগে থাকেন, তবে শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হতে থাকে। ওই হরমোন নতুন করে মস্তিষ্ককে সজাগ করে তোলে। ফলে ঘুম উধাও হয়। একই সঙ্গে কর্টিসলের জন্য শরীরের কোষে কোষে অবাঞ্ছিত কিছু প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই চিকিৎসক বলছেন, ‘‘প্রথমবার হাই ওঠা বা চোখের পাতা ভারী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমোনোর তোড়জোড় শুরু করা উচিত। না হলে শরীরের ‘ঘুম-জানলা’ বন্ধ হয়ে যাবে।’’
২. ডিজিটাল কার্ফু
অনেকেরই ফোন স্ক্রল করতে করতে ঘুমোনোর সময় পিছিয়ে যেতে থাকে। তাই শুতে যাওয়ার অন্তত ৩০-৬০ মিনিট আগে ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি বন্ধ করে দিন। প্রয়োজনে ফোনটি হাতের নাগালের বাইরে দূরে চার্জে বসিয়ে দিন বা অন্য কোনও ঘরে রেখে আসুন।
৩. দিন শেষের রুটিন
কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকে ঘুমোতে যাওয়া অবধি যে সময়টুকু পান, সেই সময়ের একটা রুটিন বানিয়ে ফেলুন। দিনটাকে সুন্দর ভাবে শেষ করার একটা রুটিন। যেমন, বাড়ি ফিরে হালকা গরম জলে হাত-মুখ ধোয়া, নৈশাহার, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, রাতের কিছু প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করা, ডায়েরি লেখা বা পরের দিনের কাজের একখানি তালিকা তৈরি করে নেওয়া আর শেষে খুব হালকা কোনও বই পড়া এবং ঘুম। সপ্তাহ কয়েক এই রুটিন মেনে চলতে থাকলে দেখবেন, বাড়ি ফেরার পরে রুটিনের প্রথম কাজটি শুরু হলেই মস্তিষ্ক বুঝতে শুরু করবে দিন শেষ হতে চলেছে। এ বার বিশ্রাম নেওয়ার সময়। চিকিৎসকের পরামর্শ, ‘‘সকালে ঠিক কটায় উঠতে হবে, তার জন্য যেমন অ্যালার্ম দেন, ঠিক তেমন রাতে ঠিক কটায় বিছানায় যেতে হবে— সেই সময়কেও গুরুত্ব দিন। দরকার হলে তার জন্যও অ্যালার্ম দিয়ে রাখুন।’’
৪. ১০ মিনিট সময় দিন
বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়তেও অনেক সময় ‘আলস্য’ বা ‘অনিচ্ছা’ আসে। হয়তো এমনিই আরামে বসে বা শুয়ে আছেন। কিন্তু বালিশ পেতে চাদর টেনে ভাল ভাবে শোওয়া আর হচ্ছে না। এমনটা তখন হয়, যখন আপনার মন চাইছে না, দিন শেষ হোক। যার প্রভাব পড়ে ঘুমে এবং স্বাস্থ্যেও। একটি সহজ কাজের মাধ্যমে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যায়। ঘুম না পেলেও ঘুমোনোর সময়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ুন। ঘুমোতে ইচ্ছে না হলে হাতে বই নিয়ে শুয়ে পড়ুন। অথবা ১০ মিনিট ধ্যানও করতে পারেন। দেখবেন অল্প সময়েই ঘুম নেমে আসবে চোখে।
৫. কারণ খুঁজে বার করুন
নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করুন— কেন ঘুমোতে চাইছেন না? যদি মনে হয়, নিজের জন্য সময় পাচ্ছেন না, তা হলে দিনের বেলা বা সন্ধ্যায় অন্তত ১৫-২০ মিনিট নিজের পছন্দের কোনও কাজ করার চেষ্টা করুন। সেটা গান শোনা হতে পারে। বই পড়া, সিনেমা দেখা, হাঁটা— যা খুশি হতে পারে। এতে দিনের শেষে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর অভাববোধ চেপে বসবে না। স্বস্তিতে ঘুমোতে যেতে পারবেন।