E-Paper

ছোটদের ত্বকের সমস্যা

বাচ্চাদের ত্বকের সব সমস্যায় ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জেনে নিন, তাদের ত্বকে কী কী সমস্যা হতে পারে

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫

Sourced by the ABP

জন্মানোর বেশ কিছু দিন পর থেকে বাচ্চার গায়ে র‌্যাশ, ফুসকুড়ি দেখে ভয় পেয়ে যান অনেক মা-বাবাই। খুদের গালে সাদা দাগ শ্বেতীর লক্ষণ ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়েন। সদ্যোজাত সন্তানের মাথা ভর্তি খুশকি, মাথার চামড়া উঠে আসা, শরীরের একাধিক জায়গায় লাল-কালো ছোপ... চিন্তায় ফেলে অভিভাবকদের। আসলে বাচ্চাদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। বড়দের তুলনায় তা যেমন পাতলা, নরম, তেমনই মাতৃজঠরের বাইরের পরিবেশ, ধুলো-ধোঁয়ার সঙ্গে তার মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও কম।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দিব্যেন্দু রায়চৌধুরী বলছেন, “এখন ধুলো, ধোঁয়া, দূষণ ইত্যাদির কারণে বড়দের ত্বকেই নানা সমস্যা হয়। সেখানে শিশুর ত্বকে যে সমস্যা হবে, তা স্বাভাবিক।” ছোটরা নিজেদের সমস্যা বুঝিয়ে বলতে পারে না। তাই অভিভাবক হিসেবে মা-বাবার সচেতন হওয়া জরুরি। খেয়াল রাখতে হবে, শ্বেতী বা এগজ়িমার মতো সমস্যায় ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে তা সম্পূর্ণ সেরে যায়। ত্বক চিকিৎসক সন্দীপন ধর বলছেন, “সদ্যোজাত থেকে প্রায় আট-দশ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চার ত্বকের দিকে মা-বাবার বিশেষ নজর রাখা জরুরি। এ সময়ে কী কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, কোন সমস্যা নিজে থেকে সেরে যায়, কোন ধরনের লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, তা জেনে রাখা দরকার।”

  • নিওনেটাল মিলিয়া: জন্মের দিন কয়েকের মধ্যেই হয়। এ ঠিক ত্বকের সমস্যা নয়। চলতি কথায় ‘মাসি-পিসি’ নামে পরিচিত। বাচ্চার গায়ে, নাকের উপরে, থুতনি, গাল এবং কপালে হালকা সাদা বা হলুদ রঙের একাধিক ফুসকুড়ি হয়। এর জন্য সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। সদ্যোজাতের বয়স মাসদুয়েক পেরোলে তা কমে যায়।
  • নিওনেটাল অ্যাকনে: মায়ের শরীরের বাড়তি অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাবে গর্ভস্থ সন্তানের মুখমণ্ডলের সিবেসিয়াস গ্ল্যান্ড সক্রিয় হয়ে অতিমাত্রায় সেবাম নিঃসরণ করতে শুরু করে। তার ফলে শিশুর দুই গাল ব্রণয় ভর্তি হয়ে যায়। নিওনেটাল অ্যাকনে বাচ্চা ছেলেদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। শিশুর গালে ছোট ছোট সাদা ফুসকুড়ির মতো ব্রণ দেখা যায়। সাধারণত তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে এটা মিলিয়ে যায়।
  • ক্রেডেল ক্যাপ: জন্মের পরে অনেক শিশুরই মাথায় অস্বাভাবিক খুশকি দেখা যায়। মাথার চামড়া উঠে আসে অনেকেরই। এতে ভয়ের তেমন কিছু নেই। দিন কয়েকের মধ্যে এ সমস্যা নিজে থেকে কমে যায়।
  • মোঙ্গোলিয়ান স্পট: সদ্যোজাত শিশুর পিঠের দিকে নীলচে ধূসর রঙের গোল বা ডিম্বাকৃতি পিগমেন্টেশন দেখা যায়। মাতৃগর্ভে থাকার সময় থেকেই এর সূত্রপাত, বাচ্চা জন্মানোর পর থেকে তা বাড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে কনজেনিটাল ডার্মাল মেলানোসাইটোসিস বলে। প্রচলিত কথায় তা হল জড়ুল। পেটের দুই ধারে, কাঁধেও জড়ুল থাকে। বাদামি ত্বকের মানুষদের এ সমস্যা স্বাভাবিক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দাগ আকারে ছোট হয়ে যায়। বছর দশেকের মধ্যে অধিকাংশ সময়ে তা মিলিয়েও যায়।
  • হারপিস: ছোট জল ফোসকার মতো দেখতে এই রোগ ছোঁয়াচে। এতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। মূলত মায়ের শরীর থেকে হারপিসের ভাইরাস শিশুর শরীরে আসে। জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে এই রোগ হতে পারে। এই ভাইরাস বাচ্চার ত্বক থেকে শ্বাসনালি, ফুসফুস, মস্তিষ্কের এনকেফেলাম, জিভ, তালু, গলা ইত্যাদি অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এতে বাচ্চার প্রাণ সংশয় হতে পারে।
  • নারেঙ্গা: মূলত অপরিচ্ছন্নতার জন্য এই সমস্যা হয়। স্ট্যাফাইলোকক্কাস, স্ট্রেপটোকক্কাস জাতীয় জীবাণুর কারণে ত্বকে কালচে ফোসকার মতো পোড়া দাগ হয়। নিয়মিত মলম লাগালে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে এই সমস্যা সেরে যায়।
  • ছুলি: বাচ্চাদেরও ছুলি হতে পারে। হালকা বা আবছা সাদা, গাঢ় বাদামি বিভিন্ন রঙের হয়। শিশুর ওজন বেশি হলে, থাইরয়েড বা ডায়াবিটিসের সমস্যা থাকলে এই সংক্রমণ বেশি হয়। নিয়মিত অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ক্রিম, পাউডার, সাবান ব্যবহারে ছুলি কমে। অনেক সময়ে চিকিৎসকেরা ফ্লুকোনাজ়োল অথবা কিটোক্যানাজ়োল জাতীয় ট্যাবলেট খাওয়ারও পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে জ়িঙ্ক পাইরিথিয়ন জাতীয় ক্রিম লাগানো যেতে পারে।

ডায়াপারে সমস্যা

শিশুর নিতম্ব, ঊরু, কুঁচকি ও যৌনাঙ্গের আশপাশের ত্বকে খসখসে বা লালচে ভাব, জ্বালা, ফুসকুড়ি ইত্যাদি দেখা যায়। ত্বকরোগ চিকিৎসক ডা. নীলেন্দু শর্মা বলছেন, “বাচ্চা দীর্ঘক্ষণ ভেজা ডায়াপারে থাকলে এ সমস্যা হয়।” নিম্নমানের ডায়াপারে হাওয়া চলাচলের সুবিধা থাকে না, যা থেকে বাচ্চার শরীরে ঘাম জমেও এই সমস্যা হতে পারে। একটানা দীর্ঘ সময় ডায়াপার ব্যবহার করলেও এই র‌্যাশ হতে পারে। ডা. শর্মার মতে বাচ্চাকে ডায়াপার না পরানোই সবচেয়ে ভাল। একান্তই পরাতে হলে তা যেন ভাল মানের ও ঠিক মাপের হয়। শিশুর অস্বস্তি কমাতে জ়িঙ্ক অক্সাইড জাতীয় মলম ব্যবহার করা যায়। তবে ডায়াপার র‌্যাশ থেকে সেকেন্ডারি স্কিন ইনফেকশন হতে পারে। সে ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

শ্বেতীর ভয়

বাচ্চার গালে বা গায়ে সাদা দাগ বা ছোপকে অনেক সময়ে শ্বেতী ভেবে ভয় পান অভিভাবকেরা। খেয়াল রাখবেন, শ্বেতী ছাড়াও ইডিয়োপ্যাথিক গাটটেট হাইপোমেলানোসিস (আইজিএইচ), পলিমর্ফিক লাইট ইরাপশন কিংবা ছুলির জন্যও ত্বকে সাদা দাগ হতে পারে। অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবেও শিশুর ত্বকে সাদা দাগ হয়। ডা. সন্দীপন ধর বলছেন, “আজকাল স্কুলে যায় এমন বাচ্চাদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে। খেলাধুলোর সূত্রে যে সব বাচ্চা অনেকক্ষণ রোদে থাকে কিংবা খোলা সুইমিং পুলে সাঁতার কাটে, তাদের মধ্যেও এই সমস্যা বাড়ছে। সাধারণ ভাবে কম ডোজ়ের স্টেরয়েড ক্রিম এক-দেড় মাস লাগালে এই সাদা দাগ কমে যায়।” দাগ যাতে ফিরে না আসে তার জন্য শিশুদের নিয়মিত এসপিএফ যুক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাচ্চার ত্বকে পোস্ট-ইনফ্লামেটরি হাইপোমেলানোসিসও সাধারণ সমস্যা। শিশুর গায়ের রং চাপা হলে এর উপসর্গ প্রকট হয়। শরীরের যে অংশ ঢাকা থাকে, সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে আসে না, সেখানে এই দাগ হয়। ফোঁড়া, ফুসকুড়ি, পোকার কামড়, পুড়ে যাওয়া, র‌্যাশ ইত্যাদি সেরে গেলেও ত্বকের উপরে থেকে যায় এই সাদা দাগ। কিছু ক্রনিক রোগ থেকেও এ ধরনের সমস্যা হয়। অসতর্ক হলে এর থেকে ছুলিও হতে পারে।

ঋতু পরিবর্তনের সময়ে

অতিরিক্ত গরমে যেমন বাচ্চাকে শুকনো রাখা দরকার, তেমন শীতে ত্বক যেন তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা না হারায়, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বর্ষায় ফাঙ্গাস বা ভাইরাস জাতীয় ত্বকের সমস্যা বেশি হয়। গরমে পোশাক নির্বাচনের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শীতে শিশুর ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য ময়শ্চারাইজ়ার, ক্রিম ব্যবহার করা জরুরি।

ডা. দিব্যেন্দু রায়চৌধুরী বলছেন, সাধারণত বাচ্চার অন্যান্য শারীরিক পরীক্ষা করার সময়েই তার ত্বক দেখে নেন চিকিৎসকেরা। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নিয়মিত ত্বক বিশেষজ্ঞ দেখানোর প্রয়োজন হয় না। তবে বাবা-মায়ের খেয়াল রাখা প্রয়োজন। বিভিন্ন ভাইরাল বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন হলে ভয়ের কিছু নেই। র‌্যাশের ধরন অনুযায়ী তার চিকিৎসা রয়েছে। বাচ্চা একটু বড় হলে, স্কুল যেতে শুরু করলে নানা রকম ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়। সে সময়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ছোট থেকেই বাচ্চাকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে শেখানো জরুরি।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Skincare Child Health

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy