ঠান্ডার পরে গরম পড়তে শুরু করলেই নানা অসুখবিসুখ মাথাচাড়া দেয়। প্রতি বছরই তা হয়। কিন্তু এ বছরে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। গরম পড়ার মুখেই ঘরে ঘরে জ্বর, বমি, পেটের সমস্যা এত মারাত্মক আকার নিয়েছে যে তা চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। ছোটরা শুধু নয়, ভুগছে বড়রাও। জ্বর হলে তা ছাড়ার নাম নেই, তাপমাত্রায় কমছেই না। একই সঙ্গে পেটের সমস্যা, ডায়েরিয়া হচ্ছে। খাওয়ার পরেই পেটে ব্যথা, বমিও হচ্ছে অনেকের। কী থেকে ছড়াচ্ছে এমন রোগ?
আবহাওয়ার পরিস্থিতি যখন অনুকূল থাকে না, তখন একগুচ্ছ ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া বা পরজীবীর দাপট বাড়ে। তা থেকেই নানা অসুখবিসুখ হয় বলে জানালেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার। তাঁর কথায়, ‘‘তাপমাত্রার পারদ চড়ছে। আবহাওয়ার অবস্থা এমন যে নানা ভাইরাসের প্রকোপ বেড়েছে। অতি সাধারণ অ্যাডিনোভাইরাসও তার রূপ বদলে ফেলেছে, সঙ্গে নোরোভাইরাস, রোটাভাইরাসেরও চরিত্রে বদল এসেছে। এখন যে কারণে জ্বর বা পেটের রোগ হচ্ছে তার কারণ ভাইরাস। টানা ১৫ থেকে ২০ দিন অবধিও জ্বর থাকতে দেখা যাচ্ছে।’’
কোন কোন ভাইরাসের দাপট বেড়েছে
পেটের রোগের মূল কারণ রোটাভাইরাস এবং ‘হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস-এফ’ (এইচএডিভি-এফ)। চিকিৎসক জানালেন, নোরোভাইরাসের কিছু প্রজাতির মিউটেশন (রাসায়নিক বদল) হয়েছে, ফলে ভাইরাস আরও বেশি সংক্রামক হয়ে উঠেছে। শরীরে নোরোভাইরাসের সংক্রমণ হলে মূলত গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিন্যাল সমস্যায় ভুগতে হয়। অর্থাৎ এর প্রভাবে অন্ত্রে প্রদাহ হয়। ঘন ঘন বমি ও ডায়েরিয়ার সমস্যা শুরু হয়। একই উপসর্গ দেখা যায় রোটাভাইরাসের ক্ষেত্রেও। অস্বাস্থ্যকর, দূষিত খাবার ও জল থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। পাঁচ বছরের নীচে শিশুদের রোটাভাইরাসের সংক্রমণ হলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যনালিতে সংক্রমণ হতেও দেখা যায়। ফলে ডায়েরিয়া, বমি থামতে চায় না।
আরও পড়ুন:
সাধারণত দেখা যায় নোরোভাইরাস বা রোটাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শরীরে প্রভাব পড়তে শুরু করে। সেই প্রভাব তিন দিনের বেশি থাকতে পারে। ইদানীংকালে পেটের সমস্যা টানা ১০ থেকে ১৫ দিন অবধি থাকতেও দেখা যাচ্ছে। লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে বারবার মলত্যাগ, পেটে ব্যথা, বমি ভাব, জ্বর, মাথা ধরা, গা ব্যথা।
কী ভাবে সাবধানে থাকবেন?
রাস্তার কোনও রকম খাবার, জল নরম পানীয়, লস্যি-শরবত খাওয়া চলবে না। চিকিৎসক জানাচ্ছেন, ছোঁয়া থেকেও এই রোগ ছড়ায়। ভাইরাস রয়েছে এমন কোনও বস্তুতে হাত দিয়ে সেই হাত না ধুয়ে মুখে দিলে কেউ সংক্রমিত হতে পারেন। আক্রান্তের সঙ্গে একই পাত্রে ভাগ করে খাবার বা জল খেলেও হতে পারে রোগ। তাই খাওয়ার আগে অবশ্যই হাত ধুতে হবে, বাইরে থেকে ফিরে হাত-মুখ না ধুয়ে খাবারে হাত দেবেন না।
বাজার থেকে কিনে আনা সব্জি, ফল বা কাঁচা মাছ-মাংস ভাল করে ধুয়ে তবে রান্না করতে হবে। শাকপাতা নুন দেওয়া গরম জলে ধুয়ে রান্না করা উচিত।
আক্রান্তের হাঁচি-কাশি বা বর্জ্য থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে। কাজেই বাড়িতে কেউ সংক্রমিত হলে তাঁকে আলাদা রাখাই শ্রেয়।
ফ্রিজে দীর্ঘ দিন রেখে দেওয়া বাসি খাবার, বাসি ভাত খেলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। কেটে রাখা ফল ভুলেও খাবেন না।
অ্যাডিনোভাইরাস, রোটাভাইরাস বা নোরোভাইরাস যে ভাবে তার রূপ বদলাচ্ছে, তাতে অন্ত্রে বিষক্রিয়া ঘটতে পারে। যে কারণে রোগীর ঘন ঘন বমি হয়, রক্ত আমাশয় দেখা দেয়। শরীর ধীরে ধীরে জলশূন্য হতে থাকে। মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগের ক্ষেত্রে এই রোগ তিন দিনে সেরে গেলেও, অনেকের ক্ষেত্রে এক মাস পর্যন্ত রোগের লক্ষণ শরীরে দেখা যায়। তাই আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে বিপদ আরও বাড়বে। কারণ ভাইরাসঘটিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। বমি ও ডায়েরিয়া বড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি।