রাত ঠিক ৩টে বা ৪টে। ভোররাত হলেই চোখের পাতা আপনা থেকে খুলে যায়। প্রায় প্রতি দিনই রাত ৩টে থেকে ৪টেয় ঘুম ভাঙে। ব্রাহ্মমুহূর্তে উঠে পড়ার অভ্যাস ভাল। তবে রোজই যদি ওই ৩টে থেকে ৪টের মধ্যে আপনা থেকেই ঘুম ভেঙে যায়, তা হলে বুঝতে হবে, ব্যাপারটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। অনেকেই ভাবেন এর নেপথ্যে নানা অতিলৌকিক কারণ রয়েছে, তবে বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি পুরোপুরিই শরীর নির্ভর। ঠিক ওই সময়তেই শরীরের অন্দরমহলে নানা অদলবদল ঘটে। সঙ্কেত দিতে থাকে মস্তিষ্ক। সেটি কী, তার ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকেরা।
‘ঘুম’ বিষয়টাকে যে তলিয়ে দেখা ভাল, তা বুঝতে কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা অজস্র কাজ করেছেন ও করে চলেছেন। ঘুম নিয়ে এখন যে এত সমস্যা, সে জন্য আরও গভীরে গিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজনও হচ্ছে। জানার চেষ্টা হচ্ছে, ঘুমোনোর সময়ে মস্তিষ্ক ঠিক কী করে। ঘুম না আসার কারণটাই বা কী? ঘুমের সময় আপাতদৃষ্টিতে কাউকে অজ্ঞান বলে মনে হলেও, তাঁর মস্তিষ্কের ইন্দ্রিয়-অনুভূতির ‘জানলা’টি যে বেশ খানিকটা খোলা থাকে, তা এখন অজানা নয়। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা নিদ্রা ও জাগরণের বিষয়টি নিয়ে জোরদার গবেষণা চালাচ্ছেন।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের মতে, ঘুম হল পর্যায়বৃত্ত। হিসেব মতো ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে ৮ ঘণ্টার ঘুম হলে, বাকি ১৬ ঘণ্টা জেগে কাটাতে হয়। এর কমবেশিও হয়। ঘুম মানে সাময়িক ভাবে শরীর অচেতন থাকে, তবে মস্তিষ্কের কিছু এলাকা সক্রিয় থাকে। ঘুমোনোর সময়ে মস্তিষ্কের যে দু’টি অংশ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে তা হল –‘হাইপোথ্যালামাস’ ও ‘ব্রেন স্টেম’। এই দুই অংশের স্নায়ুকোষই ঠিক করে, ঘুম কত ক্ষণ হবে আর জেগে কত ক্ষণ কাটাতে হবে। দুই এলাকার স্নায়ুকোষই পর্যায়ক্রমে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় হয়ে নিদ্রা ও জাগরণের বিষয়টির দেখাশোনা করে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ আর ‘ব্রেন স্টেম’-এর বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষ উত্তেজনার সঙ্কেত পাঠাতে থাকে। যদি স্নায়ুকোষ অধিক সক্রিয় ও উত্তেজিত থাকে, তা হলে ঘুমের সঙ্কেত আর আসে না। তখন জেগেই কাটাতে হয়। এই উত্তেজনা তৈরি হয় বিশেষ কিছু কারণে। যেমন, শোয়ার আগে বেশি মোবাইল দেখলে, কফি বা চা পানে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের অত্যধিক ক্ষরণে। ‘স্ট্রেস হরমোন’ কর্টিসলের ক্ষরণ বাড়ে ওই সময়টাতেই। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, কর্টিসলের মাত্রা সারা দিন কম থাকে, মধ্যরাতের পর থেকে ধীরে ধীরে তার ক্ষরণ বাড়ে। যাঁরা খুব বেশি মানসিক চাপে থাকেন অথবা উদ্বেগে ভোগেন, তাঁদের এই হরমোন ক্ষরণের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই ওই সময়টাতেই ‘স্লিপ সাইক্ল’-এ বদল আসে। ফলে ঘুম ভেঙে যায়।
আরও পড়ুন:
কারণ আরও আছে। হাইপারগ্লাইসেমিয়াও আরও একটি কারণ। ওই সময়েই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। প্রতি ডেসিলিটার রক্তে শর্করার মাত্রা ১০০ মিলিগ্রামের বেশি হলে তাকে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে। আসলে গ্লুকোজ ভেঙে শক্তি তৈরি হয়। ভোররাতের দিকে যদি কর্টিসল ও অ্যাড্রিনালিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে। যাঁরা রাতে ঘুমোনোর সময়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা করেন অথবা চা-কফি বা অ্যালকোহল বেশি পরিমাণে খান, তাঁদের শরীরে হরমোনের তারতম্য বেশি হয়।
ঘুমের জন্য দায়ী হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ এই সময়ে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং শরীর জেগে ওঠার সঙ্কেত পেতে থাকে। যদি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার ৬ ঘণ্টা আগেও কেউ কফি খান বা একটানা মোবাইল দেখতে থাকেন, তা হলে মেলাটোনিনের ক্ষরণে দ্রুত বদল আসবে, যা নিদ্রা ও জাগরণের পর্যায়ক্রমটাই নষ্ট করে দেবে।
সে কারণেই রাতে শোয়ার আগে মেডিটেশন বা ধ্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেটি নিয়মিত করলে উদ্বেগ কমবে, ঘুমও ভাল হবে। আর শুতে যাওয়ার অন্তত ঘণ্টা দুয়েক আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে। এতে হজমের গোলমাল হবে না, ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটবে না।