আলোর ছটায় চুল গজানোর উপায় খুঁজে পেয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা। টাকে আলো ফেললেই যে চুল গজাবে, সে বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত তাঁরা। আর হবে না-ই বা কেন! আলোকরশ্মি দিয়ে যখন ক্যানসার কোষ ফুঁড়ে দেওয়ার উপায় পাওয়া গিয়েছে, তখন চুল তো নস্যি! চুল পড়া ও চুল পাকা— এই দুই সমস্যারই পাকাপাকি সমাধান করবে ‘ইনফ্রারেড এলইডি লাইট থেরাপি’, এমনটাই দাবি করেছেন কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকেরা। ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে এই বিষয়ে গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছে।
নির্ভুল লক্ষ্যে ছুটে গিয়ে কোষে কোষে উদ্দীপনা তৈরি করতে আলোর চেয়ে জোরালো হাতিয়ার আর হয় না। তাই নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি দিয়েই চুল পড়ার সমস্যার সমাধান করতে চলেছেন কোরিয়ার গবেষকেরা। চুলের গোড়ায় আলো ফেললেই সেখানকার কোষগুলিতে উদ্দীপনা তৈরি হবে। ক্ষয়ে যাওয়া রঞ্জকগুলি সজীব হতে থাকবে। মৃতপ্রায় কোষগুলিতে দেখা দেবে প্রাণের স্পন্দন। গবেষণাগারে মানুষের চুলের উপরেই পরীক্ষা করেই এমন দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রেই সাফল্য এসেছে।
আরও পড়ুন:
টাকের ব্যাপারে বুঝতে গেলে চুলের গোড়ার কথা একটু জানতে হবে। জন্মের সময় মানুষের মাথার ত্বকে প্রায় এক লক্ষ চুলের গোড়া বা হেয়ার ফলিকল থাকে। একটি চুলের জীবনচক্রের তিনটি দশা। প্রথম তিন বছর হল অ্যানাজেন দশা। নতুন চুল বেড়ে ওঠার সময়। এর পরে ২-৪ সপ্তাহের একটা স্বল্পস্থায়ী পর্যায় হল ক্যাটাজেন। এর পরে ৩-৪ মাসের টেলোজেন দশা শেষ করে চুল পড়ে যায়। আবার নতুন চক্রের চুল এসে শূন্যস্থান পূরণ করে। বয়স যত বাড়ে, ততই অ্যানাজেন দশার সময় কমে এবং নতুন চুল তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটিও ধীর গতি প্রাপ্ত হয়। তবে শুধু বয়স বাড়লেই যে চুল পড়বে বা টাক হবে, তার কোনও মানে নেই। এখন কমবয়সিদেরও মাথাজোড়া টাক, অকালেই একমাথা পাকা চুল। এর নেপথ্যে রয়েছে হরমোনের খেলা। দেখা গিয়েছে, অ্যান্ড্রোজেন, ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন হরমোনের তারতম্য হলে এই সমস্যা দেখা দিতে থাকে। প্রতিটি চুলের গোড়ায় থাকে ডারমাল প্যাপিলা নামক এক রকমের কোষ। চুলের বেড়ে ওঠা ও ঘনত্ব বৃদ্ধিতে এই কোষটির বিশেষ ভূমিকা আছে। কোষটি যত বুড়িয়ে যেতে থাকে, ততই এর থেকে এক রকম উৎসেচকের ক্ষরণ হতে থাকে, যার নাম বিটা-গ্যালাক্টোসাইড। এই উৎসেচকের পরিমাণ যত বাড়ে ততই চুলের গোড়া দুর্বল হতে থাকে, চুলের স্বাভাবিক রংও ফিকে হতে থাকে। তাই এই কোষটিকে যদি কোনও ভাবে জীবিত রাখারই চেষ্টা করছেন গবেষকেরা। আর সেটাই সম্ভব হবে আলোর থেরাপি দিয়ে।
গবেষকেরা ৭৩০থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর রশ্মি চুলের গোড়ায় ফেলে দেখেছেন, এই আলোর তাপ ও তীব্রতায় ডারমাল প্যাপিলা কোষগুলি উজ্জীবিত হয়। মৃত কোষগুলিরও পুনরুজ্জীবন ঘটে। শুধু তা-ই নয়, এই আলোতে চুলের গোড়ায় থাকা রঞ্জক কোষগুলিও সতেজ হয়ে ওঠে। প্রযুক্তিটিকে গবেষকেরা বলছেন ‘ফোটোবায়োমডুলেশন’ থেরাপি। এতে অনেকগুলি কাজ একসঙ্গে হয়। আলো মাথার ত্বকের রক্তনালিগুলিকে প্রশস্ত করে, ফলে চুলের গোড়ায় পুষ্টি এবং অক্সিজেন সরবরাহ বেড়ে যায়। এই বিশেষ এলইডি প্রযুক্তি কেবল চুল পড়া রোধ করে না, বরং চুলের রং ফিরিয়ে আনতেও বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। চুল গজানোর ওষুধ বা লেজ়ার থেরাপির চেয়ে এলইডি থেরাপি অনেক বেশি কার্যকরী ও নিরাপদ হবে বলেই দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে ডিভাইসটি কবে বাজারে আসবে, সে নিয়ে এখনও কিছু জানানো হয়নি।