রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য ফাস্টিং, পিপি সুগারের হিসেব রাখা, এইচবিএওয়ানসি পরীক্ষা ইত্যাদি ধীরে ধীরে পুরনো পদ্ধতি হয়ে যাচ্ছে। আঙুলের ডগায় সুচ ফুটিয়ে সুগার মাপার গতানুগতিক প্রক্রিয়ার বাইরে আরও অনেক পদ্ধতি চলে এসেছে, যাতে রক্তপাত ঘটাতেই হবে না। তার মধ্যে একটি সুগার মাপার প্যাচ, এবং অন্যটি স্মার্টওয়াচ। স্বাস্থ্যের হালহকিকত জানাতে স্মার্টওয়াচ এখন সকলেরই পছন্দ। অনেকের হাতেই দেখবেন স্মার্টঘড়ি বাঁধা রয়েছে। এর নানা উন্নত সংস্করণ এসে গিয়েছে। তেমনই একটি হল সুগার মাপার হাতঘড়ি। যেটি আসলে গ্লুকোজ় মনিটরিং ডিভাইস, যা হাতে পরলে সুগারের ওঠানামা বোঝা যাবে বলে দাবি করা হয়েছে।
হাতঘড়ি কী ভাবে রক্তে শর্করা মাপবে?
রক্তে শর্করার মাত্রা কতটা, তা বোঝার চিরন্তন পদ্ধতি হল আঙুল থেকে সামান্য রক্ত নিয়ে গ্লুকোমিটারে ফেলে দেখা। কিন্তু স্মার্টওয়াচে তা করতে হবে না। রক্তপাত না ঘটিয়েও সুগার মাপার দুই প্রযু্ক্তি রয়েছে এতে। একটি হল অপটিক্যাল সেন্সর, যা ত্বকের গভীরে লেজ়ার রশ্মি পাঠিয়ে শর্করার পরিমাণ মাপে। আলোর তরঙ্গের প্রতিফলন দেখে সেটি রিপোর্ট দেয়, রক্তে ঠিক কতটা গ্লুকোজ় জমা হয়েছে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হল তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ যা রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে রক্তে জমা গ্লুকোজ়ের ঘনত্ব পরিমাপ করার চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন:
স্মার্টওয়চ হাতে পরে থাকলে তা সর্ব ক্ষণ ত্বকের সংস্পর্শে থাকে, তাই নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বয়ংক্রিয় ভাবে সেন্সর ব্যবহার করে ডেটা সংগ্রহ করে। খাবার খাওয়ার আগে ও পরে, ব্যায়াম করার পরে রক্তে সুগারের মাত্রার যে পরিবর্তন হয়, তা-ও মাপে ওই যন্ত্র। সেই অনুযায়ী গ্রাফ তৈরি করে ও রক্তে শর্করার ওঠানামার রেকর্ড রাখে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে স্মার্টওয়াচ জানাতে পারে যে, ডায়াবিটিস বাসা বেঁধেছে কি না অথবা আপনি প্রি-ডায়াবেটিক পর্বে রয়েছেন কি না।
ডায়াবিটিস মাপার স্মার্টওয়াচের দাম শুরু হয় ১০০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে। তবে আরও উন্নত প্রযুক্তির ঘড়ি চাইলে তার দাম ২০ হাজারের বেশি। ৫০ হাজার থেকে ৯০ হাজারের মধ্যেও স্মার্টওয়াচ আছে, যেগুলি রিয়্যাল টাইম ডেটা দেয়।
লাভ কতটা? আদৌ কি কার্যকরী?
ফাস্টিং সুগারের মাপ সবসময়ে সঠিক আসে না। রোগী আগের দিন কতটা খাচ্ছেন তার উপরে নির্ভর করে অনেকটাই। আবার এইচবিএওয়ানসি পরীক্ষার গড় মাপ বদলাতে থাকে। কারণ রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির থাকে না, তা ওঠানামা করে। সে কারণে এখন শর্করার পরিমাপ দেখা হয় ‘টাইম ইন রেঞ্জ’-কে মাথায় রেখে। লক্ষ রাখা হয় সারা দিনের মধ্যে শর্করার মাত্রা ঠিক কেমন থাকে। সেটি পরিমাপের জন্যই এসেছে স্মার্টওয়াচের মতো কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ় মনিটরিং (সিজিএম)ডিভাইস। তবে এর সীমাবদ্ধতাও আছে।
আরও পড়ুন:
স্মার্টওয়াচ ডায়াবিটিস মাপতে কতটা কার্যকরী, তা নিয়ে নানা রকম মতামত আছে চিকিৎসকদের মধ্যে। চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার জানাচ্ছেন, আঙুলের রক্ত আর ত্বকের ভিতরে লেজ়ার রশ্মির প্রতিফলন ঘটানো— এই দুই প্রক্রিয়ার ফলের মধ্যে পার্থক্য আসবেই। সুগারের সামান্য ভুল রিডিং ডায়াবিটিস রোগীর জন্য মারাত্মক হতে পারে।
আমেরিকার ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (এফডিএ) সম্প্রতি জানিয়েছে, স্মার্টওয়াচ বা স্মার্ট রিং সরাসরি সুগার মাপার জন্য অনুমোদিত নয়। এই যন্ত্রগুলি রিপোর্ট দেয় অনুমানের ভিত্তিতে। স্মার্টওয়াচ পরে থাকলে সর্ব ক্ষণ সুগারের ওঠানামার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। তবে সেই হাতঘড়ি কিনতে হবে ব্র্যান্ড ও প্রযুক্তি দেখে। কম দামের এমন অনেক হাতঘড়ি বেরিয়ে গিয়েছে, যেগুলি রিডিং ঠিকমতো দেয় না। ডায়াবিটিস মাপতে কেবল স্মার্টওয়াচের উপর ভরসা করলেই চলবে না। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানোও জরুরি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। এফডিএ আরও জানাচ্ছে, ‘সিভিয়ার হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ হয়েছে কি না বা তার আশঙ্কা আছে কি না, এমন তথ্য কিন্তু স্মার্টওয়াচে নির্ভুল ভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই কেউ যদি চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়েই কেবলমাত্র ডেটা দেখে ওষুধ খেতে বা ইনসুলিন নিতে শুরু করেন, তা হলে বিপদ ঘনাতে দেরি হবে না।