আচমকাই তীব্র জ্বর। গলা ব্যথার সঙ্গে শুরু হচ্ছে কাশিও। তীব্রতা এতটাই বেশি যে কাশতে কাশতে ঘুম থেকে উঠে বসতে হচ্ছে। সেই দমকা কাশি ভোগাচ্ছে এক থেকে দেড় মাস। বসন্তের শেষ লগ্নে আচমকাই প্রায় ঘরে ঘরে এমন অসুস্থতা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনে আবহাওয়ার তারতম্যে ভাইরাসের বাড়বাড়ন্তের কারণেই বয়স্ক থেকে শিশু, সকলেই আক্রান্ত হচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসকের চেম্বারে প্রতিদিনই জ্বর-কাশির রোগী বাড়ছে। প্রথম থেকেই জ্বরের মাত্রা বেশি থাকছে। সঙ্গে গায়ে, হাতে বা পায়ে ব্যথা। সংক্রামক রোগের চিকিৎসক যোগীরাজ রায় জানাচ্ছেন, ভাইরাসের আক্রমণে যে অসুস্থতা, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। তার সঙ্গে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণও বেড়েছে। যোগীরাজের কথায়, “দূষণ ও আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে অ্যালার্জির সমস্যা থাকা রোগীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, “কোন ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হয়েছে, তা জানতে ভাইরাল-প্যানেল পরীক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু সকলের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হচ্ছে।”
বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রের খবর, টানা দু’-তিন দিন তীব্র জ্বর দেখলে ভয়ে অনেক রোগীই ভর্তি হচ্ছেন। তাঁদের ভাইরাল প্যানেল পরীক্ষায় অ্যাডিনো ও রাইনো ভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধি হয়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “অ্যাডিনো ভাইরাসে আক্রান্তই বেশি। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। অন্তত তিন দিন তা থাকছে। গলাতেও ভাল রকমের সমস্যা হচ্ছে।” চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, গলার ব্যথা এতটাই হচ্ছে যে খাবার গিলতেও কষ্ট হচ্ছে। অনেকে সেই কষ্ট থেকে রেহাই পেতে উষ্ণ গরম জল বা খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু উপশম হচ্ছে না। যোগীরাজের কথায়, “অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ওই ব্যথা কমানো সম্ভব। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া যাবে না।”
অ্যাডিনো বা রাইনো, যে ভাইরাসই হোক না কেন, তাতে প্রথমে গলা ও শ্বাসনালির উপরের অংশ (আপার রেসপিরেটরি ট্রাক্ট) সংক্রমিত হয়। সেই সংক্রমণ কমে গেলেও অনেকের ক্ষেত্রেই শ্বাসনালির ব্রঙ্কাস প্রভাবিত হয়, জানান নারায়ণ। তিনি বলছেন, “একে বলা হয় হাইপার সেনসেটিভ ব্রঙ্কাস। এর কারণে শুকনো কাশি শুরু হয়। যা অনেক দিন থেকে যাচ্ছে।”
শীত থেকে গরমে বা আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে ভাইরাস সহজে ছড়ায়। তাতে ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যাডিনো, রাইনো, আরএসভি-র মতো ভাইরাল সংক্রমণের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় বলেই জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিষয়ক চিকিৎসক অনির্বাণ দলুই। তিনি বলছেন, “ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন ছড়াতে শুরু করলে আচমকাই অনেক মানুষকে একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। সেটাই এখন হচ্ছে সম্ভবত।” তিনি আরও জানাচ্ছেন, কম ঘুম, মানসিক চাপ, দূষণ কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকেরই কম থাকায় সহজে ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। যা দ্রুত ছড়াচ্ছে।
তীব্র জ্বরের সঙ্গে ডায়রিয়া নিয়ে অনেক শিশু রোগী আসছে বলে জানাচ্ছেন ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের অধ্যক্ষ চিকিৎসক জয়দেব রায়। তিনি বলেন, “কারও কারও শ্বাসকষ্টও থাকছে। তাদের নেবুলাইজ়ার দিতে হচ্ছে। তবে এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
ধূমপান না করা, দূষণ থেকে বাঁচতে মাস্কের ব্যবহার, পর্যাপ্ত জল পান ও বিশ্রাম, জ্বরে প্যারাসিটামল খেলেও অন্য কোনও কিছুর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো প্রতিরোধ ব্যবস্থা মেনে চলারই পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)