উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা থেকে ব্যস্ত জীবনের তাড়া, মানসিক চাপ থেকে অবসাদ— নতুন প্রজন্মের যাপনে নীরবতা, শান্তির অভাব যেন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও হাজারো দুশ্চিন্তা মাথায় ঘোরাফেরা করে। মাথার বিশ্রাম যেন দূরের কল্পনা। কিন্তু এমন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরবর্তীতে মস্তিষ্কের নানা রোগ গ্রাস করতে পারে। তাই সময় থাকতেই সতর্ক হয়ে যাওয়া উচিত।
সুরাহা মিলতে পারে মাত্র ১৫ মিনিটে। ২৪টা ঘণ্টা থেকে ১৫ মিনিট বার করা কষ্টকর নয়। আর এই সময়ে নিজেকে ধ্যানে মগ্ন রাখতে হবে। এই কৌশল ধীরে ধীরে চাপ কমাতে, মন শান্ত করতে এবং চিন্তার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। বাইরের যে কোনও পরিস্থিতির প্রতি ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া বদলাতেও সাহায্য করে ধ্যানের অভ্যাস। নিয়মিত অনুশীলন করলে মানুষ ধীরে ধীরে কঠিন পরিস্থিতিতেও স্থির হতে শেখেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আরও পরিষ্কার ভাবে। 'হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং' জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, ধ্যান করলে মানসিক চাপ, উদ্বেগের রোগ ইত্যাদি কমানো সহজ হয়ে যায়। সামগ্রিক ভাবে সুস্থ হয় মানসিক অবস্থা।
ধ্যান করলে মানসিক চাপ, উদ্বেগের রোগ ইত্যাদি কমানো সহজ হয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত
কী ভাবে করতে হবে ধ্যান? শিখে নিন ধাপে ধাপে—
১. এমন একটি জায়গা বেছে নিন, যেখানে কিছু ক্ষণ শান্তিতে বসতে পারবেন। ঘর একেবারে নিঃশব্দ হতে হবে, এমন নয়। কিন্তু এমন জায়গা হওয়া দরকার, যেখানে আপনি অন্তত ১৫ মিনিট নিজের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারবেন। জানালার ধার বা ব্যালকনি অথবা নিজের ঘর, যে কোনও জায়গা বেছে নিতে পারেন।
২. আরাম করে বসুন। মেঝেতে পা গুটিয়ে বসতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। চেয়ারে বসেও ধ্যান করা যায়। শুধু মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে।
৩. এ বার চোখ বন্ধ করে মন দিন নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে। বাতাস কী ভাবে শরীরে প্রবেশ করছে, কী ভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে, শুধু সেটিই পর্যবেক্ষণ করুন। শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই, শুধু অনুভব করুন। শ্বাসের উপর মন রাখার এই কৌশল আসলে মস্তিষ্ককে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনার এক সহজ উপায়।
কী ভাবে করতে হবে ধ্যান? ছবি: সংগৃহীত
৪. কিছু ক্ষণ পর থেকেই টের পাবেন, মন বার বার অন্যত্র চলে যাচ্ছে। কখনও কাজের কথা, কখনও পুরনো স্মৃতি, কখনও অকারণ চিন্তা, কখনও বা কোনও কথোপকথন মনে পড়ছে। আর এখানেই অনেকে ভাবেন, তাঁরা ভুল করছেন, ধ্যানে উপকৃত হচ্ছেন না। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলেন, এটিই স্বাভাবিক। ধ্যানের আসল কাজই হল ভবঘুরে মনকে এক জায়গায় নিয়ে আসা। জোর করে নয়, ধীরে ধীরে শ্বাসের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেই হবে। তাতেই বুঝবেন, কাজ হচ্ছে।
৫. এই ১৫টি মিনিটে কোনও অলৌকিক পরিবর্তন হবে না। কিন্তু নিয়মিত করলে ধীরে ধীরে মনের চাপ কমে, মনোযোগ বাড়ে, ঘুম ভাল হতে পারে এবং মানসিক অস্থিরতাও কমতে শুরু করে। মনে হবে, মাথার ভিতরে জমে থাকা অতিরিক্ত কোলাহল যেন খানিকটা কমে গিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ধ্যানের অর্থ কোনও প্রকার চিন্তা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং, হাজারো চিন্তার মাঝে মনের ভিতরে শান্ত আশ্রয় খুঁজে নেওয়া।
কেবল ১৫ মিনিটই যথেষ্ট কেন?
ধ্যান মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির ভাবে বসে মনোনিবেশ করা— এই ধারণা মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছে। আর এর ফলেই সাধারণ জীবনে প্রবেশ করতে পারেনি ধ্যান। এই কৌশলও নিজের মতো করে, নিজের সুবিধা অনুযায়ী কী ভাবে ব্যবহার করা যায়, তা জানা দরকার। দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই, বরং প্রতি দিন অল্প সময় ব্যয় করলেই তা কার্যকর হতে পারে। কারণ, ধ্যান কোনও এক দিনের কাজ নয়, এটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি অভ্যাস।