কানের ময়লা— এই ধারণাটাই আসলে একটা ‘মিথ’। কানের ময়লা বলে যেটিকে আমরা ভুল করি, আসলে তা হল ওয়্যাক্স। শরীরের সিবেসিয়াস গ্রন্থি থেকে যে তৈলাক্ত পদার্থ বেরোয়, তারই একটা পরিবর্তিত রূপ হল এই ওয়্যাক্স, যা কানের ভিতরে থাকাটা আসলে অত্যন্ত দরকারি। কেন দরকারি এই ওয়্যাক্স? একটি নির্দিষ্ট পিএইচ রয়েছে এর, যা কানের ভিতরকার স্বাস্থ্য ঠিক রাখে স্বাভাবিক ভাবে। অ্যান্টিব্যাক্টিরিয়াল, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিভাইরাল— কানের অভ্যন্তর ভাগ সুরক্ষিত রাখার জন্য এই ওয়্যাক্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
স্বাভাবিক পদ্ধতি
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃত কোষ বা চামড়া, চুল ইত্যাদি সেই ওয়্যাক্সের সঙ্গে মিশে একটি মণ্ড তৈরি করে, যা অনেক সময়ে অস্বস্তির সৃষ্টি করে। কানের বাইরে বেরিয়ে আসতেও চায়। বেশির ভাগ সময়ে স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই সপ্তাহখানেক বা মাসখানেক পর পরই এটি কানের বাইরে পড়ে যায় আপনা থেকে। কানের মধ্যে একটি এস্ক্যালেটর নিজে থেকেই এই ময়লা বার করে দেওয়ার কাজটি করে থাকে। খাবার চিবোনো বা কথা বলার সময়ে হয় এটি, আমাদের অজান্তে। কটন বাড কানের মধ্যে প্রবেশ করালে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। এস্ক্যালেটর থেকে ময়লা সরে যায়, আরও ভিতরে ঢুকে যায় তা। তাই চিকিৎসকেরা সাবধান করেন, ইয়ার বাড বা অন্য কোনও জিনিস কানের ফুটোর মধ্যে প্রবেশ করানো উচিত নয়। এতে সমস্যা বাড়ে বই কমে না।
ইএনটি চিকিৎসক ডা. অর্জুন দাশগুপ্ত বললেন, “বাজারচলতি ইয়ার বাড বক্সগুলিতে সতর্কতা হিসেবে লেখা থাকে, কানের ভিতরেকোনও জিনিস প্রবেশ করাবেন না। ইয়ার ওয়্যাক্সের প্রয়োজনীয়তাআছে, সেটা বার করে দিলে ব্যাক্টিরিয়াল বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি, কান যারা খোঁচায়, তাদেরই কানে ব্যথা, চুলকানি ইত্যাদি বেশি হয়। আর যদি অসাবধান থাকে, কানের পর্দা ফুটো করে এই বাড ব্রেন অবধি চলে যেতে পারে।”
অস্বস্তি দূর করতে
তা হলে কানের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হলে উপায়? একটি প্রচলিত পদ্ধতি হল সিরিঞ্জিং। অর্থাৎ সিরিঞ্জের সাহায্যে জোরালো জলের তোড়ে কানের ভিতরটা ওয়াশ করা। তবে এই পদ্ধতিতে ইনফেকশনের ঝুঁকি থেকে যায়। ডা. দাশগুপ্ত বললেন, “আমরা সাধারণত এটা করি না। কানের পর্দার পিছনে একটা ফুটো থাকে, জল দিলে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমরা সাধারণত মাইক্রোসাকশন করি। অর্থাৎ মাইক্রোস্কোপের তলায় রেখে হুভারের মতো সাকশন করে বার করে নিই। তার আগে ড্রপ দিয়ে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে ভাল হয়। অনেক সময়ে আলো ফেলে চোখে দেখেও ধীরে ধীরে ময়লা বার করে আনি। সেফটিপিন, ধাতব কানখুশকি, বাডস কানের ভিতরে দেওয়া বন্ধ করলে অনেক সমস্যা এড়ানো যায়।” ডা. দাশগুপ্ত আরও জানালেন, অনেক বয়স্ক মানুষ মনে করেন, কানে ময়লা জমার জন্য তাঁরা কানে কম শুনতে পাচ্ছেন। আসলে তাঁদের নার্ভ শুকিয়ে যাচ্ছে, সে জন্য কানে কম শুনছেন।
ঘরোয়া পদ্ধতি
কানের ভিতরকার অস্বস্তি অনেক সময় ড্রাইনেস থেকে তৈরি হয়। স্নানের আগে সামান্য উষ্ণ তেল কানের ভিতরে কয়েক ফোঁটা দিলে ভিতরকার ময়লা নরম হয়ে আসে ও আপনা থেকেই বেরিয়ে যায়। কানের ময়লা সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। আর সমস্যা গুরুতর মনে হলে নিজে না খুঁচিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই শ্রেয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)