পুণের ব্যবসায়ীপুত্র কেতন অগ্রবালের বাগ্দত্তা সিয়া গয়ালের সঙ্গে তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধরির তিন বছর ধরে সম্পর্ক। দু’জনের সম্পর্কের বিষয়টি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেতন বা তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। কেতনের সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে বাগ্দানপর্ব সেরে ফেলেছিলেন সিয়া। তার পর থেকে কেতনের বাড়িতে যাতায়াত ছিল তাঁর। কেতনের মা জানিয়েছেন, সিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন। বিয়ের কথা পাকা হয়ে যাওয়ার পর সিয়াকে নিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। এ ছাড়াও তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েক বার রেস্তরাঁয় নৈশভোজে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যেরা। কিন্তু সেই মেয়েই যে এ কাজ করবেন, ভাবতে পারছেন না। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন কেতনের মা।
তদন্তকারী সূত্রের খবর, সিয়ার ফোন কলের রেকর্ডের সূত্র ধরেই এই খুনের কিনারা করা হয়েছে। সিয়ার ফোন থেকেই তাঁর প্রেমিক চেতন সম্পর্কে জানতে পারেন তদন্তকারীরা। এর পর থেকেই তদন্ত অন্য দিকে মোড় নেয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিয়ার ফোনে একই নম্বরে গত ছ’মাসে কয়েক হাজার বার ফোন করা হয়েছিল। সেই নম্বরের সূত্র ধরেই চেতনের হদিস মেলে। আর এই ঘটনার সঙ্গে চেতনের যোগসূত্র রয়েছে বলেও সন্দেহ হয় তদন্তকারীদের।
সূত্রের খবর, সিয়া এবং চেতনের মধ্যে তিন বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। গত জানুয়ারি থেকে জুনে তাঁদের দু’জনের মধ্যে ২৩৮ ঘণ্টায় ২০০৪ চার বার ফোনে কথা হয়। শুধু তা-ই নয়, গত ছ’মাসে পরস্পরের সঙ্গে ফোনে, হোয়াট্অ্যাপে এবং ফেস টাইমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কোনও কোনও কথোপকথন দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। ডিজিটাল তথ্য ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে, কেতনকে পুরোপুরি পরিকল্পনা করে খুন করা হয়েছে। আর সেই খুনের পরিকল্পনা হয়েছে বেশ কিছু দিন ধরে। জুনের ১৬ এবং ১৭ তারিখের মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল কেতনকে খুনের পরিকল্পনার বিষয়টি।
পুলিশ সূত্রে খবর, ১৮ জুন কেতনকে লোনাভালার লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যান সিয়া। দু’জনে যখন ট্রেক করছিলেন, তাঁদের অনুসরণ করছিলেন চেতন। ওই দিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা ৪০ পর্যন্ত চেতনের ফোনের ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। শুধু তা-ই নয়, ঘটনার দিন ফোন নিজের দোকানে রেখে যান চেতন। পরিবর্তে তাঁর দোকানের এক কর্মীর ফোন সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাঁর গতিবিধি যাতে ট্র্যাক করা না যায়, সে কারণেই নিজের ফোন দোকানে রেখে গিয়েছিলেন সিয়ার প্রেমিক। আগেই লোহাগড় দুর্গে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। দুর্গের সিসিটিভি পরীক্ষা করতেই দেখা যায় এক যুবক হুডি পরে হেঁটে যাচ্ছেন। সিয়া এবং কেতনের ঠিক পিছনেই ছিলেন তিনি। হুডিটা এমন ভাবে টানা ছিল যে, ওই যুবকের মুখ স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছিল না। প্রচণ্ড গরমে হুডি কেন? এই পোশাক থেকেই সন্দেহ হয় তদন্তকারীদের। তার পর আরও কয়েকটি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়, ওই ব্যক্তি চেতন চৌধরি।
আরও পড়ুন:
-
‘বাবা আমাকে বাঁচাও, চিৎকার করছিল মেয়ে!’ অপহরণ রুখতে পারেননি গাড়ির পিছনে ছুটেও, দিল্লির ধর্ষণ-খুনে মর্মান্তিক তথ্য
-
‘আমার জন্মদিনেই ছেড়ে চলে গেলে’! পুণের ব্যবসায়ীপুত্র কেতনকে খুনের পরই কেন আবেগঘন পোস্ট করেন সিয়া?
-
এত গরমেও পরনে হুডি! কেন? এই একটা প্রশ্নেই মোড় ঘুরে যায় কেতন মৃত্যুরহস্যের, কী করে ধরা পড়লেন সিয়া এবং তাঁর প্রেমিক
তদন্তকারী সূত্রের খবর, কেতনকে খুনের পরিকল্পনা হয়ে গিয়েছিল মে মাসেই। পুলিশ সূত্রে খবর, গত ৩১ মে লোহাগড় দুর্গে গিয়েছিলেন সিয়া এবং কেতন। অভিযোগ, ওই দিন কেতনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন সিয়া। কিন্তু একটি গাছ কোনও রকমে আঁকড়ে ধরে ফেলেন কেতন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং কেতন যাতে পরিকল্পনার বিষয়টি আঁচ করতে না পারে, তাই তাঁকে বলেছিলেন, সাপের কামড় থেকে বাঁচাতে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন চেতনকে। সিয়ার এই ব্যাখ্যা সরল মনে বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন কেতন। প্রথম বার ব্যর্থ হওয়ায় আবার ৪ জুন ওই একই জায়গায় কেতনকে ঘুরতে নিয়ে যান সিয়া। কিন্তু কেতনের মা কিছু একটা আঁচ করে তাঁকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। দু’জনের প্রি-ওয়েডিং ফোটোশুটের জন্য ইন্দোনেশিয়ার বালিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিয়া পরিকল্পনা করে কেতনের পাসপোর্ট লুকিয়ে রাখেন। ফলে মুম্বই বিমানবন্দরে পৌঁছেও বালি যাওয়া বাতিল হয়ে গিয়েছিল। আর একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন সিয়া। তাই ইচ্ছা করেই ইন্দোনেশিয়ার সফর ভেস্তে দেন বলে দাবি তদন্তকারীদের।
১৪ জুন কেতনকে নিয়ে আবার লোহাগড় দুর্গে যান সিয়া। ওই দিনও তাঁকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ওই দিন ছিল রবিবার। ফলে দুর্গে পর্যটকদের ভিড় বেশি ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই খুনের পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছিল সিয়াদের। তার পর সিয়ার জন্মদিনকেই বেছে নেওয়া হয়। ১৮ জুন ছিল সিয়ার জন্মদিন। সেই জন্মদিন উদ্যাপন করতে লোহাগড় দুর্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন সিয়া। কিন্তু কেতন চেয়েছিলেন কোনও রিসর্টে সিয়ার জন্মদিন পালন করতে। তবে সিয়া জেদ ধরেন জন্মদিন পালন করবেন লোহাগড় দুর্গেই। তার জন্য কেতনের বাবা-মায়ের অনুমতিও নেন। লোহাগড় দুর্গে পৌঁছোন দু’জন। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন সিয়ার প্রেমিক চেতন। তার পর দু’জনে মিলে কেতনকে ঠেলে ফেলে দেন বলে অভিযোগ। প্রাথমিক ভাবে একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে করেছিল পুলিশ। সিয়া তাদের কাছে দাবি করেছিলেন যে, ছবি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান কেতন। কিন্তু কেতনের পরিবার এই যুক্তি মানতে চায়নি। তাদের সন্দেহ হওয়ায় পুলিশের কাছে গভীর তদন্তের আর্জি জানায়। তাদের দাবি, কেতন একজন ভাল ট্রেকার। শুধু তা-ই নয়, পাহাড় সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। পা পিছলে কোনও ভাবেই মৃত্যু হতে পারে না তাঁর। তার পর তদন্ত এগোতে পরিকল্পিত খুনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।