যেন বিসর্জনেরই সুর শিলচর সেন্ট্রাল জেলে। দেবী-বিদায়ের দিনেই খবরটি পৌঁছয় তাঁদের কাছে। ফলে এক দিকে বিচ্ছেদের-বেদনা, অন্য দিকে মিলনের আনন্দ।
বাংলাদেশের শ্রীহট্ট জেলা থেকে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই করিমগঞ্জে এসেছিলেন ওঁরা। অর্চনা বিশ্বাস ও তাঁর দুই শিশুপুত্র গোপাল-গোবিন্দ। সঙ্গে ছিল তুতো-দেবর বাসুদেব রায়। পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তাঁরা। সেটা ২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। দু’মাস কারাবাসের রায় দিয়েছিলেন করিমগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। আর সেই থেকেই তাঁদের ঠাঁই হয় শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে। ক্যাম্প আর কী! তাঁদের থাকতে হয় জেলেই, কয়েদিদের সঙ্গে। দু’মাসের জায়গায় দু’বছর। অর্চনা-বাসুদেবের সঙ্গে গোপাল-গোবিন্দও। একজনের বয়স চার বছর। অন্য জনের তিন।
কারাবাসের মেয়াদ ফুরোলেও দুই দেশের ব্যাপার বলে জেলেই থাকতে হচ্ছিল সবাইকে। বহু অনুনয়-বিনয় করেও যখন ফল মিলছিল না, অর্চনা তখন ধরেই নিয়েছিলেন, আর দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই। এরই মধ্যে একদিন জেল পরিদর্শনে আসেন ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটির সচিব এম এইচ বড়ভুইয়া। কার কী সমস্যা আছে, জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন অর্চনা। তাঁর মতো বেশ কয়েকজন রয়েছেন শিলচর সেন্ট্রাল জেলে। তাঁরা ফিরে যেতে চান স্বদেশে। জেল কর্তৃপক্ষ জানান, শাস্তির মেয়াদ ফুরোলেও বাংলাদেশিদের এভাবে ছাড়াও সম্ভব নয়। একমাত্র সে দেশের সরকারের হাতেই তুলে দেওয়া যেতে পারে তাঁদের।
বড়ভুইয়া চিঠি লেখেন জেলাশাসক থেকে প্রতিরক্ষা সচিব পর্যন্ত। গত বছর দুই দেশের জেলাশাসক পর্যায়ের বৈঠক হয়। এদিক থেকে কাছাড়-করিমগঞ্জ, ওপারের শ্রীহট্ট-মৌলভিবাজারের জেলাশাসক-পুলিশ সুপাররা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। কাছাড়ের জেলাশাসক এস বিশ্বনাথন গুরুত্ব দেন অর্চনা বিশ্বাসদের মতো বন্দিদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে। শিলচর ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি ৫৪ জনের তালিকা তিনি তুলে দিয়েছিলেন শ্রীহট্ট ও মৌলভিবাজারের জেলাশাসকদের। তখনই তাঁরা আশ্বস্ত করেছিলেন, ওই ঠিকানায় তাঁদের পরিবারকে খুঁজে পাওয়া গেলে বাংলাদেশ তাঁদের ফিরিয়ে নেবে।
কাছাড়ের জেলাশাসক এস বিশ্বনাথন জানিয়েছেন, ১০ জনের ঠিকানা ১০০ শতাংশ ঠিকঠাক বলে নিশ্চিত হয়ে বাংলাদেশ তাঁদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। গোপাল-গোবিন্দদের ৪ জনের সঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে আরও ৬ জন। বুরহান উদ্দিন, শামিম আহমদ, আনোয়ারউদ্দিন, সাবলু আহমদ, এনামউদ্দিন ও আলি হোসেন। বুরহার ও শামিম কাছাড়ে ধরা পড়েছিলেন। বাকিরা ধরা পড়েন করিমগঞ্জ পুলিশের হাতে।
বিশ্বনাথন জানান, কাল ভোর পাঁচটায় শিলচর কারাগার কর্তৃপক্ষ তাদের করিমগঞ্জ পুলিশের হাতে তুলে দেবে। পুলিশ তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। বিএসএফই বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) হাতে তাঁদের প্রত্যার্পণ করবে। বিশ্বনাথন আশাবাদী, প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এ বার অন্যদেরও ফেরত পাঠানো যাবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
একসঙ্গে ১০জন মুক্তি পেলেও আজ জেলে শুধুই গোপাল-গোবিন্দকে নিয়ে চর্চা। দু’বছর ধরে জেলের কয়েদিরাই তো ছিল তাদের কাকা, মামা—আপনজন। জেল সূত্রে জানা গিয়েছে, অর্চনাদেবী সকাল থেকেই সমস্ত কিছু গুছিয়ে তৈরি। তৈরি বাসুদেব সহ অন্যরাও। সবারই এক কথা, আজ রাত ঘুমোব না। এমন ভোরেরই তো অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা!