ছ’বছর বন্ধ থাকার পরে আবার উত্তরাখণ্ড এবং চিন অধিকৃত তিব্বতের সংযোগরক্ষাকারী লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে নয়াদিল্লি-বেজিং বাণিজ্য শুরু হতে চলেছে। ২০২০ সালের অগস্টে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকার ভারত ও চিন সেনার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং অতিমারি পরিস্থিতির আবহে লিপুলেখ দিয়ে পণ্য চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময় এই গিরিপথের ‘সত্ত্ব’ নিয়ে নেপালের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন হয়েছিল ভারতের।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই গত বছরের অগস্টে আলোচনার সময় লিপুলেখের পাশাপাশি হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা ও সিকিমের নাথু লা গিরিপথ দিয়ে আবার পণ্য চলাচল চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সমঝোতা অনুযায়ী উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুঁ অঞ্চলের ধরচুলা থেকে চিন অধিকৃত তিব্বতের বাণিজ্য শহর তাকলাকোট (পুরাং)-এর মধ্যে পণ্য চলাচল করবে লিপুলেখ পাস দিয়ে। আগামী জুন মাস থেকেই সীমান্তবাণিজ্য আবার শুরু হয়ে যাবে বলে সরকারি সূত্রের খবর।
ঘটনাচক্রে, ভারত-চিন সমঝোতার পরেই নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তথা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কেপি শর্মা ওলির সরকার একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছিল, সরকারি মানচিত্রে কালী নদীর পূর্ব দিকে থাকা লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা এবং পূর্ব কালাপানিকে সে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ভারত সরকারকে ওই অংশে রাস্তা নির্মাণ কিংবা সম্প্রসারণ কিংবা সীমান্তবাণিজ্য না-করার আর্জি জানানো হয়েছিল। বিতর্কিত ওই এলাকা যে তাদেরই অংশ, তা চিনকেও জানানো হয়েছে বলে দাবি করেছিল কাঠমান্ডু। প্রসঙ্গত, ওলির জমানাতেই ২০২০ সালের অগস্টের শেষপর্বে নেপাল সরকার প্রকাশিত ‘নতুন মানচিত্রে’ তিনটি বিতর্কিত এলাকা- লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও পূর্ব-কালাপানিকে তাদের ভূখণ্ড বলে দেখানো হয়েছিল।
ভারত ও নেপালের মধ্যে এমন ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার (বা, ১ হাজার ১১৮ মাইল) সীমান্ত রয়েছে, যা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা নয়। খোলা সীমান্ত। যে লিপুলেখ গিরিপথকে নেপাল তাদের এলাকা বলে দাবি করছে, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী, সেই এলাকাটিকে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার ভারতের সঙ্গে নেপালের সীমান্তের পশ্চিম দিক বলে জানিয়েছিল। নেপালের সাম্প্রতিক দাবি সেই চুক্তির ভিত্তিতেই। শুধু তাই নয়, ১৯৬২-র ভারত-চিন যুদ্ধের পর থেকেই ভারত-নেপাল সীমান্তের যে দু’টি এলাকা লিম্পিয়াধুরা ও পূর্ব-কালাপানিতে মোতায়েন রয়েছে ভারতীয় সেনা, কাঠমান্ডু ওই দু’টি এলাকাকেও তাদের বলে দাবি করছে। লিপুলেখ গিরিপথের মাধ্যমে উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে চিন অধিকৃত তিব্বতের মানস সরোবরের যোগাযোগ গড়ে তুলতে ২০২০ ৮ মে একটি নতুন সড়ক পথের উদ্বোধন করেছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। তার পরেই দু’দেশের কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়।
আরও পড়ুন:
এ ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির যুক্তি, ১৯৫৪ সালে লিপুলেখ পাস ধরে ভারত এবং চিনের মধ্যে সীমান্তবাণিজ্য শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ সাড়ে ছ’দশক ধরে তা চলেছে। কোভিড এবং অন্য কয়েকটি কারণে ২০২০ সালের মধ্যপর্বে তা স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। কালাপানি অঞ্চল নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত অবশ্য সেই ব্রিটিশ আমলেই, ১৮১৬ সালে। ওই বছর স্বাক্ষরিত হওয়া সুগৌলির সন্ধি অনুসারে, কালী নদী ভারত এবং নেপালের মধ্যে ভৌগোলিক সীমারেখা হিসাবে কাজ করবে। তবে এই নদীর উৎসস্থল নিয়েও মতান্তর রয়েছে। নেপালের দীর্ঘ দিনের দাবি, লিপুলেখের উত্তর-পশ্চিম দিকে লিম্পিয়াধুরা নদীটির উৎসস্থল। সেই হিসাবে জায়গাটি তাদের সীমান্তের মধ্যেই পড়ছে বলে মনে করে থাকে কাঠমান্ডু। ভারতের পাল্টা দাবি, কালী নদীর উৎপত্তিস্থল কালাপানি গ্রামের একটি প্রস্রবণ। আর সেই প্রস্রবণ উত্তরাখণ্ডের মধ্যে পড়ছে।