ঢোল-নাকাড়া। নাচ-হুল্লোড়। ফুল-পটকা। স্লোগান-পোস্টার। রাজনাথ-গডকড়ী। বেঙ্কাইয়া-পর্রীকর। স্মৃতি-বসুন্ধরা। শিবরাজ-রমন সিংহ। যোগী আদিত্যনাথ-সাধ্বী নিরঞ্জন।
নিখুঁত চিত্রনাট্যে খামতি কোথাও নেই। যেমনটি নির্বিরোধ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, হয়েছেও তাই। নরেন্দ্র মোদীর ‘ম্যান ফ্রাইডে’ অমিত শাহ ফের হলেন বিজেপির সভাপতি। গত বার রাজনাথ সিংহের অসমাপ্ত মেয়াদ পূরণ করেছিলেন। সেই হিসেবে এ বারই তাঁর সভাপতিত্বের প্রথম ইনিংস শুরু হল বলা যায়। মাঝ পথে পরিবর্তন না হলে আগামী তিন বছর বিজেপির সভাপতি পদে থাকবেন তিনিই। দলের সংবিধান অনুসারে থাকতে পারবেন আরও তিন বছর।
এই সাজানো মহা-আয়োজনেও রয়ে গেল অনেক ‘কিন্তু’! যার সাক্ষী রইল দিল্লির ১১ অশোক রোড। ২০১৪ সালে অমিত শাহের প্রথম অভিষেকের সময়ে উপস্থিত ছিলেন দলের ‘মার্গদর্শক মণ্ডলী’র প্রবীণ নেতারা। লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলীমনোহর জোশী। বিজেপির ইতিহাসে এ বারই প্রথম কোনও সভাপতি নির্বাচনে অনুপস্থিত থাকলেন প্রবীণেরা! ফরাসি প্রেসিডেন্টকে চণ্ডীগড়ে স্বাগত জানাতে গিয়ে বিজেপির সদর দফতরে হাজির থাকলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। ঘটনাচক্রে ঠিক এই সময়েই আরব দেশে সরকারি সফরে রয়েছেন সুষমা স্বরাজ। তাই তিনিও নেই। আর সুইৎজারল্যান্ড থেকে আজ দিল্লিতে ফিরে এলেও অমিতের অভিষেকের সাক্ষী হতে অশোক রোডে গাড়ি ছোটালেন না অরুণ জেটলি।
ফলে অনেক হই-হুল্লোড়ের মধ্যেও অনেকটাই বর্ণহীন হয়ে রইল অমিত শাহের সভাপতি নির্বাচন। স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব নজর এড়ায়নি সিংহভাগ নেতারও। আডবাণীদের অনুপস্থিতি নিয়ে আজ রাজনাথকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান। দলের এক নেতার ব্যাখ্যা, গডকড়ী কিংবা রাজনাথের মতো নেতা, দল ও সঙ্ঘের কাছে যাঁদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাঁরাও সভাপতি পদে বসতে চাননি। সামনেই পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল, অসম, পুদুচেরিতে ভোট। অসম ছাড়া আশার আলো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সামনের বছর উত্তরপ্রদেশে নির্বাচন। সেখানেও যদি বিহারের দশা হয়, তা হলে কী হবে? তখন তো রীতিমতো সঙ্কটে পড়ে যাবে সরকার। আর তার দায় অনেকটাই এসে পড়বে সভাপতির ঘাড়ে। এই অবস্থায় কেউই হাড়িকাঠে গলা
দিতে এগিয়ে আসেননি। অগত্যা অমিত শাহ!
বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, আডবাণী, জোশীরা আজ অনুপস্থিত থেকে অমিত ও মোদীকে দিল্লি এবং বিহারে ভরাডুবির কথা চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন। অমিত নিজে অবশ্য সন্ধ্যায় আডবাণীর বাসভবনে গিয়ে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে আসেন। কিন্তু তার পরেও জল্পনা থামছে না। বিহারে বিপর্যয়ের পর আডবাণীর নেতৃত্বেই দলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী অমিতের অভিষেক ঠেকাতে চেয়েছিলেন। সঙ্ঘকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে মোদী সেই চেষ্টা আটকেছেন ঠিকই। কিন্তু এখন পাঁচ রাজ্যের ভোটে অমিত দলকে কতটা ভাল জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন, সেটাই দেখার।
অর্থাৎ কাঁটার মুকুট মাথায় দিয়েই অমিত আজ নিজের কাঁধে মস্ত চ্যালেঞ্জ নিলেন! বিজেপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই তা মানছেন। তাঁদের কথায়, সঙ্ঘ যে মন থেকে অমিত শাহকে মেনে নিয়েছে, এমন নয়। যে হেতু আর কেউ এগিয়ে আসেননি, তাই সামনে কোনও বিকল্প ছিল না। আর মোদীর পক্ষেও এই মুহূর্তে অমিত ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দল চালানো সহজ নয়। কিন্তু এটাও ঘটনা, গত আঠারো মাসে অমিত শাহের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। দল চালাতে সমন্বয়ের অভাব, তাঁর ঔদ্ধত্য, অন্যের কথা না শোনা। সেগুলো কী হবে? রাজনাথ-ঘনিষ্ঠ এক নেতার দাবি, ‘‘সঙ্ঘ অমিত শাহকে ফের সভাপতি করার কথা মেনে নিয়েছে। পরিবর্তে তাঁর টিমে সঙ্ঘের পছন্দের লোককে সামিল করার শর্তও
আরোপ করেছে।’’
কী রকম? একদা যে নেতাকে কর্মসমিতি থেকে সরানোর পরে মুম্বইয়ের বৈঠকে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী, এখন সেই সঞ্জয় জোশীকেই দলে ফেরানোর জন্য চাপ দিচ্ছে সঙ্ঘ। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁকে বিজেপিতে ফেরাতে আগ্রহী সঙ্ঘ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মোদী এই প্রস্তাবে সায় দেননি। এই অবস্থায় সকলেই তাকিয়ে অমিত শাহের নতুন ‘টিম’-এর দিকে।
আর সেখানেও সমস্যা। এ বছরই নরেন্দ্র মোদী সরকার তার মেয়াদের অর্ধেক পূর্ণ করবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সরকারের বলার মতো সাফল্য সে ভাবে কোথায়, যাকে মূলধন করে পাঁচ রাজ্যের আসন্ন ভোটে লড়াই করা যায়? এই অবস্থায় সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে অমিত শাহের সঙ্গে জুটি বেঁধেই রণকৌশল তৈরি করতে চান মোদী। বিজেপির অন্দরে গুঞ্জন, ৫ রাজ্যের ভোটের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল করতে পারেন মোদী। তখন কাজের বিচার করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে কয়েক জনকে সরিয়ে সংগঠনে পাঠানো হতে পারে। একই ভাবে সংগঠন থেকে ‘যোগ্য’ কাউকে মন্ত্রিসভায় সুযোগ দিতে পারেন মোদী। আর সেই সঙ্গেই চলবে মোদী সরকারের সাফল্য তুলে ধরার কাজ। যা নিয়ে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে ‘টিম অমিত শাহ’। তবে বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে মন্ত্রিসভায় এই রদবদলের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই তত দিন পর্যন্ত অমিতের নতুন টিম গড়ার কাজ ঝুলে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
আজ সভাপতির ইনিংস শুরু করে কালই কলকাতায় যাচ্ছেন অমিত শাহ। হাওড়ায় জনসভা করবেন তিনি। বাংলার মাটি থেকে শুরু হবে তাঁর নতুন পর্বের অগ্নিপরীক্ষা।